মৌলভীবাজারের কাউয়াদীঘি হাওরপারের প্রান্তিক কৃষক, বর্গাচাষি এবং জমি বন্ধক নিয়ে চাষ করা কৃষকেরা চলতি মৌসুমে ব্যাপক ফসল ক্ষতির মুখে পড়েছেন। টানা বৃষ্টিপাত ও জলাবদ্ধতার কারণে পাকা ও আধপাকা ধান পানিতে তলিয়ে গেছে। অনেক ক্ষেত্রেই ধান কেটে পানির নিচ থেকে উদ্ধার করতে হচ্ছে, তবে সেই ধানও রক্ষা করা সম্ভব হচ্ছে না। কাটা ধান দীর্ঘ সময় পানিতে থাকায় পচন ধরছে এবং অনেক স্থানে আঁটিতে অঙ্কুরোদগম শুরু হয়েছে।
কৃষকদের অভিযোগ অনুযায়ী, শ্রমিক ও নৌকার সংকট, পাশাপাশি অতিরিক্ত মজুরি ও ভাড়ার কারণে ধান উদ্ধার ব্যয়বহুল হয়ে পড়েছে। ফলে পানি থেকে সংগ্রহ করা ধানের বিক্রয়মূল্যের সঙ্গে খরচের কোনো সামঞ্জস্য থাকছে না। একই সঙ্গে পচন ও মানহ্রাসের অজুহাতে ক্রেতারা ধান কিনতে আগ্রহ দেখাচ্ছেন না অথবা খুবই কম দামে কিনছেন। এতে কৃষকেরা দ্বৈত সংকটে পড়েছেন—ফসল মাঠে রেখে দেওয়াও সম্ভব নয়, আবার তুলেও আর্থিক ক্ষতি থেকে রেহাই নেই।
মৌলভীবাজার সদর উপজেলার আখাইলকুড়া ইউনিয়নের বিরইমাবাদ এলাকায় দেখা যায়, কৃষকেরা ধান রক্ষায় নিরলসভাবে কাজ করছেন। কেউ আধপাকা ধান কেটে উঁচু স্থানে রাখছেন, কেউ নৌকায় করে কাটা ধান স্থানান্তর করছেন, আবার কেউ ভেজা ধান মাড়াই করছেন। তবে অনেক জায়গায় কাটা ধান পানিতে পড়ে রয়েছে এবং নৌকার অভাবে তা সরানো সম্ভব হচ্ছে না।
কৃষকেরা জানান, প্রতি ৪০ থেকে ৫০ আঁটি ধান পরিবহনের জন্য নৌকা ভাড়া দিতে হচ্ছে ৪০০ থেকে ৫০০ টাকা এবং শ্রমিকের মজুরি ৮০০ থেকে ১০০০ টাকা পর্যন্ত। ফলে ধান বিক্রি করে অনেক ক্ষেত্রেই পরিবহন ও শ্রম ব্যয়ও উঠে আসছে না। মাত্র দুই দিন আগেও অনেক এলাকায় পানি না থাকলেও বর্তমানে দ্রুত জল বৃদ্ধি পরিস্থিতিকে আরও জটিল করেছে।
বিভিন্ন কৃষকের ক্ষতির পরিমাণ নিচে দেওয়া হলো—
| কৃষকের নাম |
চাষের পরিমাণ |
উদ্ধারকৃত জমি |
ধান উৎপাদন ও অবস্থা |
আর্থিক পরিস্থিতি |
| গোপাল নুনিয়া |
৫ কিয়ার |
৪ শতক |
২–৩ মণ ধান উদ্ধার, বাকি পানিতে |
খরচ বেশি, ক্ষতি |
| জলিল মিয়া |
৫ কিয়ার |
আধ কিয়ার |
আংশিক ধান উদ্ধার, বাকি ডুবে গেছে |
লোকসান |
| আবদুল কাদির |
১০ কিয়ার |
৪ কিয়ার |
৪ কিয়ার ধান তুলতে ২৪ হাজার টাকা খরচ |
বিক্রি ২৩ হাজার টাকা |
| আলাল মিয়া |
২০ কিয়ার |
৪ কিয়ার |
অবশিষ্ট ধান পানির নিচে |
ব্যাপক ক্ষতি |
গোপাল নুনিয়া জানান, পানির নিচে থাকা ক্ষেত থেকে সামান্য ধান উদ্ধার করলেও সম্পূর্ণ খেত রক্ষা করা সম্ভব হয়নি। জলিল মিয়া ও অন্যান্য কৃষকেরাও একই ধরনের সমস্যার কথা জানান। অনেকেই জানান, জমি ভাড়া ও চাষাবাদে যে ব্যয় হয়েছে, তা ধান বিক্রি করে পূরণ করা যাচ্ছে না।
আবদুল কাদির জানান, পানির কারণে ধানে পচন ও চারা গজিয়ে গেছে, ফলে বাজারে তা বিক্রিযোগ্য নয়। তিনি বর্তমানে অন্যের ধান পরিবহনের কাজ করে জীবিকা নির্বাহ করছেন। আলাল মিয়া জানান, তার বড় অংশের জমি পানির নিচে তলিয়ে গেছে এবং অল্প যে ধান উদ্ধার করা হয়েছে তার অবস্থাও খারাপ।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, জেলায় মোট ২৩৪৯ হেক্টর জমির ধান পানিতে তলিয়ে গেছে। হাওরের জলাবদ্ধতা নিরসনে সেচ কার্যক্রম চললেও ভারী বর্ষণের কারণে দ্রুত পানি নামানো সম্ভব হচ্ছে না।