খবরওয়ালা অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশ: বৃহস্পতিবার, ২ এপ্রিল ২০২৬
দেশজুড়ে মশার উপদ্রব ও মশাবাহিত রোগের প্রকোপ উদ্বেগজনকভাবে বাড়ছে। তাপমাত্রা বৃদ্ধি, বৃষ্টিপাতের ধরনে পরিবর্তন, অপরিকল্পিত নগরায়ণ এবং দুর্বল জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনা—সব মিলিয়ে পরিস্থিতি ক্রমেই জটিল হয়ে উঠছে। এর ভয়াবহতার একটি উদাহরণ পার্বত্য জেলা রাঙামাটিতে ১০ বছর বয়সী এক শিশুর মৃত্যু, যা দীর্ঘ প্রায় এক দশক পর ম্যালেরিয়াজনিত মৃত্যুর ঘটনা হিসেবে নতুন করে সতর্কবার্তা দিয়েছে।
স্বাস্থ্য বিভাগ মনে করেছিল, দেশে ম্যালেরিয়া অনেকটাই নিয়ন্ত্রণে এসেছে। কিন্তু সাম্প্রতিক পরিসংখ্যানে দেখা যাচ্ছে, ২০২৫ সালে ম্যালেরিয়ায় মৃত্যুর সংখ্যা গত নয় বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ। একই সঙ্গে ডেঙ্গু, জিকা ও চিকুনগুনিয়ার মতো অন্যান্য মশাবাহিত রোগও দ্রুত বিস্তার লাভ করছে।
| রোগের নাম | বাহক মশা | ঝুঁকি | বর্তমান প্রবণতা |
|---|---|---|---|
| ডেঙ্গু | এডিস | উচ্চ জ্বর, রক্তক্ষরণ | সারা বছরব্যাপী বিস্তার |
| ম্যালেরিয়া | অ্যানোফিলিস | প্রাণঘাতী | পাহাড়ি এলাকায় স্থায়ী ঝুঁকি |
| জিকা | এডিস | নবজাতকের জটিলতা | পুনরুত্থানের আশঙ্কা |
| চিকুনগুনিয়া | এডিস | তীব্র ব্যথা | শহর ও গ্রামে বিস্তার |
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, জলবায়ুর পরিবর্তন মশার বংশবিস্তারের জন্য আদর্শ পরিবেশ তৈরি করছে। গত তিন দশকে দেশে গড় তাপমাত্রা ধারাবাহিকভাবে বেড়েছে। ২৬ থেকে ৩০ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা মশার প্রজননের জন্য সবচেয়ে উপযোগী, যা এখন বাংলাদেশের অধিকাংশ সময়েই বিদ্যমান। ফলে মশার প্রজনন মৌসুম দীর্ঘ হচ্ছে এবং রোগ সংক্রমণের সময়কালও বাড়ছে।
বৃষ্টিপাতের অস্বাভাবিক ধরণ—বর্ষায় কম বৃষ্টি ও বর্ষা শেষে অতিবৃষ্টি—স্থির পানির সৃষ্টি করছে, যা মশার বংশবৃদ্ধিকে ত্বরান্বিত করছে।
একসময় ডেঙ্গুকে শুধু শহরের রোগ মনে করা হলেও এখন তা গ্রাম পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়েছে। সাম্প্রতিক তথ্যে দেখা গেছে, আক্রান্তদের বড় অংশই রাজধানীর বাইরে। কিন্তু গ্রামীণ এলাকায় প্রয়োজনীয় চিকিৎসা সুবিধার ঘাটতি থাকায় সাধারণ মানুষ মারাত্মক ঝুঁকিতে রয়েছে।
চিকিৎসকদের মতে, ডেঙ্গু এখন মৌসুমি নয়, বরং সারা বছরের রোগে পরিণত হয়েছে। একই সঙ্গে চিকুনগুনিয়া ও জিকার সংক্রমণও বাড়ছে, যা ভবিষ্যতের জন্য বড় হুমকি।
ম্যালেরিয়া নিয়ন্ত্রণে অগ্রগতি থাকলেও নতুন সমস্যা দেখা দিয়েছে। বিশেষ করে রোগ নির্ণয়ে ব্যবহৃত পরীক্ষায় ত্রুটি দেখা যাচ্ছে, কারণ জীবাণুর জিনগত পরিবর্তনের ফলে অনেক ক্ষেত্রে পরীক্ষার ফল ভুল আসছে। ফলে রোগ শনাক্তে বিলম্ব হচ্ছে এবং মৃত্যুঝুঁকি বাড়ছে।
আরেকটি বড় উদ্বেগ হলো সীমান্তবর্তী অঞ্চলে সংক্রমণ বৃদ্ধি। প্রতিবেশী দেশের পরিস্থিতি এবং সীমান্ত দিয়ে মানুষের চলাচল রোগ বিস্তারে ভূমিকা রাখছে।
মশাবাহিত রোগ শুধু স্বাস্থ্যঝুঁকি নয়, আর্থিক চাপও বাড়াচ্ছে। একটি পরিবারে ডেঙ্গুর চিকিৎসায় গড়ে প্রায় ১৯ হাজার টাকার বেশি খরচ হয়। অনেক ক্ষেত্রে এই ব্যয় পরিবারের সামর্থ্যের বাইরে চলে যায়, ফলে ঋণগ্রস্ত হওয়া বা সম্পদ বিক্রির মতো পরিস্থিতিও তৈরি হয়।
রোগের আতঙ্ককে কেন্দ্র করে দেশে মশা প্রতিরোধক পণ্যের বাজার দ্রুত সম্প্রসারিত হচ্ছে। কয়েল, স্প্রে, ক্রিমসহ নানা পণ্যের ব্যবহার বাড়লেও এগুলোর মান ও স্বাস্থ্যঝুঁকি নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। তদারকির অভাবে মানুষ বাধ্য হয়ে এসব পণ্যের ওপর নির্ভর করছে।
বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করছেন, ভবিষ্যতে নতুন ধরনের মশাবাহিত রোগ দেখা দিতে পারে। কিউলেক্স মশার মাধ্যমে ফাইলেরিয়া ও জাপানি এনসেফালাইটিসের ঝুঁকি রয়েছে। পাশাপাশি পরিযায়ী পাখির মাধ্যমে ওয়েস্ট নাইল ভাইরাস দেশে প্রবেশ করতে পারে, যা স্নায়ুতন্ত্রের জন্য অত্যন্ত বিপজ্জনক।
পরিস্থিতি মোকাবিলায় জরুরি ভিত্তিতে সমন্বিত পদক্ষেপ প্রয়োজন। কার্যকর মশা নিয়ন্ত্রণ কর্মসূচি, আধুনিক নগর পরিকল্পনা, উন্নত রোগ নির্ণয় ব্যবস্থা এবং জনসচেতনতা বাড়ানো ছাড়া এই সংকট থেকে উত্তরণ সম্ভব নয়। বিশেষজ্ঞদের মতে, এখনই উদ্যোগ না নিলে মশাবাহিত রোগ ভবিষ্যতে দেশের সবচেয়ে বড় জনস্বাস্থ্য সংকটে পরিণত হতে পারে।