খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: সোমবার, ৪ মে ২০২৬
দক্ষিণ ভারতের তামিলনাড়ু রাজ্যের রাজনীতিতে এক ঐতিহাসিক পরিবর্তনের ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে। জনপ্রিয় তামিল অভিনেতা থালাপতি বিজয়ের নবগঠিত রাজনৈতিক দল ‘তামিলাগা ভেত্রি কাজাগাম’ (টিভিকে) ২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনে প্রথমবারের মতো অংশ নিয়েই অভাবনীয় সাফল্যের পথে রয়েছে। প্রাথমিক ভোট গণনার প্রবণতা অনুযায়ী, বিজয়ের দল একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জনের পথে দৃঢ়ভাবে এগিয়ে যাচ্ছে। এই জয়ের আবহে রাজ্যজুড়ে বিজয়ের সমর্থক ও সাধারণ মানুষের মধ্যে ব্যাপক উদ্দীপনা সৃষ্টি হয়েছে।
ছেলের এই রাজনৈতিক সাফল্যে অত্যন্ত উচ্ছ্বাস প্রকাশ করেছেন বিজয়ের বাবা তথা প্রখ্যাত চলচ্চিত্র নির্মাতা এস এ চন্দ্রশেখর। সংবাদ সংস্থা এএনআই-কে দেওয়া এক বিশেষ সাক্ষাৎকারে তিনি বিজয়ের দীর্ঘদিনের আত্মবিশ্বাসের কথা তুলে ধরেন। চন্দ্রশেখর জানান, বিজয়ের এই জয় কোনো আকস্মিক ফলাফল নয়, বরং এটি তাঁর দীর্ঘমেয়াদী লক্ষ্য ও অবিচল বিশ্বাসের ফসল।
সাক্ষাৎকারে চন্দ্রশেখর বলেন:
“আমি আমার ছেলের এই সাফল্যে অত্যন্ত গর্বিত ও আনন্দিত। গত দুই বছর ধরে আমি লক্ষ্য করেছি ওর আত্মবিশ্বাস কতটা দৃঢ়। ও আগেই আমাকে বলেছিল—’আমি তামিলনাড়ুর মুখ্যমন্ত্রী হব’। এই লক্ষ্যের প্রতি ওর মনে বিন্দুমাত্র সন্দেহ ছিল না।”
তিনি আরও উল্লেখ করেন যে, তামিলনাড়ুর প্রথাগত বড় কোনো রাজনৈতিক শক্তির সঙ্গে জোট না করে এককভাবে লড়াই করার যে সাহস বিজয় দেখিয়েছেন, তা সমকালীন রাজনীতিতে বিরল। বিজয়ের মা শোভা চন্দ্রশেখরও ছেলের এই সাফল্যে আনন্দ প্রকাশ করেছেন এবং একে তামিলনাড়ুর জনগণের জন্য এক নতুন আশার আলো হিসেবে অভিহিত করেছেন।
২০২৬ সালের তামিলনাড়ু বিধানসভা নির্বাচনে মোট ২৩৪টি আসনের বিপরীতে একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেতে প্রয়োজন ১১৮টি আসন। প্রাথমিক গণনার তথ্য অনুযায়ী, থালাপতি বিজয়ের দল ‘টিভিকে’ সরকার গঠনের জন্য প্রয়োজনীয় এই জাদুর সংখ্যার চেয়েও বেশি আসনে এগিয়ে রয়েছে। স্থানীয় সংবাদমাধ্যম ও ইন্ডিয়া টুডে-র বিশ্লেষণে দেখা গেছে, বিজয়ের দল রাজ্যের গ্রামীণ ও শহর—উভয় অঞ্চলেই ব্যাপক জনসমর্থন আদায় করতে সক্ষম হয়েছে।
তামিলনাড়ুর রাজনীতি দীর্ঘ কয়েক দশক ধরে ডিএমকে (DMK) এবং এআইএডিএমকে (AIADMK)—এই দুই দলের মেরুকরণে সীমাবদ্ধ ছিল। বিজয়ের এই উত্থান সেই দ্বিমেরু রাজনীতির অবসান ঘটিয়ে এক নতুন যুগের সূচনা করতে যাচ্ছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। বিশেষ করে তরুণ প্রজন্মের ভোটারদের মধ্যে বিজয়ের জনপ্রিয়তা তাঁর দলকে এই বিশাল ব্যবধানে এগিয়ে দিয়েছে।
বিজয়ের সম্ভাব্য জয়ের খবর ছড়িয়ে পড়তেই রাজধানী চেন্নাইয়ে তাঁর বাসভবনের সামনে হাজার হাজার ভক্ত ও সমর্থক ভিড় জমাতে শুরু করেছেন। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে এবং শৃঙ্খলা বজায় রাখতে স্থানীয় প্রশাসনের পক্ষ থেকে ব্যাপক নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে। বিজয়ের বাড়ির চারপাশে নিয়মিত পুলিশের পাশাপাশি অতিরিক্ত আধা-সামরিক বাহিনী ও নিরাপত্তাকর্মী মোতায়েন করা হয়েছে।
চেন্নাইয়ের পানাইউরে অবস্থিত বিজয়ের রাজনৈতিক কার্যালয়ের সামনেও সমর্থকরা বাজি পুড়িয়ে এবং মিষ্টি বিতরণ করে উদ্যাপন করছেন। সাধারণ মানুষের এই স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ প্রমাণ করে যে, বিজয়ের রাজনৈতিক দর্শনের প্রতি সাধারণ জনগণের গভীর আস্থা তৈরি হয়েছে।
বিজয়ের এই ঐতিহাসিক মুহূর্তে দক্ষিণ ভারতীয় চলচ্চিত্র জগতের বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গ তাঁকে অভিনন্দন জানাতে শুরু করেছেন। অভিনেতা নানি এবং পরিচালক ভেঙ্কট প্রভু সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিজয়ের নেতৃত্বের প্রশংসা করেছেন। তবে এই উত্তেজনার মাঝে সবচেয়ে বেশি আলোচনার জন্ম দিয়েছে বিজয়ের দীর্ঘদিনের সহ-অভিনেত্রী এবং ঘনিষ্ঠ বন্ধু তৃষা কৃষ্ণানের উপস্থিতি। রাজনৈতিক এই ডামাডোলের মধ্যেই তৃষাকে বিজয়ের বাসভবনে দেখা গেছে, যা ভক্তদের মধ্যে বাড়তি কৌতূহলের সৃষ্টি করেছে।
যদি বর্তমান গণনার প্রবণতা বজায় থাকে, তবে থালাপতি বিজয় তামিলনাড়ুর পরবর্তী মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে শপথ নিতে যাচ্ছেন। এটি কেবল বিজয়ের ব্যক্তিগত ক্যারিয়ারে এক নতুন অধ্যায় নয়, বরং দক্ষিণ ভারতের রাজনীতিতে সিনেমার জনপ্রিয়তাকে রাজনৈতিক শক্তিতে রূপান্তরের এক সফলতম উদাহরণ হিসেবে চিহ্নিত হবে। বিজয়ের দল ‘টিভিকে’ শিক্ষা, কৃষি এবং রাজ্যের স্বায়ত্তশাসনের মতো বিষয়গুলোতে বিশেষ জোর দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল, যা সাধারণ ভোটারদের আকৃষ্ট করেছে।
সার্বিকভাবে, ২০২৬ সালের এই বিধানসভা নির্বাচন তামিলনাড়ুর রাজনৈতিক মানচিত্রে এক বিশাল রদবদল ঘটিয়েছে। থালাপতি বিজয়ের এই যাত্রা সিনেমার রুপালি পর্দা থেকে শুরু করে এখন রাজ্য পরিচালনার কেন্দ্রবিন্দুতে পৌঁছানোর পথে। চূড়ান্ত ফলাফল ঘোষণার পর আনুষ্ঠানিকভাবে তামিলনাড়ুর নতুন মন্ত্রিসভা গঠনের প্রক্রিয়া শুরু হবে বলে আশা করা হচ্ছে।