খবরওয়ালা অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশ: সোমবার, ২৫ আগস্ট ২০২৫
নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জ উপজেলার গাজী টায়ারস কারখানার ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের এক বছর পরেও নিখোঁজ ২২ বছর বয়সী তাঁত শ্রমিক আব্দুর রহমানের কোনো সন্ধান পায়নি তার পরিবার। ছেলের শোকে তার বাবা মো. জালাল চলতি বছরের মার্চে মারা গেছেন। মা হরমুজা বেগম এখনও ছেলের অপেক্ষায় দিন গুনছেন।
২০২৪ সালের ২৫ আগস্টের ওই অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় অন্তত ১৮২ জন নিখোঁজ রয়েছেন বলে জেলা প্রশাসনের তদন্ত প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। নিখোঁজদের স্বজনরা পুলিশ, প্রশাসন ও সেনাবাহিনীর কাছে ঘুরেছেন, থানায় নিখোঁজের ডায়েরি করেছেন, কিন্তু কোনো খোঁজ পাননি।
জেলার জ্যেষ্ঠ সহকারী পুলিশ সুপার মেহেদী ইসলাম জানান, নিখোঁজ ব্যক্তিদের সন্ধানে পুলিশ কাজ করছে এবং তাদের ব্যবহৃত মোবাইল নম্বরের সর্বশেষ লোকেশন যাচাই করা হচ্ছে। তবে এখন পর্যন্ত কাউকে শনাক্ত করা যায়নি।
হরমুজা বেগম ধারণা করছেন, তার ছেলে আগুনে পুড়েই মারা গেছেন। তার আক্ষেপ, ছেলের লাশটাও চোখে দেখার ভাগ্য হলো না। বর্তমানে তিনি আত্মীয়-স্বজনের সহযোগিতায় কোনোমতে দিন পার করছেন। তিনি বলেন, “পোলার শোকে বাপও মইরা গেছে, আমি এখনও মরতাছি।”
গাজী টায়ারস লিমিটেড কারখানার মালিক আওয়ামী লীগ সরকারের সাবেক মন্ত্রী গোলাম দস্তগীর গাজী। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর কারখানায় এক দফা লুটপাট চালিয়ে আগুন দেওয়া হয়। এরপর ২৫ আগস্ট গোলাম দস্তগীর গাজী গ্রেপ্তার হন এবং ওই রাতেই শত শত মানুষ কারখানায় লুটপাট চালিয়ে দ্বিতীয়বারের মতো আগুন দেয়। পাঁচ দিন পর ফায়ার সার্ভিস আগুন নেভাতে সক্ষম হয়।
ওই রাতে যারা কারখানায় গিয়েছিলেন, তাদের অনেকে নিখোঁজ হন। জেলা প্রশাসনের তালিকায় অন্তত ৪৫ জনের পরিবারের সঙ্গে গণমাধ্যম কথা বলেছে। স্বজনরা নিখোঁজদের ছবি ও জাতীয় পরিচয়পত্র দেখিয়েছেন। প্রতিবেশীরাও জানিয়েছেন, নিখোঁজদের তারা এক বছরেও এলাকায় দেখেননি।
কারখানার ছয়তলা পোড়া ভবনটি এখনও বিধ্বস্ত অবস্থায় পড়ে আছে। একজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা জানিয়েছেন, ফায়ার সার্ভিসের ছাড়পত্র না পাওয়ায় ভবনটি অপসারণ করা যাচ্ছে না এবং উৎপাদনও বন্ধ আছে।
জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম মিঞা জানান, তিনি নিখোঁজদের সন্ধানের জন্য পুলিশকে নির্দেশ দিয়েছেন এবং আশা করেন খুব দ্রুতই কোনো আপডেট দেওয়া যাবে।
নিখোঁজ ২৭ বছর বয়সী আরিফের স্ত্রী ফারজানা তার ৭ বছর বয়সী ছেলে আয়ান ও ১৮ মাসের নাঈমকে নিয়ে অনিশ্চয়তায় দিন কাটাচ্ছেন। তিনি বলেন, “বাঁইচা আছে এই আশা নিয়াই এক বছরে এসপি-ডিসি-সেনাবাহিনীর সবার কাছে গেছি। দিন যাইতাছে সবার ঠিকমতই, কিন্তু আমার জীবনডা তো থাইমা আছে।”
একই দিনে নিখোঁজ ট্রাকচালক নূর হোসেনের স্ত্রী পারভীন বেগম তিন সন্তানকে নিয়ে এখন এক কক্ষের টিনের ঘরে থাকেন। তিনি জানান, তার স্বামী মারা গেছেন এমন ঘোষণা না থাকায় ঋণের কিস্তিও মওকুফ হয়নি। তিনি এখন একটি কারখানায় চাকরি নিয়ে সংসার চালাচ্ছেন। তার মা খাদিজা বেগম আক্ষেপ করে বলেন, “মইরা গেলে হাড্ডিটা তো আছে। তাই দিতো আমাগো।”
ওই দিন নিখোঁজ হন দুই ভাই সাব্বির শিকদার (২৬), শাহাদাত শিকদার (৩০) এবং তাদের বোনের স্বামী জামির আলী (৩৬)। তাদের মা নুরুন্নাহার বলেন, “যার কাছে যাই, সেই কয় খালি ধৈর্য ধরতে। একটা বছর ধইরা ধৈর্যই তো ধরছি। এখন আমি শ্যাষ।”
ঘটনার পর গঠিত তদন্ত কমিটি গত ১২ সেপ্টেম্বর জেলা প্রশাসকের কাছে ৩২ পৃষ্ঠার প্রতিবেদন জমা দেয়। প্রতিবেদনে ঘটনাটিকে ‘অগ্নিসংযোগ’ হিসেবে উল্লেখ করা হলেও সুনির্দিষ্টভাবে কাউকে চিহ্নিত করা হয়নি। প্রতিবেদনে বলা হয়, ভবনটি ঝুঁকিপূর্ণ হওয়ায় উদ্ধার অভিযান চালানো সম্ভব হয়নি।
আগুনের পাঁচ দিন পর গত বছরের ১ সেপ্টেম্বর গণশুনানিতে নিখোঁজ ৮০টি পরিবারের সদস্যরা অংশ নেন। তারা ভবন থেকে ১৫ খণ্ড হাড় উদ্ধার করে পুলিশের কাছে জমা দেন। এ বিষয়ে যোগাযোগ করা হলে পুলিশ কর্মকর্তা প্রত্যুষ কুমার মজুমদার জানান, সিআইডির ফরেনসিক বিভাগ থেকে হাড়গুলোর বিষয়ে কোনো আপডেট জানানো হয়নি।
খবরওয়ালা/টিএসএন