খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: বুধবার, ৩ জুন ২০২৬
ভারতের রাজধানী নয়াদিল্লির মালবীয় নগর এলাকায় অবস্থিত একটি আবাসিক হোটেলে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে। এই মর্মান্তিক দুর্ঘটনায় এ পর্যন্ত ২১ জনের মৃত্যু নিশ্চিত করা হয়েছে। অগ্নিকাণ্ডে আহতদের মধ্যে ৫ জন বাংলাদেশি নাগরিক রয়েছেন বলে আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত করেছে নয়াদিল্লিতে অবস্থিত বাংলাদেশ হাই কমিশন। বুধবার সকালে দিল্লির হাউজ রানি এলাকার একটি পাঁচতলা ‘বেড অ্যান্ড ব্রেকফাস্ট’ নামক হোটেল ভবনে এই অগ্নিকাণ্ডের সূত্রপাত হয় এবং তা দ্রুত পুরো ভবনে ছড়িয়ে পড়ে।
ভারতীয় সংবাদমাধ্যম হিন্দুস্তান টাইমসের প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুযায়ী, এই অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় যারা প্রাণ হারিয়েছেন, তাদের মধ্যে ১৮ জনই বিদেশি নাগরিক। নিহত এই বিদেশি নাগরিকদের মধ্যে বাংলাদেশ, নাইজেরিয়া, মোজাম্বিক, সোমালিয়া, লাইবেরিয়া এবং আফগানিস্তানের নাগরিক রয়েছেন বলে জানা গেছে। তবে ঠিক কোন দেশের কতজন নাগরিক নিহত হয়েছেন, সেই নির্দিষ্ট সংখ্যা বা পরিচয় এখন পর্যন্ত সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে নিশ্চিত করা হয়নি। অগ্নিকাণ্ডের এই ঘটনায় আহত অন্তত ১৭ জন ব্যক্তিকে উদ্ধার করে স্থানীয় বিভিন্ন হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে, যেখানে তাদের চিকিৎসা চলছে।
ভারতীয় সংবাদমাধ্যম রিপাবলিকের এক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, এই দুর্ঘটনায় নিহত ও আহত হওয়া বিদেশি নাগরিকদের বেশিরভাগই মূলত চিকিৎসার উদ্দেশ্যে দিল্লিতে এসেছিলেন এবং তারা সাময়িকভাবে ওই হোটেলে অবস্থান করছিলেন। বাংলাদেশ হাই কমিশনের দেওয়া সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, আহত পাঁচজন বাংলাদেশি নাগরিককে দিল্লির প্রসিদ্ধ ম্যাক্স হাসপাতাল এবং সফদরজং হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে এবং সেখানে তাদের প্রয়োজনীয় চিকিৎসা সেবা দেওয়া হচ্ছে।
অগ্নিকাণ্ডের খবর পাওয়ার পরপরই স্থানীয় পুলিশ এবং ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছে আগুন নিয়ন্ত্রণ এবং আটকা পড়া বাসিন্দাদের উদ্ধার অভিযান শুরু করেন। উদ্ধার অভিযান পরিচালনাকালে আগুন নিয়ন্ত্রণ করতে গিয়ে এবং ভেতরে আটকা পড়াদের বের করে আনার সময়ে অন্তত ১০ জন পুলিশ সদস্য গুরুতর আহত হয়েছেন বলে পুলিশ প্রশাসনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে। আহত সেই পুলিশ সদস্যদেরও উদ্ধার করে চিকিৎসার আওতায় আনা হয়েছে।
দুর্ঘটনার পর প্রাথমিক তদন্তে গ্যাস সিলিন্ডার বিস্ফোরণকে অগ্নিকাণ্ডের সম্ভাব্য কারণ হিসেবে সন্দেহ করা হয়েছিল। তবে তদন্তকারীরা এখন ভবনের ভেতরের বৈদ্যুতিক লাইনের শর্ট সার্কিটকেই আগুনের সম্ভাব্য মূল উৎস হিসেবে বিবেচনা করছেন। ঘটনার শুরুতে ধারণা করা হয়েছিল যে, আগুন প্রথমে হোটেলের পাশে অবস্থিত ‘লেমন গ্রিন’ নামক একটি রেস্তোরাঁ থেকে ছড়িয়ে পড়েছিল। তবে দিল্লি পুলিশ পরবর্তীতে এক বিবৃতির মাধ্যমে জানায় যে, প্রাথমিক ওই ধারণাটি সঠিক নয় এবং আগুনের প্রকৃত সূত্রপাত মূলত হোটেল ভবনের ভেতরের অংশ থেকেই হয়েছিল।
তদন্তকারী কর্মকর্তাদের প্রাথমিক অনুসন্ধানে ওই আবাসিক হোটেলের ব্যাপক বাণিজ্যিক অনিয়ম ও নিরাপত্তা ত্রুটির তথ্য উঠে এসেছে। তদন্তে জানা গেছে, ভবনটিতে মাত্র ছয়টি কক্ষ পরিচালনার জন্য বৈধ অনুমোদন বা লাইসেন্স দেওয়া হয়েছিল। তবে সেই আইনি অনুমোদন অমান্য করে হোটেল কর্তৃপক্ষ সেখানে নিয়মনীতি বহির্ভূতভাবে প্রায় ২৫টি কক্ষ তৈরি করে বাণিজ্যিক কার্যক্রম পরিচালনা করে আসছিল। এই অতিরিক্ত কক্ষ নির্মাণের ফলে হোটেলটির অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা এবং জরুরি বহির্গমনের মতো বাধ্যতামূলক নিরাপত্তা বিধিগুলো সঠিকভাবে মানা হয়েছিল কি না, তা নিয়ে গভীর প্রশ্ন উঠেছে।
ভারতে বিভিন্ন বাণিজ্যিক ও আবাসিক হোটেলে অগ্নি-নিরাপত্তা বিধি লঙ্ঘনের এই ধরনের অভিযোগ নতুন কোনো বিষয় নয়। দিল্লির সংশ্লিষ্ট সরকারি কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, এই মর্মান্তিক দুর্ঘটনার প্রেক্ষিতে হোটেলটির ব্যবসায়িক লাইসেন্স, কক্ষ পরিচালনার অনুমোদন এবং ফায়ার সার্ভিসের পক্ষ থেকে দেওয়া অগ্নিনিরাপত্তা সনদ বা ছাড়পত্র সঠিকভাবে যাচাই করে দেখা হচ্ছে। ঘটনার পেছনে দায়ীদের চিহ্নিত করতে আইনি তদন্ত অব্যাহত রয়েছে।