মনিরুজ্জামান
প্রকাশ: সোমবার, ৩১ মার্চ ২০২৫
ঈদুল ফিতর এলেই বাঙালি মুসলমান পরিবারে বিয়ের ধুম পড়ে যায়। রমজান মাসে সিয়াম সাধনায় থাকেন বলে সামাজিক অনুষ্ঠানাদি থেকে একটু দূরে থাকেন। কিন্তু অনেকেই অপেক্ষায় থাকেন কখন এই রমজান মাস শেষ হবে আর কখন তার বিয়ের অনুষ্ঠান সম্পূর্ণ হবে। ঈদ-পরবর্তী সময়ে দ্রুত অনুষ্ঠান শেষের নিমিত্তে রমজানেই অগ্রিম হিসাব-নিকাশ করে থাকেন। সম্পূর্ণ আয়োজন কীভাবে করা হবে, তার একটা খসরা অনেক আগে থেকেই করে থাকেন। যেন অনুষ্ঠানে কোনোরূপ ত্রুটি না হয়। অনুষ্ঠানে লোকজনকে দাওয়াত করা, কে কী কাজ করবেন, তা গুছিয়ে রাখতে দিনরাত অবিরাম কাজ করে যাচ্ছেন অভিভাবকেরা। বিয়ের বর-কনেদের তো আর আনন্দের সীমা নেই। কিছুদিন পরই শুরু হবে নতুন মানুষদের নিয়ে নতুন পরিবার, নতুন সংসার। প্রশ্নটি একটু পর করা যাবে, আগে বাইবেলের একটি অমর বাণী শুনি :
‘আমি তোমাদিগকে বলিতেছি, যে কেউ কোনো স্ত্রীলোকের প্রতি কামভাবে দৃষ্টিপাত করে, সে তখনই মনে মনে তাহার সহিত ব্যভিচার করিল।”
(মথি লিখিত সুসমাচার ৫ : ২৮)
সিয়াম সাধনা মানে জাগতিক বিষয়াদি থেকে বিরত থাকা। নিজেকে জানার জন্য বস্তুগত চিন্তা থেকে নিজেকে সরিয়ে ভাববাদে নিমজ্জিত থাকার প্রচেষ্টা। বাহ্যিকভাবে আমরা আর কতটুকুই-বা কাজ করি? কিন্তু আমাদের চিন্তা আমাদের অবচেতনে অনবরত এক বিষয় থেকে অন্য বিষয়ে গমন করেছে। চিন্তার এক বিষয় থেকে অন্য বিষয়ে গমন নিজের এক ভাব থেকে অন্য ভাবে রূপান্তরিত হওয়ার দিকে মনোযোগ দিলেই উক্ত বিষয় থেকে বিরত থাকা যায়।
বাইবেলের বাণীর সূত্র ধরেই বলি, মনে মনে যদি কোনো স্ত্রীলোকের দিকে কামুকতার দৃষ্টি নিক্ষেপ করা হয়, তখনই তার সঙ্গে ব্যভিচার করা হয়। তাহলে রমজান-পরবর্তী সময়ে বিয়ে করার চিন্তা করা মানে তখনই বিয়ে করে ফেলা। যেখানে বিষয়াদি থেকে দূরে থাকার কথা, সেখানে দিনরাত চিন্তা হয় বিয়ে নিয়ে। তার চেয়ে বরং দেরি না করে তখনই তার বিয়ে করে ফেলা উচিত।
যদি কামুকতার দৃষ্টি নিয়ে কোনো স্ত্রীলোকের দিকে তাকানো মানে তার সঙ্গে তাৎক্ষণিক ব্যভিচারে লিপ্ত হওয়া বোঝায়, তাহলে বস্তুগত কোনো চিন্তা করা মানেই তার সঙ্গে একাত্ম হয়ে যাওয়া।
টলস্টয়ের শৈল্পিক হাতের ভাষায় :
‘লালসার সঙ্গে স্ত্রীলোকের দিকে তাকানো মানেই তার সঙ্গে ব্যভিচার করা— শুধু যে পরস্ত্রীর বেলায় খাটে তা নয়, প্রধানত সেটা প্রযোজ্য আমাদের নিজেদের স্ত্রীর বেলায়।’
বিয়ে না করে জোরজবরদস্তি করে ব্রহ্মচর্য পালন করার পক্ষপাত আমার নেই। বাইবেলের পরের কথাটি শুনলেই বিষয়টি বোধগম্য হবে।
‘শিষ্যরা তাঁহাকে কহিলেন, যদি আপন স্ত্রীর সঙ্গে পুরুষের এইরূপ সম্বন্ধ হয়, তবে বিবাহ করা ভালো নয়?
তিনি তাহাদিগকে কহিলেন, সকলে এই কথা গ্রহণ করে না। কিন্তু যাহাদিগকে ক্ষমতা দত্ত হইয়াছে, তাহারাই করে।
কারণ, এমন নপুংসক আছে, যাহারা মাতার উদর হইতে সেইরূপ হইয়া জন্মিয়াছে; আর এমন নপুংসক আছে, যাহাদিগকে মানুষ নপুংসক করিয়াছে; আর এমন নপুংসক আছে, যাহারা স্বর্গরাজ্যের নিমিত্তে আপনাদিগকে নপুংসক করিয়াছে। যে গ্রহণ করিতে পারে, সে গ্রহণ করুক।’
(মথি লিখিত সুসমাচার ১৯ : ১০, ১১, ১২)
আমাদের দেশের যুবকেরা বিয়ে করার জন্য উঠেপড়ে লেগে যায়। দেখা যায় বিয়ের কিছুদিন পরই আবার কোর্টে দৌড়াতে হয়। বিয়ে-পরবর্তী টলস্টয় এবং পজদনিশেভের জীবন কেমন কেটেছিল, তা জেনে রাখা ভালো।
‘ক্রয়টজার সোনাটা’ নামক উপন্যাসটি টলস্টয় ১৮৯৮ সালে লিখেছিলেন। ১৯৯১ সালে গ্রন্থাকারে প্রথম প্রকাশের সঙ্গে সঙ্গে রাশিয়ার জার কর্তৃক অশ্লীলতার দায়ে বইটি নিষিদ্ধ করা হয়। পরবর্তী সময়ে টলস্টয়-পত্নী সোফিয়া জারের কাছ থেকে অনুমতি নিয়ে টলস্টয় রচনাবলিতে ছাপেন।
উপন্যাসের কাহিনি খুবই সংক্ষিপ্ত। কিন্তু টলস্টয়ের শৈল্পিক হাত গল্প বুননে পাঠককে বিমোহিত করেছে। একবার শুরু করলে শেষ পৃষ্ঠায় না যাওয়া পর্যন্ত উপায় থাকে না। উপন্যাসে কথকের নামের উল্লেখ নেই। কথক যার জীবনের গল্প শুনছেন, তার নাম পজদনিশেভ। উপন্যাসের প্রথম দিকের কাহিনি টলস্টয়ের বিবাহ-পরবর্তী জীবনের আদলেই লেখা।
উপন্যাসের মূল কাহিনি হচ্ছে, রাশিয়ার সম্ভ্রান্ত পরিবারের এক ভদ্রলোক সন্দেহের বশে তার স্ত্রীকে হত্যা করেন। সন্দেহের বিষয় হচ্ছে, তার স্ত্রী গোপনে ভায়োলিনবাদকের সঙ্গে প্রেম করছেন।
সুর এমন একটি বিষয়, যা পাষাণের ঘুম ভেঙে দেয়। বাঁশির সুর কে না পছন্দ করে। কৃষ্ণের বাঁশির সুরে কী জাদু আছে, তা একমাত্র রাধিকাই জানেন। ক্রয়টজার সোনাটা ভায়োলিন-পিয়ানোর একটি সুর। যেটি ধ্রুপদী সুর, বিঠোফেনের ভায়োলিন-পিয়ানো সোনাটা নামে পরিচিত। এই সুর শুনে পজদনিশেভের ভেতরের পশু জেগে ওঠে। সন্দেহ গাঢ় হয়, এই বুঝি তার স্ত্রী বাদকের সঙ্গে অপকর্মে লিপ্ত হয়েছে। তার স্ত্রী পিয়ানো বাজানো ছেড়ে দিয়েছিলেন কিন্তু নতুন লোকটি প্রস্তাব করাতে আবার বাজানো শুরু করলেন। লোকটির পরিচয় দিতে গিয়ে টলস্টয় লিখছেন :
‘লোকটা বাজিয়ে, ভায়োলিন বাজাত; পেশাদার বাজিয়ে না—হাফ বাজিয়ে, হাফ বাবুলোক।
বাপ জমিদার আমার প্রতিবেশী। ওর বাবা ফতুর হয়ে যেতে তিন ছেলের দুজনে যায় কাজে, আর তৃতীয়টিকে পাঠানো হয় প্যারিসে তার ধর্মমায়ের কাছে। গান-বাজনায় ওর হাত ছিল বলে ভর্তি হয় সংগীতের স্কুলে, ভায়োলিন বাজিয়ে হিসেবে শিক্ষা শেষ করে কনসার্টে বাজাত।… সে বছর রাশিয়ায় ফিরে এসে আমার বাড়িতে আবির্ভূত হলো।’
তার নাম ত্ক্রখাচেভস্কি।
‘ক্রখাচেভস্কির ভাইয়ের সঙ্গে বহু বছর আগেরকার একটি আলোচনা মনে পড়ে গেল, সেটির সঙ্গে ক্রখাচেভস্কি ও আমার স্ত্রীকে জড়িয়ে কী একটা উল্লাসে নিজের হৃদয়কে ছিন্নভিন্ন করলাম।
আলোচনাটি হয়েছিল বহু বছর আগে, তবু মনে পড়ে গেল। বেশ্যালয়ে যায় কি না, জিগ্যেস করাতে ক্রখাচেভস্কির ভাই বলেছিল, ভদ্রলোকে ওখানে যাবে কেন, ভদ্রঘরের মেয়ের তো অভাব নেই, ওখানে রোগের ভয়, তা ছাড়া মোটামুটি জায়গাটা জঘন্য ও নোংরা। আর দেখো দেখি! ওর ভাই বাগিয়েছে আমার স্ত্রীকে।… অসহ্য যন্ত্রণা, সবচেয়ে বড় যন্ত্রণার মূলে আমার অজ্ঞতা, আমার সন্দেহ, আমার অনিশ্চয়তা, ওকে ভালোবাসা উচিত, না ঘৃণা করা উচিত—জানি না সেটা।’
পজদনিশেভের এমন সন্দেহের মূল কারণ হচ্ছে সামাজিকতা। তিনি রাশিয়ার সম্ভ্রান্ত পরিবারের লোক। উঁচু মহলের সকলের সঙ্গে তার চলাচল এবং তাদের চরিত্র সম্পর্কে অবগত আছেন। তিনি জীবন সর্বম্ব ভোগ করেছেন। টলস্টয় নিজেও সম্ভ্রান্ত পরিবারের লোক। তিনি জীবন সর্বম্ব ভোগের আশা ত্যাগ করে বেছে নিয়েছেন সন্ন্যাসজীবন। অনেকটা উপনিষদের যাজ্ঞবল্ক্যের মতো। উপলব্ধি করেছেন একমেবাদ্বিতীয়মের জ্ঞান উপলব্ধি করতে পেরেছিলেন। বুঝতে পেরেছিলেন :
‘অহং ব্রহ্মাস্মি মন্ত্রোহয়ং জন্মপাপং বিনাশয়েৎ।।
অহং ব্রহ্মাস্মি মন্ত্রোহয়ং জ্ঞানানন্দং প্রযচ্ছতি।।’
কাজী নজরুল ইসলাম ‘আয়নার ফ্রেম’ শিরোনামে ‘আয়না’ গল্পের মুখবন্ধ লিখে দিয়েছিলেন। সেখানে তিনি লিখেছেন, ‘এমনি আয়নায় শুধু মানুষের বাইরের প্রতিচ্ছবি দেখা যায়, কিন্তু আমার বন্ধু শিল্পী আবুল মনসুর যে আয়না তৈরি করেছেন, তাতে মানুষের অন্তরের রূপ ধরা পড়েছে। যে সমস্ত মানুষ হরেক রকমের মুখোশ পরে আমাদের সমাজে বিচরণ করছে, আবুল মনসুরের আয়নার ভেতর তাদের স্বরূপ-মূর্তি বন্য ভীষণতা নিয়ে ফুটে উঠেছে।’
ক্রয়টজার সোনাটাও সমাজের একটি আয়না, যেখানে সমাজের বিবাহোত্তর মানুষের পারিবারিক, সাংসারিক চিত্রের আলামত দেখা যায়। সমাজবাস্তবতা ফুটে উঠেছে বলে কেউ এই আয়নায় নিজের চেহারা দেখতে চায় না। টলস্টয় লিখেছেন, ‘একই শিকলে আবদ্ধ, বেড়ি পরা দুই কয়েদি, শত্রুর মতো ছিলাম আমরা, দুজনে দুজনের জীবন বিষিয়ে দিতাম, তবু সেটা স্বীকার করতে চাইতাম না। তখনো খেয়াল হয়নি, স্বামীরা স্ত্রীর শতকরা নিরানব্বইজন ঠিক এভাবে নরকবাস করে, তা না হয়ে উপায় নেই। সে সময়ে নিজের এবং অন্যদের বিষয়ে এ কথাটা জানা ছিল না।’ সারা বিবাহিত জীবনে এক মিনিটের জন্যও ঈর্ষার থেকে মুক্তি পাইনি।
মানুষের জীবনের আদর্শ কী? ইন্দ্রিয়সর্বস্ব ভোগই কি মানুষের জীবনের একমাত্র কাম্য বিষয়? এর উত্তরে তিনি লিখেছেন, ‘আমাদের নানা রিপু। আর রিপুর মধ্যে সবচেয়ে প্রখর, অশুভ ও নাছোড়বান্দা হলো যৌনপ্রেম, দৈহিক প্রেম, আর যদি রিপু দমন করতে পারি, বিশেষ করে সবচেয়ে প্রখর যেটা, সেটাকে, অর্থাৎ যৌনপ্রেমকে, তাহলে ভবিষ্যদ্বাণীগুলো সফল হবে, মানুষ এক হবে, সাধিত হবে তার জীবনের উদ্দেশ্য, তখন প্রাণ ধারণের আর কোনো কারণ থাকবে না। যত দিন মানুষের অস্তিত্ব, তত দিন থাকে অনুপ্রাণিত করবে এই আদর্শ। শুয়োর আর খরগোশের আদর্শ নয়, সেটা হলো অবাধ প্রজনন, বাঁদর ও প্যারিসপন্থীদের আদর্শ নয়, সেটা হলো কামকেলির অতি সূক্ষ্ম সম্ভোগ। মঙ্গলের আদর্শ মানুষের; সে আদর্শ লাভের উপায় হলো জিতেন্দ্রিয়তা, শুদ্ধতা।’
এমন আদর্শ ধারণ করেছিলেন টলস্টয়। এমন আদর্শ সকল মানুষের ধারণ করা উচিত। ‘জন্তু-জানোয়ারেরা জানে যে বংশরক্ষার জন্য বাচ্চার দরকার, আর এ বিষয়ে প্রকৃতির সুপরিচিত নিয়ম মেনে তারা চলে। কথাটা জানে না শুধু মানুষ, জানার ইচ্ছা তার নেই। সে শুধু চায় প্রাণভরে নিজেকে ভোগ করে নিতে।’
উপন্যাসটি শুরু হয়েছে নামহীন কথকের ট্রেনযাত্রার মধ্য দিয়ে। লেখকের জবানি থেকেই পড়ি, ‘আমার মতো আরও তিনজন ট্রেন ছাড়ার পর থেকে চলছে। মাঝবয়সী, দেখতে ভালো নয় স্ত্রীলোক একজন, আধা পুরুষালি কোট ও টুপি পরিহিতা, সিগারেট খেয়ে চলেছে, মুখটা ক্লিষ্ট; আর একজন তার পরিচিত, বছর চল্লিশেকের বকুনতুড়ে মানুষ। তৃতীয় ভদ্রলোকটি নিজেকে তফাতে রাখছেন; লম্বায় মাঝারি গোছের, নড়নচড়ন ছটফটে, বুড়ো নন বটে কিন্তু কোঁকড়ানো চুলে অকালে পাক ধরেছে; চোখ দুটো অস্বাভাবিক চকচকে, খালি এ জিনিস ও জিনিসে অস্থির তাদের দৃষ্টিপাত।’ তৃতীয় ব্যক্তির নামই হচ্ছে পজদনিশেভ, যিনি নিজের স্ত্রীকে হত্যা করেছেন।
তাদের আলোচনা জমে উঠেছে নারী-পুরুষের প্রেম-ভালোবাসার বিষয় নিয়ে। ‘ভালোবাসা না থাকলে বিয়ে বিয়ে নয়, বিয়ে পূত হয় একমাত্র ভালোবাসার জোরে, ভালোবাসায় পূত বিয়ে হলো সত্যিকারের বিয়ে।’ স্ত্রীলোকটির এমন কথায় গ্রীবা উঁচু পজদনিশেভ তাকে প্রশ্নের বাণে বিদ্ধ করলেন, “সে ভালোবাসা—যেটা বিয়েকে পূত করে—সেই ভালোবাসা জিনিসটা কী?” স্ত্রী লোকটি উত্তরে বললেন, “সবাইকে ছেড়ে কেবল একজনের ওপর টান হওয়াটা হলো ভালোবাসা।” এমন উত্তরে সন্তুষ্ট না হয়ে পজদনিশেভ পুনরায় প্রশ্ন করলেন, “টানটা কত দিনের জন্য? এক মাস? দুদিন? আধঘণ্টা?”
স্ত্রীলোকটি শুধু বললেন, “অনেক দিন, মাঝে মাঝে সারা জীবন।” এমন উত্তরে আশাহত হয়ে তিনি বললেন, “আমরা বিয়ের মধ্যে মৈথুন ছাড়া আর কিছু না দেখে বিয়ে করি আর তাই দেখা দেয় প্রবঞ্চনা বা অত্যাচার। প্রবঞ্চনা সওয়া আরও সহজ। সতীপনার ভান করে স্বামী-স্ত্রী লোক ঠকায়, আসলে কিন্তু তারা থাকে বহুবিবাহের অবস্থায়। ব্যাপারটা ঘৃণ্য, কিন্তু তবু চলে। কিন্তু যখন সাধারণত যেমনটা হয়, আজীবন একসঙ্গে থাকার দায়িত্বটা স্বামী-স্ত্রী গায়ে পড়ে নেয় আর মাস না যেতে পরস্পরকে ঘেন্না করে, চায় ছাড়াছাড়ি হয়ে যেতে কিন্তু তবু একসাথে থাকে, তখন দেখা দেয় সেই ভয়াবহ নরক, যার ফলে লোকে মদ ধরে, আত্মহত্যা করে, পরস্পরকে হত্যা করে বা বিষিয়ে দেয়।” পজদনিশেভও নিজের স্ত্রীকে হত্যা করেছেন।
তিনি খোলাচোখে সমাজের উঁচু শ্রেণিকে দেখে তাকে “অন্তহীন বেশ্যালয়” বলে আখ্যায়িত করেছেন। এ কথার প্রমাণ দিতে গিয়ে তিনি বলেন, “যেসব দুর্ভাগা মেয়েকে আমরা ঘৃণার চোখে দেখি, তাদের দিকে চেয়ে দেখুন, তারপর দেখুন সমাজের সর্বোচ্চ স্তরের মহিলাদের; সেই এক প্রসাধন, সেই এক কায়দা, সেই সেন্ট, সেই নগ্ন হাত, কাঁধ আর বুক, সেই পেছন ফাঁপানো ফ্রক, হিরে-জহরত আর দামি চকচকে গয়নাগাটির ওপর সেই লোভ, সেই এক আমোদ-প্রমোদ, নাচ আর গানবাজনা। পুরুষ পটাবার পদ্ধতি দুই শ্রেণির মধ্যে সমান, কোনো হেরফের নেই।… অল্প দিনের বেশ্যাদের আমরা ঘৃণা করি, দীর্ঘদিনের বেশ্যাদের সম্মান দেখাই।”
এসব কিছু জেনেও পজদনিশেভ বিয়ে করেছিলেন পেনজার জমিদারের একটি মেয়েকে। বাগদত্তা অবস্থায় মেয়েটিকে পড়তে দিয়েছিলেন তার ডায়েরি, যেখানে লেখাছিল তার অতীত জীবনের ঘটনাবলি। এগুলো জেনেও পজদনিশেভকে বিয়ে করতে রাজি হয়েছিলেন তিনি। বিয়ের পর যত দিন যাচ্ছে, তাদের মধ্যে মনোমালিন্য বেড়ে চলেছে। ক্রখাচেভস্কিকে কেন্দ্র করে তাদের ঝগড়া আরও বেড়ে গেল। “সকালে যখন ক্রখাচেভস্কির প্রতি আমার ঈর্ষা স্বীকার করলাম, একটুও বিব্রত ভাব দেখাল না ও, অত্যন্ত স্বাভাবিক একটা হাসি হেসে শুধু বলল, ক্রখাচেভস্কির মতো মানুষের প্রতি আসক্ত হওয়ার সম্ভাবনা তার কাছে অদ্ভুত লাগে।…তুমি যদি চাও, ওর সঙ্গে আর কখনো দেখা করব না।” এই কথায় তার সন্দেহ কিছুটা কাটলেও আবার বিপাকে পড়লেন উয়েজদে গিয়ে। স্ত্রীর চিঠিতে ক্রখাচেভস্কির নামের উল্লেখ দেখেই তার মাথা ঘুরে যায়। চিঠিতে তার স্ত্রী লিখেছেন, “ক্রখাচেভস্কি যে কয়েকটি স্বরলিপি আনার কথা দিয়েছিল, সেগুলো নিয়ে এসেছিল, বাজাতে চেয়েছিল, কিন্তু সে রাজি হয়নি।” চিঠি পেয়ে ওই দিন ভোরে মস্কোর উদ্দেশে যাত্রা করেন তিনি। যাত্রাপথে তিনি ভাবতে লাগলেন, “কামরায় বসার সঙ্গে সঙ্গে নিজের কল্পনাকে আর বাগ মানাতে পারলাম না, আমার ঈর্ষাকে উত্তেজিত করে সে কল্পনা একটার পর একটা অত্যন্ত স্পষ্ট ছবি জোগাতে লাগল, প্রত্যেকটি ছবি উত্তরোত্তর নির্লজ্জ, আর সবই কেবল অনুপস্থিতিতে কী ঘটল, কেমন করে স্ত্রী আমাকে ঠকিয়েছে, তাই নিয়ে।” রাত বারোটা বাজে তিনি বাড়ি ফিরে দেখেন ঘরে এখনো আলো জ্বলছে। তিনি নিশ্চিত হয়েছেন, ক্রভাচেভস্কি এসেছেন। ছোরা হাতে তিনি এগিয়ে যাচ্ছেন খুন করার জন্য আর ভাবছেন, “বাপ-মায়ের ছেলে আমি, সৎ লোক; সারা জীবন সুখী সংসারের স্বপ্ন দেখেছি; ওর স্বামী আমি, কখনো ওকে ঠকাইনি—আর ও পাঁচ ছেলের মা, কণ্ঠলগ্না হয়েছে একটা বাজিয়ের।”
ঘরে ঢুকতেই “লোকটা হাসল, প্রায় হাস্যকর গোছের নির্বিকার গলায় বলল : আমরা এই একটু বাজাচ্ছিলাম…।”
তার স্ত্রী যখন বললেন, “পাগলামি ছাড়ো, করছ কী, কী হলো তোমার? কিছু করিনি আমরা, কিছু না, কিছু না! গা ছুঁয়ে বলছি!…ছোরাটা ফেলে না দিয়ে বাঁ হাতে টুঁটি চেপে চিত করে ফেললাম ওকে, গলা পিষতে লাগলাম। কী শক্ত গলা… টুঁটি ছাড়িয়ে নেবার আশায় দুই হাতে সে হাতটা চেপে ধরল আমার, ঠিক যেন এরই অপেক্ষায় ছিলাম, প্রাণপণে বুকের বাঁ দিকে পাঁজরের নিচে ছোরাটা বসিয়ে দিলাম।”