এবিএম জাকিরুল হক টিটন
প্রকাশ: 20শে শ্রাবণ ১৪৩২ | ৪ই আগস্ট ২০২৫ | 1150 Dhu al-Hijjah 5
“মৃত্যু আমাকে নেবে, জাতিসংঘ আমাকে নেবে না, আমি তাই নিরপেক্ষ মানুষের কাছে, কবিদের সুধী সমাবেশে” —
কে জানতো, মাত্র আটাশেই থেমে যাবে সেই আশ্চর্য এক কবির যাত্রা? জাতিসংঘ না নিলেও, মৃত্যু ঠিকই তাকে নিয়ে গিয়েছিল। আবুল হাসান কি তবে আগেই টের পেয়েছিলেন নিজের অনিবার্য প্রস্থান?
১৯৭০ সালের এশীয় কবিতা প্রতিযোগিতায় প্রথম স্থান অর্জন করা এই কবি, পড়াশোনায় অবহেলিত হলেও ছিলেন বিস্ময়কর মেধার অধিকারী। এর একটি প্রমাণ পাওয়া যায় ১৯৬৫ সালের উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষার দিন। বরিশাল বিএম কলেজ কেন্দ্রে পরীক্ষা দিতে গিয়ে পাশের সিটে কবিতা লিখতে ব্যস্ত সেই কিশোর, পরীক্ষকের হালকা হাসি আর নিঃশব্দ তিরস্কারেও যার ধ্যানভঙ্গ হয়নি। অথচ শেষমেশ সেই কবি দ্বিতীয় বিভাগে পাস করে উচ্চমাধ্যমিক পাশ করেন, যেন জীবনের প্রতিটি বাঁকে এক অনন্য ব্যতিক্রম।
জীবন ও কবিতার মাঝের সেই সূক্ষ্ম রেখাকে যিনি নৈপুণ্যে ভেঙে দিয়েছিলেন, তিনি আবুল হাসান। নিঃসঙ্গতা, একাকিত্ব, বিচ্ছিন্নতা — এসব তার কবিতায় এসেছে শিল্পিত সংবেদন দিয়ে। অথচ বাস্তব জীবনে তিনি ছিলেন চঞ্চল পাখির মতো। উড়নচণ্ডী, ঘরছাড়া, আড্ডাবাজ, ভবঘুরে। একদিকে দারুণ স্বাধীনচেতা, অন্যদিকে ভয়ানক একাকী।
জীবন তাকে যেমন দিয়েছিল উড়ার মুক্তি, তেমনি নিয়ে নিয়েছিল খুব দ্রুতই জীবনের সবটুকু আলো।
তার কবিতায় ছিল জীবনের সঙ্গে চোখে চোখ রেখে কথা বলার সাহস। “নিঃসঙ্গতা” কবিতায় উঠে আসে এক বালিকার ব্যর্থ আকাঙ্ক্ষা, যে অতটা চায়নি—চেয়েছিল খুব কম কিছু। আর “বৃষ্টি চিহ্নিত ভালোবাসা” কবিতায় — রাজনীতি, প্রেম আর প্রকৃতির এক স্বতঃসিদ্ধ সংমিশ্রণ।
“ছোটখাটো রাজনীতিকের মতো পাড়ায় পাড়ায়/ জুড়ে দিয়েছিল অথই স্লোগান”
শব্দ ও প্রতীকের চমৎকার মেলবন্ধনে উঠে আসে সমকাল ও সম্বেদনার অভিঘাত।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ইংরেজি বিভাগে অনার্সে পড়া অবস্থাতেই কবিতা তাকে সম্পূর্ণ গ্রাস করে নেয়। ৬৯-এর গণঅভ্যুত্থানের উত্তাল সময়, বিশ্ববিদ্যালয়ের চূড়ান্ত পরীক্ষা ফেলে দিয়ে তিনি পা রাখেন সাংবাদিকতায়, পরে যুক্ত হন ‘ইত্তেফাক’ এবং ‘গণবাংলা’ পত্রিকায়। ‘গণবাংলা’-তে সাহিত্য সম্পাদক শহিদ কাদরীর সঙ্গে কাজ করার অভিজ্ঞতা তাকে কবি ও সাহিত্যিক হিসেবে আরও পরিপক্ব করে তোলে। এখানেই প্রকাশিত হয় তার প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘রাজা যায় রাজা আসে’।
“পাখি হয়ে যায় প্রাণ” কবিতায় যেন তার নিজের প্রতিচ্ছবি—
“অবশেষে জেনেছি মানুষ একা!
জেনেছি মানুষ তার চিবুকের কাছেও ভীষণ অচেনা ও একা!”
আবুল হাসানের জীবনে যেমন প্রেম এসেছিল, তেমনি এসেছিল বিচ্ছেদের ধূসরতা। ইংরেজি বিভাগের লেকচারার, ক্যামব্রিজপড়া সুরাইয়া খানমের সঙ্গে তার সম্পর্ক ছিল এক চিরন্তন মুগ্ধতা ও সংকটের মিশ্র রূপ। নির্মলেন্দু গুণের সঙ্গে তার বন্ধুত্বে ফাটল ধরেছিল এই প্রেমিকাকে ঘিরেই। অভিমানে লিখেছিলেন বন্ধুকে উদ্দেশ্য করে স্মৃতিমেদুর চিঠি—
“আমরাই আমাদের প্রেমিক ছিলাম…”
মাত্র তিনটি কাব্যগ্রন্থ, একটি কাব্যনাট্য এবং একটি গল্পগ্রন্থ— এ যেন বিপুল সম্ভাবনার অপূর্ব ঝলক। কিন্তু এত অল্প আয়ুতে যা সৃষ্টি করে গেছেন, তা বাংলা সাহিত্যে এক অমোঘ দীপ্তি হয়ে রয়ে গেছে।
জন্ম থেকেই দুর্বল হৃদয়, শৈশবের রিউম্যাটিক জ্বর থেকে শুরু করে অনিয়ন্ত্রিত জীবনযাপন— সব মিলিয়ে রোগজর্জর দেহ আর মেধা নিয়ে শেষ জীবনটা পার করছিলেন এক প্রান্তিক ক্লান্তিতে। ১৯৭৪ সালে সরকারি উদ্যোগে পাঠানো হয় তাকে পূর্ব জার্মানিতে চিকিৎসার জন্য। তিনিই ছিলেন বাংলাদেশের প্রথম কবি, যাকে রাষ্ট্রীয় খরচে বিদেশে চিকিৎসা করানো হয়।
তবু কবিতাই ছিল তার শেষ অবলম্বন, একমাত্র আশ্রয়। “অপরূপ বাগান” কবিতায় যেন লিখে গিয়েছিলেন নিজের মৃত্যুর পরও টিকে থাকা অনস্তিত্বের ভাষ্য—
“চলে গেলে তবু কিছু থাকবে আমার:
আমি রেখে যাবো আমার একলা ছায়া, হারানো চিবুক, চোখ, আমার নিয়তি!”
আজ কবি আবুল হাসানের জন্মদিনে আমরা শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করি বাংলা কবিতার এই অকালপ্রয়াত অথচ চিরকালীন কবিকে।
যিনি এলেন, লিখলেন, আর নিঃশব্দে বলে গেলেন—
“ঝিনুক নীরবে সহো, ভিতরে বিষের বালি, মুখ বুজে মুক্তা ফলাও…”