খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: মঙ্গলবার, ২৮ এপ্রিল ২০২৬
ইরানের পার্লামেন্ট স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে বিদ্যমান ভূ-রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক শক্তির ভারসাম্য নিয়ে নতুন একটি বিশ্লেষণ তুলে ধরেছেন। তার মতে, ওয়াশিংটন বৈশ্বিক অর্থনীতিতে যে একচ্ছত্র আধিপত্যের দাবি করে, তার বাস্তব ভিত্তি দুর্বল। তেহরানের হাতে এখনো এমন কিছু গুরুত্বপূর্ণ ‘কার্ড’ বা কৌশলগত বিকল্প রয়েছে, যা তারা এখনো ব্যবহার করেনি। রোববার রাতে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম এক্সে (সাবেক টুইটার) দেওয়া এক বার্তায় তিনি এই মন্তব্য করেন।
গালিবাফ ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনৈতিক কৌশলকে একটি দ্বান্দ্বিক সমীকরণের মাধ্যমে ব্যাখ্যা করেছেন। তার বিশ্লেষণ অনুযায়ী, ইরানের শক্তির মূল উৎস হলো সরবরাহভিত্তিক নিয়ন্ত্রণ। ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে ইরান বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি সরবরাহ পথগুলো নিয়ন্ত্রণ করার সক্ষমতা রাখে। অন্যদিকে, যুক্তরাষ্ট্রের শক্তি মূলত চাহিদাভিত্তিক পদক্ষেপের ওপর নির্ভরশীল। ওয়াশিংটন সাধারণত তাদের কৌশলগত মজুত থেকে তেল ছেড়ে দেওয়া বা বিশ্ববাজারে তেলের চাহিদা ও মূল্য নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করে পরিস্থিতি সামাল দিতে চায়।
গালিবাফ উল্লেখ করেন যে, তেহরানের হাতে থাকা অনেকগুলো বিকল্প এখনো অব্যবহৃত রয়ে গেছে। এর বিপরীতে, যুক্তরাষ্ট্র ইতোমধ্যে তার হাতে থাকা অধিকাংশ অর্থনৈতিক হাতিয়ার ও কৌশল আংশিক বা পূর্ণাঙ্গভাবে প্রয়োগ করে ফেলেছে। তিনি যুক্তরাষ্ট্রের এই আধিপত্যের আস্ফালনকে চ্যালেঞ্জ জানিয়ে বলেন, “তারা কার্ড নিয়ে বড়াই করছে— দেখা যাক, সরবরাহ কার্ড বনাম চাহিদা কার্ডের লড়াইয়ে কে জয়ী হয়।”
ইরানের পার্লামেন্ট স্পিকারের মতে, তেহরানের হাতে তিনটি প্রধান ভৌগোলিক ও কারিগরি শক্তির উৎস রয়েছে:
১. হরমুজ প্রণালি: যা বিশ্বের মোট খনিজ তেলের বড় একটি অংশের পরিবহণ পথ। ইরান এটি এখন পর্যন্ত আংশিকভাবে ব্যবহার করেছে।
২. বাব এল-মান্দেব প্রণালি: লোহিত সাগরের প্রবেশদ্বার হিসেবে পরিচিত এই পথে ইরানের প্রভাব থাকলেও তা এখনো পুরোপুরি কৌশলগত হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত হয়নি।
৩. পাইপলাইন নেটওয়ার্ক: জ্বালানি পরিবহনের বিকল্প পাইপলাইন ব্যবস্থা ইরানের একটি শক্তিশালী ট্রাম্প কার্ড যা এখনো সংরক্ষিত আছে।
বিপরীত দিকে, যুক্তরাষ্ট্রের সীমাবদ্ধতা তুলে ধরে তিনি জানান, মার্কিন প্রশাসন ইতোমধ্যে তাদের কৌশলগত তেল মজুত (Strategic Petroleum Reserve) থেকে তেল ছেড়ে দিয়েছে এবং অভ্যন্তরীণ চাহিদা নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করেছে। এছাড়া সামনে গ্রীষ্মকালীন ছুটির মৌসুম আসায় যুক্তরাষ্ট্রে জ্বালানির চাহিদা ব্যাপক হারে বৃদ্ধি পাবে, যা ওয়াশিংটনকে আরও চাপে ফেলবে বলে তিনি মনে করেন।
নিচে গালিবাফের বক্তব্যের ভিত্তিতে দুই দেশের অর্থনৈতিক ও কৌশলগত পদক্ষেপের একটি তুলনামূলক তালিকা প্রদান করা হলো:
| বিষয়ের ধরন | ইরানের কৌশল (সরবরাহ ভিত্তিক) | যুক্তরাষ্ট্রের কৌশল (চাহিদা ভিত্তিক) | বর্তমান অবস্থা |
| প্রধান পথ/উৎস | হরমুজ প্রণালি | কৌশলগত তেল মজুত (SPR) | ইরান আংশিক ব্যবহার করেছে; যুক্তরাষ্ট্র মজুত থেকে তেল ছেড়েছে। |
| বিকল্প পথ | বাব এল-মান্দেব প্রণালি | চাহিদা নিয়ন্ত্রণ (Demand Management) | ইরানের কার্ড অব্যবহৃত; যুক্তরাষ্ট্রের পদক্ষেপ আংশিক কার্যকর। |
| অবকাঠামো | পাইপলাইন নেটওয়ার্ক | মূল্য সমন্বয় (Price Adjustment) | ইরান এখনো প্রয়োগ করেনি; যুক্তরাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচিত। |
| প্রভাবক ফ্যাক্টর | সরবরাহ শৃঙ্খল নিয়ন্ত্রণ | গ্রীষ্মকালীন জ্বালানি চাহিদা বৃদ্ধি | যুক্তরাষ্ট্রের জন্য এটি একটি বড় অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ। |
মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফের এই বক্তব্য এমন এক সময়ে এসেছে যখন বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের স্থিতিশীলতা নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে। ইরানের দাবি অনুযায়ী, তারা যদি তাদের সরবরাহ কার্ডগুলো পুরোপুরি ব্যবহার শুরু করে, তবে বিশ্ব অর্থনীতিতে বড় ধরনের অস্থিরতা তৈরি হতে পারে। বিশেষ করে বাব এল-মান্দেব এবং পাইপলাইন ব্যবস্থার ওপর নিয়ন্ত্রণারোপ করলে আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজার সরাসরি প্রভাবিত হবে।
গালিবাফ আত্মবিশ্বাসের সাথে উল্লেখ করেছেন যে, ওয়াশিংটন তাদের সক্ষমতা নিয়ে যতটা প্রচার করে, বাস্তবে তাদের হাতে নতুন কোনো কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার সুযোগ খুবই সীমিত। মূলত চাহিদা ও সরবরাহের এই লড়াইয়ে ইরান নিজেকে সুবিধাজনক অবস্থানে দেখছে, যা আগামী দিনে মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতি ও অর্থনীতিতে নতুন মাত্রা যোগ করতে পারে।