খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: মঙ্গলবার, ২৩ জুন ২০২৬
বাংলাদেশি কর্মীদের জন্য আন্তর্জাতিক শ্রমবাজারের একটি সম্ভাবনাময় এবং আকর্ষণীয় গন্তব্য হয়ে উঠেছে ইউরোপের দেশ পর্তুগাল। দেশটিতে চলমান তীব্র শ্রমিক সংকটের কারণে বিভিন্ন খাতে বিদেশি কর্মী নিয়োগের সুযোগ দিন দিন বাড়ছে। এর ফলে দক্ষ বাংলাদেশি কর্মীদের জন্য সেখানে পেশাগতভাবে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার এক নতুন দুয়ার উন্মোচন হয়েছে।
জনশক্তি বিশেষজ্ঞরা জানাচ্ছেন, পর্তুগালে বর্তমানে সবচেয়ে বেশি কর্মীর চাহিদা রয়েছে আবাসন বা নির্মাণশিল্প, আধুনিক কৃষি, হোটেল-রেস্তোরাঁ, গণপরিবহন এবং বিভিন্ন উৎপাদনমুখী কলকারখানায়। এর বাইরে আইটি খাত, ইঞ্জিনিয়ারিংসহ উচ্চ দক্ষতাসম্পন্ন পেশাতেও এখন প্রচুর বিদেশি কর্মী নেওয়া হচ্ছে। তবে এই সুযোগগুলো শতভাগ কাজে লাগাতে হলে সঠিক কাজের দক্ষতা, ইংরেজি বা পর্তুগিজ ভাষার ওপর দখল এবং সম্পূর্ণ বৈধ প্রক্রিয়ায় অভিবাসনের প্রস্তুতি নেওয়া জরুরি।
পর্তুগালে থাকা প্রবাসী বাংলাদেশি শিক্ষার্থীরা মূলত দুটি উপায়ে বিশ্বের নামকরা কোম্পানিগুলোতে ভালো মানের চাকরির জন্য আবেদন করতে পারেন। প্রথম ও প্রধান পদ্ধতিটি হলো ‘ইকুইভ্যালেন্স’ বা সমমান প্রক্রিয়া। এই নিয়মের অধীনে একজন বিদেশি নাগরিক পর্তুগালের ‘ডিক্রি-ল নম্বর ২৩৮/৮৩’ আইন অনুযায়ী তাঁর নিজ দেশের ডক্টরেট, মাস্টার্স কিংবা ব্যাচেলর ডিগ্রির সনদকে পর্তুগিজ শিক্ষার সমমান সনদে রূপান্তর করতে পারেন। এর জন্য লিসবন বিশ্ববিদ্যালয়ের অফিশিয়াল পোর্টালে অনলাইনের মাধ্যমে আবেদন করতে হয়। তবে এই সুযোগ পেতে শিক্ষার্থীর অবশ্যই দেশটিতে বৈধভাবে থাকার রেসিডেন্স পারমিট বা বসবাসের অনুমতি থাকতে হবে। কারণ, ইউরোপীয় কোম্পানিগুলো ইন্টারভিউ নেওয়ার আগেই প্রার্থীর কাজের আইনি অনুমতি আছে কি না, তা কড়াভাবে যাচাই করে।
বাংলাদেশি শিক্ষাগত সনদকে পর্তুগিজ সমমানে রূপান্তর করার একটি নির্দিষ্ট আইনি প্রক্রিয়া রয়েছে। প্রথমেই সনদটি একজন অনুমোদিত আইনজীবীর মাধ্যমে পর্তুগিজ ভাষায় অনুবাদ এবং নোটারি করে নিতে হবে। এরপর পর্তুগালে অবস্থিত বাংলাদেশ দূতাবাস থেকে আসল সনদ যাচাই করিয়ে দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে সেটি সত্যায়িত করতে হবে। এই অনলাইন প্রক্রিয়ার জন্য একটি অফেরতযোগ্য ফি নির্ধারণ করা আছে; যা ডক্টরেট ডিগ্রির জন্য ৬০০ ইউরো, মাস্টার্সের জন্য ৫৫০ ইউরো এবং ব্যাচেলর ডিগ্রির জন্য ৫০০ ইউরো।
পর্তুগালে চাকরি পাওয়ার পর কোনো অনুমোদিত প্রতিষ্ঠান থেকে আনুষ্ঠানিক অফার লেটার বা কাজের চুক্তিপত্র পেলে তবেই মূল কাজের ভিসা প্রক্রিয়া শুরু করা যায়। সাধারণত নিয়োগকর্তা প্রতিষ্ঠানই কর্মীর পক্ষ হয়ে পর্তুগিজ সরকারের কাছে ওয়ার্ক পারমিটের জন্য আবেদন করে থাকে। ভিসা আবেদনের জন্য বৈধ পাসপোর্ট, চাকরির চুক্তিপত্র, পুলিশ ক্লিয়ারেন্স সার্টিফিকেট, জীবনবৃত্তান্ত এবং পূর্ব কাজের অভিজ্ঞতার প্রমাণপত্র জমা দিতে হয়। কর্মক্ষেত্রে ভালো করতে পর্তুগিজ ভাষা জানা থাকলে তা সবচেয়ে বেশি সুবিধা দেয়।
দেশটির বর্তমান বেতন কাঠামোও বেশ চমৎকার। সাধারণ বা অদক্ষ কাজের ক্ষেত্রে একজন কর্মী মাসে প্রায় ৯২০ থেকে ১০০০ ইউরো পর্যন্ত আয় করতে পারেন। অন্যদিকে, প্রযুক্তিগত বা বিশেষায়িত খাতে দক্ষ কর্মীদের মাসিক আয় ১২০০ থেকে শুরু করে ৩০০০ ইউরো বা তারও বেশি হতে পারে।
তবে পর্তুগাল যাওয়ার ক্ষেত্রে বা সেখানে চাকরি খোঁজার নামে বড় ধরনের প্রতারণার ঝুঁকিও রয়েছে। ভুয়া দালাল ও অবৈধ এজেন্সির খপ্পরে পড়ে অনেকেই মোটা অঙ্কের টাকা হারাচ্ছেন। তাই সংশ্লিষ্টরা সবসময় সরাসরি নির্ভরযোগ্য জব পোর্টাল বা কোম্পানির নিজস্ব ওয়েবসাইটের মাধ্যমে যোগাযোগের পরামর্শ দেন। তা ছাড়া, সম্প্রতি পর্তুগাল সরকার তাদের ভিসা নীতিতে কিছুটা কড়াকড়ি এনেছে। বর্তমানে দেশটিতে ‘জব সিকার’ বা চাকরি খোঁজার সাময়িক ভিসা সীমিত করা হয়েছে। ফলে এখন আগে থেকেই চাকরি নিশ্চিত করে সরাসরি কাজের ভিসা নিয়ে আসার প্রবণতা ও প্রয়োজনীয়তা অনেক বেড়েছে।
পর্তুগালে সফল হওয়া বাংলাদেশি শিক্ষার্থী আফজাল উদ্দিন তাঁর ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা ভাগ করে নিতে গিয়ে জানান, তিনি ইউনিভার্সিটি অব নোভায় মাস্টার্স করতে পর্তুগালে এসেছিলেন। প্রথম দিকে ভাষা ও পরিবেশের কারণে পথ চলা বেশ কঠিন হলেও লিংকডইনের মতো পেশাদার প্ল্যাটফর্মে নিজের প্রোফাইল গুছিয়ে এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের বন্ধুদের সহযোগিতা নিয়ে তিনি ঘুরে দাঁড়ান। বেশ কয়েকটি ইন্টারভিউতে ব্যর্থ হলেও হাল ছাড়েননি তিনি। বর্তমানে পড়াশোনার পাশাপাশি তিনি একটি বেসরকারি সংস্থায় হিসাবরক্ষক হিসেবে সফলভাবে কাজ করছেন। সঠিক নিয়ম ও যোগ্যতা থাকলে যেকোনো বাংলাদেশির জন্যই পর্তুগাল একটি দারুণ সম্ভাবনার দেশ।