খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: শনিবার, ২ মে ২০২৬
ভারত তথা বিশ্ব চলচ্চিত্রের ইতিহাসে উজ্জ্বলতম নক্ষত্র সত্যজিৎ রায়। ১৯২১ সালের ২ মে কলকাতায় এক বিদগ্ধ সাংস্কৃতিক পরিবারে তাঁর জন্ম। তিনি কেবল একজন চলচ্চিত্র পরিচালকই ছিলেন না, বরং একাধারে চিত্রনাট্যকার, সাহিত্যিক, সংগীত পরিচালক, গ্রাফিক শিল্পী এবং দক্ষ ইলাস্ট্রেটর হিসেবেও নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন। চিন্তার গভীরতা এবং শৈল্পিক সুষমার মাধ্যমে তিনি বাংলা চলচ্চিত্রকে বিশ্বমঞ্চে এক অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গিয়েছিলেন।
সত্যজিৎ রায়ের পারিবারিক প্রেক্ষাপট ছিল অত্যন্ত সমৃদ্ধ। তাঁর দাদা উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরী ছিলেন বিখ্যাত শিশুসাহিত্যিক, চিত্রকর এবং আধুনিক মুদ্রণশিল্পের পথিকৃৎ। বাবা সুকুমার রায় ছিলেন বাংলা সাহিত্যের ‘ননসেন্স রাইম’ বা আবোল-তাবোল ধারার প্রবর্তক। ১৯২৪ সালে, সত্যজিতের মাত্র তিন বছর বয়সে সুকুমার রায়ের মৃত্যু হলে মা সুপ্রভা দেবীর কাছেই তিনি লালিত-পালিত হন। ১৯ শতকের ব্রাহ্ম আন্দোলনের প্রভাবে তাঁদের পরিবারে প্রগতিশীল ও শিল্পঘেঁষা এক পরিবেশ বিরাজমান ছিল।
কলকাতার প্রেসিডেন্সি কলেজ থেকে অর্থনীতিতে স্নাতক সম্পন্ন করার পর তিনি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর প্রতিষ্ঠিত শান্তিনিকেতনের বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ে যোগ দেন। সেখানে চারুকলার পাঠ নিলেও পাঁচ বছরের কোর্স শেষ না করে ১৯৪৩ সালে তিনি কলকাতায় ফিরে আসেন। কর্মজীবনের শুরুতে তিনি একটি ব্রিটিশ বিজ্ঞাপনী সংস্থায় (ডি. জে. কিমার) মাত্র ৮০ টাকা বেতনে জুনিয়র ভিজ্যুয়ালাইজার হিসেবে কাজ শুরু করেন। মূলত প্রচ্ছদ অঙ্কন ও গ্রাফিক ডিজাইনের মাধ্যমেই তাঁর শৈল্পিক দৃষ্টিভঙ্গি শাণিত হতে থাকে।
১৯৫০ সালে কাজের সূত্রে লন্ডন থাকাকালীন সত্যজিৎ প্রায় ১০০টি চলচ্চিত্র দেখেন। এর মধ্যে ভিত্তোরিও ডি সিকার ‘দ্য বাই সাইকেল থিফ’ (The Bicycle Thief) তাঁকে চলচ্চিত্র নির্মাণে সবচেয়ে বেশি অনুপ্রাণিত করে। ১৯৫৩ সালে বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের কালজয়ী উপন্যাস অবলম্বনে তিনি তাঁর প্রথম ছবি ‘পথের পাঁচালী’র কাজ শুরু করেন। ১৯৫৫ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত এই ছবিটি বিশ্ব চলচ্চিত্রে তোলপাড় সৃষ্টি করে। কান চলচ্চিত্র উৎসবে এটি ‘বেস্ট হিউম্যান ডকুমেন্ট’ পুরস্কারসহ মোট ১১টি আন্তর্জাতিক সম্মাননা লাভ করে।
পরবর্তীতে ‘অপরাজিত’ এবং ‘অপুর সংসার’ নির্মাণের মাধ্যমে তিনি ‘অপু ট্রিলজি’ সম্পন্ন করেন। ‘অপরাজিত’ ছবিটি ভেনিস চলচ্চিত্র উৎসবে শ্রেষ্ঠ চলচ্চিত্রের সম্মান ‘গোল্ডেন লায়ন’ অর্জন করে।
| চলচ্চিত্রের নাম | মুক্তির বছর | বিশেষত্ব/পুরস্কার |
| পথের পাঁচালী | ১৯৫৫ | কান উৎসবে ‘বেস্ট হিউম্যান ডকুমেন্ট’ পুরস্কার |
| অপরাজিত | ১৯৫৬ | ভেনিস উৎসবে গোল্ডেন লায়ন প্রাপ্তি |
| জলসাঘর | ১৯৫৮ | জমিদারি প্রথার অবক্ষয় ভিত্তিক ধ্রুপদী চলচ্চিত্র |
| কাঞ্চনজঙ্ঘা | ১৯৬২ | প্রথম রঙিন চলচ্চিত্র ও মৌলিক চিত্রনাট্য |
| চারুলতা | ১৯৬৪ | বার্লিন উৎসবে শ্রেষ্ঠ পরিচালকের পুরস্কার (সিলভার বিয়ার) |
| শতরঞ্জ কি খিলাড়ি | ১৯৭৭ | হিন্দি ও উর্দু ভাষায় নির্মিত ব্যয়বহুল ও তারকাসমৃদ্ধ ছবি |
| ঘরে বাইরে | ১৯৮৪ | রবীন্দ্রনাথের উপন্যাস অবলম্বনে নির্মিত রাজনৈতিক চলচ্চিত্র |
| আগন্তুক | ১৯৯১ | সত্যজিৎ রায়ের পরিচালিত সর্বশেষ চলচ্চিত্র |
চলচ্চিত্রের পাশাপাশি সত্যজিৎ রায় শিশু ও কিশোর সাহিত্যেও অমর হয়ে আছেন। তাঁর সৃজিত গোয়েন্দা চরিত্র ‘ফেলুদা’ এবং বিজ্ঞানী ‘প্রোফেসর শঙ্কু’ বাঙালির পাঠাভ্যাসের অবিচ্ছেদ্য অংশ। তিনি তাঁর অধিকাংশ ছবির সংগীত পরিচালনা নিজেই করতেন। এমনকি ক্যালিগ্রাফি বা হরফ নকশাতেও তাঁর অবদান অনস্বীকার্য; তাঁর উদ্ভাবিত ‘রায় রোমান’ ও ‘ডাফনি’ নামক ফন্ট দুটি বিশ্বজুড়ে সমাদৃত।
১৯৮৩ সালে হৃদরোগে আক্রান্ত হওয়ার পর তাঁর কাজের গতি কিছুটা ধীর হয়ে আসে। শারীরিক অসুস্থতা সত্ত্বেও তিনি চলচ্চিত্র নির্মাণ অব্যাহত রাখেন। ১৯৯২ সালে ভারত সরকার তাঁকে সর্বোচ্চ বেসামরিক সম্মান ‘ভারতরত্ন’ প্রদান করে। একই বছর আমেরিকান একাডেমি অফ মোশন পিকচার আর্টস অ্যান্ড সায়েন্সেস তাঁকে আজীবন অবদানের জন্য সম্মানসূচক ‘অস্কার’ প্রদান করে। ১৯৯২ সালের ২৩ এপ্রিল কলকাতার একটি হাসপাতালে এই মহান শিল্পীর মহাপ্রয়াণ ঘটে। তাঁর জীবন ও কাজ আজও বিশ্বের অগণিত চলচ্চিত্র নির্মাতাদের কাছে অনুপ্রেরণার উৎস হয়ে আছে।