খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: মঙ্গলবার, ২ জুন ২০২৬
ফিফা বিশ্বকাপ ২০২৬-কে কেন্দ্র করে অংশগ্রহণকারী দেশগুলোর চূড়ান্ত স্কোয়াড ঘোষণার সাথে সাথেই বিশ্ব ফুটবলে এক নতুন কীর্তি গড়েছে ব্রাজিল। এবারের বিশ্বকাপে বিভিন্ন দেশের জাতীয় দলে সুযোগ পাওয়া ফুটবলারদের মধ্যে রেকর্ড সংখ্যক ৩২ জন খেলোয়াড় ব্রাজিলের ঘরোয়া শীর্ষ ফুটবল লিগ (সিরি’আ)-এ খেলছেন। এর মাধ্যমে ব্রাজিলের ঘরোয়া ফুটবল লিগ ভেঙে দিয়েছে দীর্ঘ ৫২ বছরের পুরোনো একটি ঐতিহাসিক রেকর্ড।
ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট ও রেকর্ডের পরিসংখ্যান:
পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, এর আগে ১৯৭৪ সালের বিশ্বকাপে ব্রাজিলিয়ান লিগ সিরি’আ থেকে সর্বোচ্চ ২৭ জন ফুটবলার বিভিন্ন দেশের জাতীয় দলে খেলার সুযোগ পেয়েছিলেন। এরপর ১৯৮৬ সালের বিশ্বকাপে সেই সংখ্যাটি ছিল ২৫। দীর্ঘ সময় পর বিগত ২০২২ সালের কাতার বিশ্বকাপে এই সংখ্যাটি নাটকীয়ভাবে হ্রাস পেয়ে মাত্র সাতজনে নেমে এসেছিল। তবে মাত্র চার বছরের ব্যবধানে ২০২৬ বিশ্বকাপে সেই সংখ্যাটি সাড়ে চার গুণেরও বেশি বৃদ্ধি পেয়ে রেকর্ডসংখ্যক ৩২-এ উন্নীত হয়েছে।
অর্থনৈতিক ও কাঠামোগত পরিবর্তনের কারণ:
এই অভাবনীয় পরিবর্তনের পেছনে ক্রীড়া বিশ্লেষক ও অর্থনীতিবিদরা বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ কারণ চিহ্নিত করেছেন। ব্রাজিলের ঘরোয়া ফুটবলে সাম্প্রতিক সময়ে বড় অঙ্কের প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগ, ক্লাবগুলোর আর্থিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিতকরণ এবং ফুটবল করপোরেশন (এসএএফ – SAF) ব্যবস্থার আধুনিকায়ন ও কাঠামোগত উন্নয়ন এই অগ্রগতির প্রধান চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করেছে। এছাড়া টেলিভিশন সম্প্রচার স্বত্বের আয় বৃদ্ধি এবং বিভিন্ন বেটিং কোম্পানির বিপুল অঙ্কের স্পনসরশিপ ক্লাবগুলোর অর্থনৈতিক সক্ষমতাকে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে উন্নীত করেছে।
ক্রীড়া অর্থনীতি বিশেষজ্ঞ মোইসেস আসায়াগের মতে, ২০২৪ সালের প্রথম ট্রান্সফার উইন্ডো থেকেই এই বড় পরিবর্তনের সূচনা ঘটেছিল। ফুটবল অ্যানোনিমাস করপোরেশন বা এসএএফ (SAF) ব্যবস্থার পরিপক্বতা এবং বেটিং প্রতিষ্ঠানগুলোর ব্যাপক বিনিয়োগের ফলে ব্রাজিলিয়ান ফুটবলে অর্থের প্রবাহ বিপুল পরিমাণে বৃদ্ধি পায়। এটি ক্লাবগুলোর পেশাদার ব্যবস্থাপনা এবং খেলোয়াড় ধরে রাখার বা কেনার ক্ষমতাকে বহুগুণ শক্তিশালী করেছে।
ইউরোপের ইংলিশ প্রিমিয়ার লিগের (EPL) মতোই বর্তমানে ব্রাজিলিয়ান চ্যাম্পিয়নশিপ বা সিরি’আ-কে দক্ষিণ আমেরিকার সবচেয়ে শক্তিশালী ও প্রভাবশালী ফুটবল বাজার হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। অ্যাথলেট ম্যানেজমেন্ট প্রতিষ্ঠান ‘রক নেশন’-এর অংশীদার মার্কোস কাসেব এই প্রসঙ্গে উল্লেখ করেন, ব্রাজিল এখন এমন একটি ফুটবল বাজারে পরিণত হয়েছে যা বিশ্বমানের খেলোয়াড়দের আকর্ষণ করে, তাদের প্রতিভা বিকাশ করে, বিশ্বমঞ্চে পরিচিতি দেয় এবং পরবর্তী সময়ে উচ্চ মূল্যে বিক্রি করে। দক্ষিণ আমেরিকার সামগ্রিক ফুটবল বাজারে ব্রাজিলের প্রতিদ্বন্দ্বী বর্তমানে খুবই কম।
দেশি-বিদেশি তারকাদের লিগে অন্তর্ভুক্তি:
বর্তমানে কেবল তরুণ ও উদীয়মান ফুটবলাররাই নন, বরং ইউরোপের বিভিন্ন লিগে প্রতিষ্ঠিত ফুটবল তারকারাও ব্রাজিলের ঘরোয়া লিগে ফিরছেন। চলমান মৌসুমে ফ্ল্যামেঙ্গো ৪ কোটি ২০ লাখ ইউরো ব্যয় করে লুকাস পাকেতাকে দলে ফিরিয়ে এনেছে। এর আগে পালমেইরাস ২০ বছর বয়সী তরুণ প্রতিভা ভিতর রোকে-কে ২ কোটি ৫৫ লাখ ইউরো খরচ করে নিজেদের স্কোয়াডে যুক্ত করে। এছাড়া ক্রুজেইরো তাদের দলে নিয়েছে গেরসনকে এবং বোটাফোগো চুক্তিবদ্ধ করেছে দানিলো সান্তোসকে।
শুধু ব্রাজিলের নিজস্ব খেলোয়াড়ই নন, বিশ্বমানের বিদেশি ফুটবলারদের নিয়মিত আগমনও এই লিগের গুণগত মান ও জনপ্রিয়তা বৃদ্ধি করেছে। নিকোলাস দে লা ক্রুস, রামন সোসা, গনসালো প্লাতা এবং মেমফিস ডিপাইয়ের মতো আন্তর্জাতিক তারকারা বর্তমানে ব্রাজিলের ঘরোয়া ক্লাবগুলোতে খেলছেন এবং তারা নিজ নিজ দেশের হয়ে ২০২৬ বিশ্বকাপে প্রতিনিধিত্ব করার জন্য নির্বাচিত হয়েছেন।
এবারের বিশ্বকাপে ব্রাজিলের ঘরোয়া লিগ থেকে সবচেয়ে বেশি খেলোয়াড় সরবরাহকারী ক্লাবের তালিকায় শীর্ষে রয়েছে ফ্ল্যামেঙ্গো। এই ক্লাবটি থেকে মোট নয়জন ফুটবলার বিভিন্ন দেশের জাতীয় দলের হয়ে মাঠ কাঁপাবেন। দ্বিতীয় সর্বোচ্চ অবস্থানে থাকা পালমেইরাস থেকে খেলবেন সাতজন খেলোয়াড়।
বিশ্বকাপ ২০২৬-এ ব্রাজিলের শীর্ষ লিগের ক্লাবভিত্তিক খেলোয়াড় সরবরাহের চিত্র নিচে সারণীর মাধ্যমে উপস্থাপন করা হলো:
| ক্লাবের নাম | বিশ্বকাপে অংশগ্রহণকারী খেলোয়াড় সংখ্যা |
| ফ্ল্যামেঙ্গো | ০৯ জন |
| পালমেইরাস | ০৭ জন |
| অ্যাতলেতিকো মিনেইরো | ০৪ জন |
| গ্রেমিও | ০২ জন |
| ইন্টারনাসিওনাল | ০২ জন |
| অন্যান্য ক্লাব | ০৮ জন |
| সর্বমোট | ৩২ জন |
বিশ্বমঞ্চে নতুন দিগন্ত:
বিশ্বকাপ ২০২৬-এর স্কোয়াডে ডাক পাওয়া ব্রাজিল জাতীয় দলের শীর্ষ তারকাদের মধ্যে নেইমার, লুকাস পাকেতা, লিও পেরেইরা, দানিলো এবং আলেক্স সান্দ্রোর মতো খেলোয়াড়রা এবার ব্রাজিলিয়ান লিগের ক্লাবগুলো থেকেই সরাসরি বিশ্বকাপে অংশ নিচ্ছেন। দীর্ঘদিন পর বিশ্ব ফুটবলের সবচেয়ে বড় এই মঞ্চে ব্রাজিলের ঘরোয়া লিগ নিজেদের একটি অত্যন্ত শক্তিশালী ও মর্যাদাপূর্ণ অবস্থান পুনরুত্থাপন করতে সক্ষম হয়েছে।
ফুটবল এজেন্ট ক্লদিও ফিওরিতোর মতে, বর্তমানে ব্রাজিলিয়ান লিগে খেলা মানে জাতীয় দলের নির্বাচকদের রাডারে বা আরও কাছাকাছি থাকা। এই লিগটি আবারও বিশ্বমানের ফুটবলারদের জন্য একটি অত্যন্ত আকর্ষণীয় প্রদর্শনী মঞ্চে (Showcase) পরিণত হয়েছে। ২০২৬ সালের বিশ্বকাপের স্কোয়াডগুলোতে রেকর্ড সংখ্যক খেলোয়াড় প্রেরণের মাধ্যমে ব্রাজিলিয়ান চ্যাম্পিয়নশিপ এটিই প্রমাণ করেছে যে, দক্ষিণ আমেরিকার ফুটবলে তাদের আর্থিক ও কৌশলগত প্রভাব আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে অনেক বেশি সুসংহত ও শক্তিশালী।