খবরওয়ালা বিনোদন ডেস্ক
প্রকাশ: রবিবার, ৬ জুলাই ২০২৫
২০২৪–২৫ অর্থবছরের জন্য ৩২টি চলচ্চিত্রে মোট ১৩ কোটি টাকার সরকারি অনুদান ঘোষণা করেছে তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়। এর মধ্যে পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র ১২টি ও স্বল্পদৈর্ঘ্য ২০টি। প্রতিবছরের মতো এবারও অনুদান বণ্টনকে ঘিরে শুরু হয়েছে বিতর্ক—উঠেছে স্বজনপ্রীতি ও স্বচ্ছতার অভাবের অভিযোগ।
বিনোদন অঙ্গনের অনেকেই সামাজিক মাধ্যমে ক্ষোভ ঝেড়েছেন, কারণ অনুদান পাওয়া অনেক নামের সঙ্গে সংশ্লিষ্টতা রয়েছে অনুদান নির্ধারণকারী কমিটিগুলোর। চলচ্চিত্রের আঁতুড়ঘর বাংলাদেশ চলচ্চিত্র উন্নয়ন করপোরেশন (এফডিসি)-এর সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত অনেক মূলধারার শিল্পী এবার অনুদান থেকে বঞ্চিত হয়েছেন। ফলে শিল্পীদের মধ্যে ক্ষোভ বিরাজ করছে।
যারা অনুদান দেন, তারাই এবার অনুদান নিলেন?
তালিকা বিশ্লেষণে দেখা গেছে, অনুদানপ্রাপ্তদের মধ্যে কয়েকজন নিজেই চলচ্চিত্র অনুদান প্রক্রিয়ার সঙ্গে সম্পৃক্ত। যেমন—মো. আবিদ মল্লিক পেয়েছেন চলচ্চিত্র নির্মাণের জন্য অনুদান, অথচ তিনি নিজেই চলচ্চিত্র অনুদান উপকমিটির সদস্য। জাতীয় পরামর্শক কমিটি ও স্ক্রিপ্ট বাছাই কমিটির সদস্য সাদিয়া খালিদ রীতিও অনুদান তালিকায় রয়েছেন। একইভাবে জাতীয় পরামর্শক কমিটির সদস্য মো. আরিফুর রহমান ও মুশফিকুর রহমান, ফিল্ম আর্কাইভ বিশেষজ্ঞ কমিটির সদস্য লাবিব নাজমুস ছাকিব, এমনকি তথ্য মন্ত্রণালয়ের সংস্কার বিষয়ক সার্চ কমিটির সদস্য মো. সাইদুল আলম খান—এদের কেউ কেউ অনুদান পেয়েছেন, কেউ আবার প্রক্রিয়ার গুরুত্বপূর্ণ পর্যায়ে থেকেছেন।
এমন অবস্থায় স্বার্থের সংঘাত এবং বিচার প্রক্রিয়ার নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
জুরি বোর্ড বলছে, নিয়ম মেনেই হয়েছে নির্বাচন
অনুদান বিতরণ নিয়ে প্রশ্ন তুললেও জুরি বোর্ডের সদস্য ও চলচ্চিত্র নির্মাতা আকরাম খান অভিযোগ নাকচ করে দেন। তিনি বলেন, ‘যে সিনেমাগুলোকে সর্বোচ্চ মার্ক দিয়েছি, সেই সিনেমাগুলোই অনুদান পেয়েছে। কোনো চাপ ছিল না। নিয়ম মেনেই নির্বাচন হয়েছে। প্রশ্ন তোলা অবান্তর।’
রেইনবো চলচ্চিত্র সংসদের সভাপতি আহমেদ মুজতবা জামাল বলেন, ‘আমি মাসখানেক এই কমিটিতে ছিলাম, পরে ব্যক্তিগত কারণে সরে দাঁড়াই। শুনেছি, এবার পিচিংয়ের ভিত্তিতে অনুদান দেওয়া হয়েছে। এই প্রক্রিয়া মেনে চললে অনিয়ম হওয়ার সুযোগ নেই।’
‘বিতর্ক নতুন নয়’—মতিন রহমান
বরেণ্য নির্মাতা মতিন রহমান অনুদান বিতর্ককে নিয়মিত ব্যাপার বলেই দেখছেন। তিনি বলেন, “যারা অনুদান পান না, তারাই প্রতিবছর মাঠে থাকেন। আবার তারাই পরের বছর অনুদান পান। সরকার যে প্রতিনিধিদের মনোনয়ন দিয়েছে, তারা নিশ্চয়ই যোগ্যতার ভিত্তিতেই এসেছে। কাজেই তাদের সিদ্ধান্তকে হালকাভাবে নেওয়ার সুযোগ নেই।”
পদত্যাগ করলেন জাকিয়া বারী মম
এই অনুদান বিতর্কের মাঝেই আসে অভিনেত্রী জাকিয়া বারী মমর পদত্যাগের খবর। তিনি জানান, গত ২৫ মে তথ্য মন্ত্রণালয়ের সচিব বরাবর পদত্যাগপত্র জমা দেন। মম বলেন, ‘ক্ষমতার কাছে আমার কোনো চাওয়া ছিল না, কেবল কাজের ইচ্ছা ছিল। কিন্তু সেই সুযোগ পাইনি। মনে হয়েছে, আমার জায়গায় কেউ দায়িত্ব পালন করলে ভালো হবে।’
তিনি আরও বলেন, ‘যে তালিকা প্রকাশিত হয়েছে, তার সঙ্গে আমি যুক্ত নই—না বাছাইয়ে, না চূড়ান্তকরণে। নিয়মের জটিলতা, আমলাতান্ত্রিক ধীরগতি, পুরনো কাঠামোর বেড়াজাল সব মিলিয়ে নতুন কিছু করার সুযোগ দেখি না। তাই ফিরে এসেছি নিজের জায়গায়। আমি চাইনি, ক্ষমতার কারণে আমার চেহারা বদলে যাক।’
সংস্কার রোডম্যাপের উদ্বেগ ও সুপারিশ
বাংলাদেশ চলচ্চিত্র সংস্কার রোডম্যাপ নামের একটি সংগঠন সম্প্রতি এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে অনুদান বিতরণ প্রক্রিয়া নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। তারা বলেছে, জনগণের করের টাকায় পরিচালিত অনুদান প্রক্রিয়াকে ঘিরে এতো বিতর্ক দুঃখজনক। এই প্রক্রিয়া হতে হবে স্বচ্ছ, জবাবদিহিমূলক ও পক্ষপাতহীন। কেবল পরিচিত মুখ নয়, প্রতিভাবান নতুন নির্মাতারাও যেন সুযোগ পান, তা নিশ্চিত করতে হবে।
তাদের মতে, মূল সমস্যা বিচার প্রক্রিয়ার অস্বচ্ছতা। জুরিবোর্ডসহ বিভিন্ন কমিটিতে আমলাদের আধিপত্য বেশি, ফলে চলচ্চিত্র সংশ্লিষ্টরা অনেক সময় মতামত দিতে পারেন না। মাত্র ২-৩ মিনিটের পিচিংয়ের মাধ্যমে নম্বর প্রদান এবং কোনো লিখিত মানদণ্ড না থাকাও প্রক্রিয়ার নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন তোলে।
তারা আরও যে সুপারিশগুলো করেছে, সেগুলোর মধ্যে রয়েছে—চূড়ান্ত নম্বর প্রকাশ, শর্টলিস্ট উন্মুক্ত করা, আপিলের সুযোগ রাখা, স্বার্থের সংঘাত রোধ ও স্কোরিংয়ের স্পষ্ট মানদণ্ড নির্ধারণ, চলচ্চিত্র সংশ্লিষ্টদের দিয়ে কমিটি গঠন এবং পুরো স্কোর প্রকাশ।
প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে
সরকারি অনুদান প্রাপ্তি শিল্পীদের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ উৎসাহ হলেও, অনিয়ম বা স্বজনপ্রীতির অভিযোগ উঠলে তা পুরো প্রক্রিয়াকেই প্রশ্নবিদ্ধ করে। স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত না হলে ক্ষতিগ্রস্ত হয় প্রতিভাবান নতুন নির্মাতারা, আর আস্থাহীনতা বাড়ে পুরো ইন্ডাস্ট্রিতে।
খবরওয়ালা/আরডি