ভালোবেসে সংসার শুরু করেছিলেন সৈয়দা ফাহমিদা তাহসিন (২৬), ডাকনাম কেয়া। স্বামী সিফাত আলীর সঙ্গে প্রায় এক যুগের দাম্পত্য জীবনে জন্ম দেন চার সন্তান। কিন্তু সেই সংসারই শেষ পর্যন্ত তাঁর জীবনের করুণ পরিণতির কারণ হলো।
গত ১৩ আগস্ট গভীর রাতে রাজধানীর শেওড়াপাড়ায় নিজ বাসায় শ্বাসরোধে হত্যা করা হয় তাঁকে। নিহতের পরিবারের অভিযোগ—স্বামী সিফাতই এ হত্যাকাণ্ড ঘটিয়ে আত্মহত্যার নাটক সাজানোর চেষ্টা করেছেন। ফাহমিদার মা নাজমা বেগম এ ঘটনায় সিফাতসহ ১০ জনের বিরুদ্ধে মিরপুর মডেল থানায় মামলা করেছেন।
আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে জুলাই পর্যন্ত সাত মাসে দেশে ৩৬৩টি পারিবারিক সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে। এসব ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছেন ৩২২ জন। এর মধ্যে ২০৮ জন নারী ও শিশু হত্যার শিকার, আর আত্মহত্যা করেছেন ১১৪ জন।
সবচেয়ে বেশি হত্যার ঘটনা ঘটেছে স্বামীর হাতে—১৩৩ জন নারী। এছাড়া স্বামীর পরিবারের হাতে ৪২ জন এবং নিজ পরিবারের সদস্যদের হাতে ৩৩ জন নারী প্রাণ হারিয়েছেন।
মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের নারী সুরক্ষা হেল্পলাইন ১০৯-এ সাত মাসে এসেছে প্রায় ৪৮ হাজার ৭৪৫টি কল।
অন্যদিকে জাতীয় জরুরি সেবা ৯৯৯-এ জানুয়ারি থেকে ১৫ আগস্ট পর্যন্ত নারী নির্যাতনের ঘটনায় কল এসেছে ১৭ হাজার ৩৪১টি। এর মধ্যে শুধু স্বামীর বিরুদ্ধে অভিযোগই ৯ হাজার ৩৯৪টি।
ফাহমিদার হত্যাকাণ্ডের বিবরণ
ফাহমিদার পরিবার জানায়, সংসারে প্রায়ই মারধরের শিকার হতেন তিনি। সন্তানদের কথা ভেবে সহ্য করে গেছেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত প্রাণ বাঁচাতে পারেননি।
ঘটনার রাতে রান্নার কাজ করছিলেন তিনি। তখন বাইরে থেকে এসে স্বামী সিফাতের সঙ্গে কথা-কাটাকাটি হয়। পরে তাকে মারধর ও কক্ষে আটকে রাখা হয়। গভীর রাতে সিফাত ফোনে পরিবারকে জানান—‘কেয়া অসুস্থ’। হাসপাতালে নেওয়ার পর জানা যায়, তিনি আর নেই।
ফাহমিদার ফুফা শামসুদ্দোহা খান বলেন, ‘চার সন্তান রেখে রান্নার মাঝপথে কেয়া আত্মহত্যা করবে-এটা বিশ্বাসযোগ্য নয়। এটা স্পষ্টতই হত্যা।’
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক মনিরুল আই খান মনে করেন, পিতৃতান্ত্রিক সংস্কৃতি ও দুর্বল আইন প্রয়োগের কারণে পারিবারিক সহিংসতা বেড়ে চলেছে। তাঁর ভাষায়,
‘মেয়েদের ওপর দমনমূলক মানসিকতা, পড়াশোনা ও আর্থিক দুর্বলতা, পাশাপাশি বিবাহবিচ্ছেদ নিয়ে সামাজিক সংকীর্ণতা—এসবের কারণে নির্যাতনমূলক সম্পর্ক থেকে তারা বের হতে পারেন না। শাস্তির ভয় না থাকায় অপরাধীরা আরও বেপরোয়া হয়ে ওঠে।”
তিনি নারীদের প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলেন, ‘নির্যাতনমূলক সম্পর্ক থেকে বের হয়ে আসা জরুরি। একই সঙ্গে আইনশৃঙ্খলার উন্নতি ও কঠোর শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে।’
খবরওয়ালা/এমএজেড



