খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: রবিবার, ২১ জুন ২০২৬
বাংলা কবিতার আকাশে উজ্জ্বল অথচ ক্ষণজন্মা এক নক্ষত্রের নাম রুদ্র মুহাম্মদ শহীদুল্লাহ। প্রেম, দ্রোহ, স্বপ্ন, সংগ্রাম ও মানবমুক্তির আকাঙ্ক্ষাকে তিনি এমন শক্তিশালী ভাষায় প্রকাশ করেছিলেন যে তাঁকে বলা হয় বাংলা সাহিত্যের ‘প্রতিবাদী রোমান্টিক কবি’।
দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর অবশেষে তাঁর মৃত্যুর তেত্রিশ বছর পরে বাংলাদেশ সরকার তাঁকে একুশে পদক ২০২৪-এ ভূষিত করে। এই সম্মান তাঁর অসামান্য সাহিত্যিক অবদান ও গণমানুষের চেতনার কবি হিসেবে তাঁর মর্যাদাকেই পুনঃপ্রতিষ্ঠিত করেছে।
রুদ্র মুহাম্মদ শহীদুল্লাহ জন্মগ্রহণ করেন ১৯৫৬ সালের ১৬ অক্টোবর, তৎকালীন বরিশাল জেলায়। তবে তাঁর পৈতৃক নিবাস ছিল বাগেরহাট জেলার মংলা উপজেলার মিঠেখালি গ্রামে। শৈশব থেকেই সাহিত্য ও সংস্কৃতির প্রতি তাঁর গভীর অনুরাগ ছিল। তিনি ঢাকার ওয়েস্ট এন্ড হাই স্কুল থেকে ১৯৭৩ সালে এসএসসি এবং ১৯৭৫ সালে এইচএসসি পাস করেন। পরবর্তীতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলা ভাষা ও সাহিত্যে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন।
আশির দশকে কবিকণ্ঠে কবিতা পাঠের যে আন্দোলন জনপ্রিয়তা লাভ করেছিল, রুদ্র ছিলেন তার অন্যতম প্রাণপুরুষ। তাঁর কণ্ঠে উচ্চারিত কবিতা শুধু সাহিত্যপ্রেমীদের নয়, সাধারণ মানুষের হৃদয়ও আন্দোলিত করত। তাঁর কবিতায় যেমন ছিল প্রেমের কোমলতা, তেমনি ছিল অন্যায় ও শোষণের বিরুদ্ধে প্রতিবাদের বজ্রকণ্ঠ।
তাঁর অমর পঙক্তি—
“যে মাঠ থেকে এসেছিল স্বাধীনতার ডাক,
সে মাঠে আজ বসে নেশার হাট”
এবং
“আজো আমি বাতাসে লাশের গন্ধ পাই”
বাংলাদেশের সামাজিক ও রাজনৈতিক বাস্তবতার বিরুদ্ধে এক তীব্র প্রতিবাদ হিসেবে আজও সমানভাবে প্রাসঙ্গিক।
কবি রুদ্রের ব্যক্তিজীবনও ছিল আলোচিত। তিনি ১৯৮১ সালে প্রখ্যাত লেখিকা তসলিমা নাসরিন-কে ভালোবেসে বিবাহ করেন। তবে তাঁদের সেই সম্পর্ক ১৯৮৬ সালে বিচ্ছেদে পর্যবসিত হয়। ব্যক্তিগত জীবনের নানা টানাপোড়েন তাঁর কবিতায় গভীর প্রভাব ফেলেছিল।
মাত্র ৩৫ বছরের সংক্ষিপ্ত জীবনে তিনি বাংলা সাহিত্যকে সমৃদ্ধ করেছেন সাতটি কাব্যগ্রন্থ, একটি কাব্যনাট্য, গল্প এবং অর্ধশতাধিক গান রচনার মাধ্যমে। তাঁর লেখা ও সুর করা গান “ভালো আছি ভালো থেকো” আজও বাংলা গানের ভুবনে অমলিন।
১৯৯১ সালের ২১ জুন, এই দিনে, তিনি পৃথিবীর মায়া ত্যাগ করেন। কিন্তু মৃত্যু তাঁকে মুছে দিতে পারেনি। তাঁর কবিতা, গান ও সংগ্রামী চেতনা আজও নতুন প্রজন্মকে সাহস জোগায়, অন্যায়ের বিরুদ্ধে মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে শেখায়।
কবি রুদ্রের স্মৃতিকে ধারণ করে তাঁর জন্মভূমি মংলার মিঠেখালিতে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে রুদ্র স্মৃতি সংসদ, যা তাঁর সাহিত্য ও আদর্শকে নতুন প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দেওয়ার কাজ করে যাচ্ছে।
আজ তাঁর প্রয়াণদিবসে গভীর শ্রদ্ধায় স্মরণ করি সেই দ্রোহী কবিকে, যিনি প্রেমকে করেছেন সংগ্রামের ভাষা, আর প্রতিবাদকে দিয়েছেন কবিতার সৌন্দর্য।
শ্রদ্ধাঞ্জলি, কবি রুদ্র মুহাম্মদ শহীদুল্লাহ।
“মানুষের কাছে মানুষের ঋণ শোধ হয় না কখনও;
তবু তোমার কবিতা আমাদের বিবেককে আজও জাগিয়ে রাখে।”