বৃহস্পতিবার, ২ই এপ্রিল ২০২৬, ১৯শে চৈত্র ১৪৩২
বৃহস্পতিবার, ২ই এপ্রিল ২০২৬, ১৯শে চৈত্র ১৪৩২
ব্রেকিং নিউজ :
চরমোনাই কীর্তনখোলা-১০ লঞ্চে আগুন মাদারীপুরে প্রেমিকের অনশন, বিয়ের দাবিতে উত্তেজনা সৃষ্টি সংযুক্ত আরব আমিরাত হরমুজ প্রণালি সচল রাখতে যুদ্ধ প্রস্তুত নারায়ণগঞ্জে ডাকাতির প্রস্তুতিকালে গ্রেপ্তার সাত যুবক, অস্ত্র জব্দ সিলেট-ঢাকা রেল যোগাযোগ বিঘ্ন, তেলবাহী ট্রেন লাইনচ্যুত সাকিব আল হাসান ফেরার আগে পুরোপুরি ফিট নিশ্চিত: জাতীয় ট্রেনার মানিকগঞ্জে হামে আক্রান্ত শিশুদের সংখ্যা হঠাৎ করে উদ্বেগজনক বৃদ্ধি ড্রোনের ধ্বংসাবশেষ পড়ে বাংলাদেশির মৃত্যু সীতাকুণ্ডে পাহাড় কাটায় প্রতিবাদে চাঁদাবাজি মামলা, আটক দুই লিবিয়া থেকে ১৭৫ বাংলাদেশি প্রত্যাবাসনের নিরাপদ উদ্যোগ সফলভাবে সম্পন্ন চরমোনাই কীর্তনখোলা-১০ লঞ্চে আগুন মাদারীপুরে প্রেমিকের অনশন, বিয়ের দাবিতে উত্তেজনা সৃষ্টি সংযুক্ত আরব আমিরাত হরমুজ প্রণালি সচল রাখতে যুদ্ধ প্রস্তুত নারায়ণগঞ্জে ডাকাতির প্রস্তুতিকালে গ্রেপ্তার সাত যুবক, অস্ত্র জব্দ সিলেট-ঢাকা রেল যোগাযোগ বিঘ্ন, তেলবাহী ট্রেন লাইনচ্যুত সাকিব আল হাসান ফেরার আগে পুরোপুরি ফিট নিশ্চিত: জাতীয় ট্রেনার মানিকগঞ্জে হামে আক্রান্ত শিশুদের সংখ্যা হঠাৎ করে উদ্বেগজনক বৃদ্ধি ড্রোনের ধ্বংসাবশেষ পড়ে বাংলাদেশির মৃত্যু সীতাকুণ্ডে পাহাড় কাটায় প্রতিবাদে চাঁদাবাজি মামলা, আটক দুই লিবিয়া থেকে ১৭৫ বাংলাদেশি প্রত্যাবাসনের নিরাপদ উদ্যোগ সফলভাবে সম্পন্ন চরমোনাই কীর্তনখোলা-১০ লঞ্চে আগুন মাদারীপুরে প্রেমিকের অনশন, বিয়ের দাবিতে উত্তেজনা সৃষ্টি সংযুক্ত আরব আমিরাত হরমুজ প্রণালি সচল রাখতে যুদ্ধ প্রস্তুত নারায়ণগঞ্জে ডাকাতির প্রস্তুতিকালে গ্রেপ্তার সাত যুবক, অস্ত্র জব্দ সিলেট-ঢাকা রেল যোগাযোগ বিঘ্ন, তেলবাহী ট্রেন লাইনচ্যুত সাকিব আল হাসান ফেরার আগে পুরোপুরি ফিট নিশ্চিত: জাতীয় ট্রেনার মানিকগঞ্জে হামে আক্রান্ত শিশুদের সংখ্যা হঠাৎ করে উদ্বেগজনক বৃদ্ধি ড্রোনের ধ্বংসাবশেষ পড়ে বাংলাদেশির মৃত্যু সীতাকুণ্ডে পাহাড় কাটায় প্রতিবাদে চাঁদাবাজি মামলা, আটক দুই লিবিয়া থেকে ১৭৫ বাংলাদেশি প্রত্যাবাসনের নিরাপদ উদ্যোগ সফলভাবে সম্পন্ন চরমোনাই কীর্তনখোলা-১০ লঞ্চে আগুন মাদারীপুরে প্রেমিকের অনশন, বিয়ের দাবিতে উত্তেজনা সৃষ্টি সংযুক্ত আরব আমিরাত হরমুজ প্রণালি সচল রাখতে যুদ্ধ প্রস্তুত নারায়ণগঞ্জে ডাকাতির প্রস্তুতিকালে গ্রেপ্তার সাত যুবক, অস্ত্র জব্দ সিলেট-ঢাকা রেল যোগাযোগ বিঘ্ন, তেলবাহী ট্রেন লাইনচ্যুত সাকিব আল হাসান ফেরার আগে পুরোপুরি ফিট নিশ্চিত: জাতীয় ট্রেনার মানিকগঞ্জে হামে আক্রান্ত শিশুদের সংখ্যা হঠাৎ করে উদ্বেগজনক বৃদ্ধি ড্রোনের ধ্বংসাবশেষ পড়ে বাংলাদেশির মৃত্যু সীতাকুণ্ডে পাহাড় কাটায় প্রতিবাদে চাঁদাবাজি মামলা, আটক দুই লিবিয়া থেকে ১৭৫ বাংলাদেশি প্রত্যাবাসনের নিরাপদ উদ্যোগ সফলভাবে সম্পন্ন চরমোনাই কীর্তনখোলা-১০ লঞ্চে আগুন মাদারীপুরে প্রেমিকের অনশন, বিয়ের দাবিতে উত্তেজনা সৃষ্টি সংযুক্ত আরব আমিরাত হরমুজ প্রণালি সচল রাখতে যুদ্ধ প্রস্তুত নারায়ণগঞ্জে ডাকাতির প্রস্তুতিকালে গ্রেপ্তার সাত যুবক, অস্ত্র জব্দ সিলেট-ঢাকা রেল যোগাযোগ বিঘ্ন, তেলবাহী ট্রেন লাইনচ্যুত সাকিব আল হাসান ফেরার আগে পুরোপুরি ফিট নিশ্চিত: জাতীয় ট্রেনার মানিকগঞ্জে হামে আক্রান্ত শিশুদের সংখ্যা হঠাৎ করে উদ্বেগজনক বৃদ্ধি ড্রোনের ধ্বংসাবশেষ পড়ে বাংলাদেশির মৃত্যু সীতাকুণ্ডে পাহাড় কাটায় প্রতিবাদে চাঁদাবাজি মামলা, আটক দুই লিবিয়া থেকে ১৭৫ বাংলাদেশি প্রত্যাবাসনের নিরাপদ উদ্যোগ সফলভাবে সম্পন্ন চরমোনাই কীর্তনখোলা-১০ লঞ্চে আগুন মাদারীপুরে প্রেমিকের অনশন, বিয়ের দাবিতে উত্তেজনা সৃষ্টি সংযুক্ত আরব আমিরাত হরমুজ প্রণালি সচল রাখতে যুদ্ধ প্রস্তুত নারায়ণগঞ্জে ডাকাতির প্রস্তুতিকালে গ্রেপ্তার সাত যুবক, অস্ত্র জব্দ সিলেট-ঢাকা রেল যোগাযোগ বিঘ্ন, তেলবাহী ট্রেন লাইনচ্যুত সাকিব আল হাসান ফেরার আগে পুরোপুরি ফিট নিশ্চিত: জাতীয় ট্রেনার মানিকগঞ্জে হামে আক্রান্ত শিশুদের সংখ্যা হঠাৎ করে উদ্বেগজনক বৃদ্ধি ড্রোনের ধ্বংসাবশেষ পড়ে বাংলাদেশির মৃত্যু সীতাকুণ্ডে পাহাড় কাটায় প্রতিবাদে চাঁদাবাজি মামলা, আটক দুই লিবিয়া থেকে ১৭৫ বাংলাদেশি প্রত্যাবাসনের নিরাপদ উদ্যোগ সফলভাবে সম্পন্ন চরমোনাই কীর্তনখোলা-১০ লঞ্চে আগুন মাদারীপুরে প্রেমিকের অনশন, বিয়ের দাবিতে উত্তেজনা সৃষ্টি সংযুক্ত আরব আমিরাত হরমুজ প্রণালি সচল রাখতে যুদ্ধ প্রস্তুত নারায়ণগঞ্জে ডাকাতির প্রস্তুতিকালে গ্রেপ্তার সাত যুবক, অস্ত্র জব্দ সিলেট-ঢাকা রেল যোগাযোগ বিঘ্ন, তেলবাহী ট্রেন লাইনচ্যুত সাকিব আল হাসান ফেরার আগে পুরোপুরি ফিট নিশ্চিত: জাতীয় ট্রেনার মানিকগঞ্জে হামে আক্রান্ত শিশুদের সংখ্যা হঠাৎ করে উদ্বেগজনক বৃদ্ধি ড্রোনের ধ্বংসাবশেষ পড়ে বাংলাদেশির মৃত্যু সীতাকুণ্ডে পাহাড় কাটায় প্রতিবাদে চাঁদাবাজি মামলা, আটক দুই লিবিয়া থেকে ১৭৫ বাংলাদেশি প্রত্যাবাসনের নিরাপদ উদ্যোগ সফলভাবে সম্পন্ন চরমোনাই কীর্তনখোলা-১০ লঞ্চে আগুন মাদারীপুরে প্রেমিকের অনশন, বিয়ের দাবিতে উত্তেজনা সৃষ্টি সংযুক্ত আরব আমিরাত হরমুজ প্রণালি সচল রাখতে যুদ্ধ প্রস্তুত নারায়ণগঞ্জে ডাকাতির প্রস্তুতিকালে গ্রেপ্তার সাত যুবক, অস্ত্র জব্দ সিলেট-ঢাকা রেল যোগাযোগ বিঘ্ন, তেলবাহী ট্রেন লাইনচ্যুত সাকিব আল হাসান ফেরার আগে পুরোপুরি ফিট নিশ্চিত: জাতীয় ট্রেনার মানিকগঞ্জে হামে আক্রান্ত শিশুদের সংখ্যা হঠাৎ করে উদ্বেগজনক বৃদ্ধি ড্রোনের ধ্বংসাবশেষ পড়ে বাংলাদেশির মৃত্যু সীতাকুণ্ডে পাহাড় কাটায় প্রতিবাদে চাঁদাবাজি মামলা, আটক দুই লিবিয়া থেকে ১৭৫ বাংলাদেশি প্রত্যাবাসনের নিরাপদ উদ্যোগ সফলভাবে সম্পন্ন চরমোনাই কীর্তনখোলা-১০ লঞ্চে আগুন মাদারীপুরে প্রেমিকের অনশন, বিয়ের দাবিতে উত্তেজনা সৃষ্টি সংযুক্ত আরব আমিরাত হরমুজ প্রণালি সচল রাখতে যুদ্ধ প্রস্তুত নারায়ণগঞ্জে ডাকাতির প্রস্তুতিকালে গ্রেপ্তার সাত যুবক, অস্ত্র জব্দ সিলেট-ঢাকা রেল যোগাযোগ বিঘ্ন, তেলবাহী ট্রেন লাইনচ্যুত সাকিব আল হাসান ফেরার আগে পুরোপুরি ফিট নিশ্চিত: জাতীয় ট্রেনার মানিকগঞ্জে হামে আক্রান্ত শিশুদের সংখ্যা হঠাৎ করে উদ্বেগজনক বৃদ্ধি ড্রোনের ধ্বংসাবশেষ পড়ে বাংলাদেশির মৃত্যু সীতাকুণ্ডে পাহাড় কাটায় প্রতিবাদে চাঁদাবাজি মামলা, আটক দুই লিবিয়া থেকে ১৭৫ বাংলাদেশি প্রত্যাবাসনের নিরাপদ উদ্যোগ সফলভাবে সম্পন্ন চরমোনাই কীর্তনখোলা-১০ লঞ্চে আগুন মাদারীপুরে প্রেমিকের অনশন, বিয়ের দাবিতে উত্তেজনা সৃষ্টি সংযুক্ত আরব আমিরাত হরমুজ প্রণালি সচল রাখতে যুদ্ধ প্রস্তুত নারায়ণগঞ্জে ডাকাতির প্রস্তুতিকালে গ্রেপ্তার সাত যুবক, অস্ত্র জব্দ সিলেট-ঢাকা রেল যোগাযোগ বিঘ্ন, তেলবাহী ট্রেন লাইনচ্যুত সাকিব আল হাসান ফেরার আগে পুরোপুরি ফিট নিশ্চিত: জাতীয় ট্রেনার মানিকগঞ্জে হামে আক্রান্ত শিশুদের সংখ্যা হঠাৎ করে উদ্বেগজনক বৃদ্ধি ড্রোনের ধ্বংসাবশেষ পড়ে বাংলাদেশির মৃত্যু সীতাকুণ্ডে পাহাড় কাটায় প্রতিবাদে চাঁদাবাজি মামলা, আটক দুই লিবিয়া থেকে ১৭৫ বাংলাদেশি প্রত্যাবাসনের নিরাপদ উদ্যোগ সফলভাবে সম্পন্ন

ঈদ সংখ্যা ২০২৫

মাকারানার অশ্রু

হামিম কামাল

প্রকাশ: 17শে চৈত্র ১৪৩১ | ৩১ই মার্চ ২০২৫ | 1149 Dhu al-Hijjah 5

মাকারানার অশ্রু

তিরানা

একটা গোপন রূপকথার সময় অজান্তে বয়ে চলেছে। তিরানার সংগ্রহ থেকে মাকারানার অশ্রু হঠাৎ উধাও হয়ে গেল।

জ্যৈষ্ঠ মাসের রাত। বারান্দার দরজা, শোবার ঘরের জানালা খোলা রাখতেই হয়। এই বিশ্বাস ছিল যে কিছু হবে না শেষমেশ। সাধারণ কেউ মাকারানার অশ্রুতে হাত দিতে পারবে না। কারণ, এর নিজস্ব ইচ্ছা, নিজস্ব প্রতিরক্ষা আছে। কেউ মন্ত্র পড়ে দেয়নি ওটায়। মন্ত্র ওখানে আপনাতে উপবিষ্ট। কেউ বাহির থেকে দেখে বলতে পারে, একটা সাধারণ ফুলদানিই তো। এমনকি এর গায়ে কোনো দৃষ্টিনন্দন নকশা পর্যন্ত নেই। তবু সে বিশেষ। অনেক কিছু ভুলে গেলেও এ কথা তিরানা এখনো জানে। আর জানে মিরানা, নিয়ন, বিজলি, বিজন। জানে বিজন ও বিজলির পূর্বজদের কেউ কেউ। মাঝে মাঝে ফুলদানিটিকে তিরানা নিঃশব্দে, নির্বাক্যে ঘুরিয়ে দেখত। জোছনারাতে একবার ফুলদানিটিকে নিয়ে বারান্দায় গিয়েছিল। একবারই। কিন্তু ওটাই বহুবারের সমান। আকাশময় সাদা মোমজ আলো! কী অপরূপ, কী অনুপম! এই আদিম উপগ্রহের প্রতি তিরানা ঋণী বোধ করত। ঋণী বোধ করত সূর্যের প্রতি। জোছনা চাঁদের প্রতিভা। প্রতিভা প্রতিভাকে জাগায়। জোছনার আলো যখন মাকারানার পাথরে গড়া এ ফুলদানির ওপর পড়েছিল, অপার্থিব ঘটনা ঘটেছিল। জোছনার প্রতিটি বিন্দু শুষে নিল মারাকানা মর্মরে গড়া সেই ফুলদানি। তিরানার কাছে যা মাকারানার অশ্রু। সবাই যখন ঘুমিয়ে, ঘরের বাতি নেভানো বারান্দায় ফুলদানি রেখে, তিরানা তার পাশে শুইল। পরনের কোমল, শুভ্র গাউন তাকে মোজাইক মেঝের ঠান্ডা থেকে রক্ষা করবে না, জানত। সর্দিগর্মির স্পর্শকাতরতা তাকে যন্ত্রণা দেবে জানত। তবু শুয়েছিল। চোখ ওই পাথরের দিকে। মহান বাণীর সংসর্গে আত্মায় বীণা বাজে। মনে হলো চাঁদের মহৎ আলো এসে কোনো মর্মরের আত্মাকে যেন ডেকে তুলেছে। ঘুরিয়ে-ফিরিয়ে দেখেছিল তিরানা। অমন প্রায়ই দেখত। কখনো চোখের জল ফেলত, কখনো নয়। এর সঙ্গে তার প্রথম প্রেমের স্মৃতি বিজড়িত! প্রথম, হয়তো শেষও। মাকারানার পাথরে তাজমহল তৈরি। সেই তাজমহলের পাথরে গড়া একটি কোমল ফুলদানির সে অধিকারিণী। এ কথা ভেবে যে শিহরণ জাগত, সেটি স্থায়ী হতে পারত না। পারত না ওই প্রেমের পরিণতির কথা ভেবে। অপর পক্ষ থেকে প্রেম গভীর ছিল না। ছিল কি? তিরানার মতো যারা ব্যক্তিকে ভালোবাসে এবং ভালোবাসাকেও ভালোবাসে, তাদের প্রেমের গভীরতা নিয়ে সন্দেহ নাই। তার একসময়ের ভালোবাসার মানুষ, নিয়ন, তার জীবন থেকে সরে গেছে। মাকারানার এই অশ্রু নিয়নের উপহার। সেই তৈজস মেলার কথা মনে পড়ে। যখন ভালোবাসা ছিল, তখন তিরানা কথা দিয়েছিল, নিয়নের উপহার যত্নে রাখবে। পরে ভালোবাসা আড়াল হলো। এতে কি কথা তার ভর হারাবে? এক মন বলে, এখন আর তাকে দেওয়া কথার মেয়াদ নেই। আরেক মন বলে, ভালোবেসে দেওয়া কথা কি মেয়াদোত্তীর্ণ হতে পারে? এই টানাপোড়েন ভালো নয়। বোকা মন এখনো কোথাও সম্ভাবনা জিইয়ে রাখতে চায়। 

যদি তিরানা আর কাউকে ভালোবাসতে পারত, তখন এই সম্বন্ধসূত্র, মাকারানা মর্মরের এই ফুলদানি নিজের কাছে রাখত না। কারণ, স্মৃতি ছোঁয়াচে। যে স্মৃতি রোগবিশেষ, তার সংক্রমণ থেকে তিরানা সবাইকে বাঁচাবে। নিয়নকে ফেরত দিত? না। তাতে সব খেলো হয়ে উঠত। বরং সে এমন কোথাও রাখত, যেখানে তার দেওয়া কথাও থাকবে, তার আত্মাও জিতবে। এটাই হয়তো তার মায়ের শিক্ষা। হয়তো তিরানা একে ঢাকা জাদুঘরে দিয়ে দিত। যা ঘটেনি, তা নিয়ে আর ভাবনা কেন। যা হতে পারত, তা নিয়ে করা আলাপের জন্য অসীমসংখ্যক শূন্য শিকা রয়েছে। সেখানে তুলে রাখা গেল। 

কিন্তু প্রশ্ন হলো, ফুলদানিটি কী করে চলে গেল? কোথায়ই-বা গেল, তিরানার হস্তান্তর ছাড়া? বিজন, বিজলি বলেছিল, মাকারানার পাথরে গড়া এ বস্তু যে একবার পেয়েছে, সে আগের অধিকারীর অনুমোদনেই পেয়েছে। এর সঙ্গে হৃদয়ের সংকেত তালাবদ্ধ হয়ে যায়। তিরানার অনুমোদন বা স্বেচ্ছায় দান কিংবা বিনিময় ছাড়া ওটা শুধু তখনই কোথাও যেতে পারে, যখন সে তার স্বাধীন ইচ্ছা প্রয়োগ করবে। হয়তো তা-ই হয়েছে। তবু শেখানো বাস্তবে অভ্যস্ত মন মানতে চায় না। ফুলদানি তার নিজের ইচ্ছায় চলে গেছে? কেন নয়? যার আত্মা আছে, তার ইচ্ছা আছে। যার ইচ্ছা আছে, তার উপায় আছে। ফুলদানিটি তো নিছক বস্তু নয়। সে ব্যক্তি। ওর আত্মা ছিল, আছে, সবাই জানে। সুতরাং সে স্বাধীন। কোথায় স্থানান্তরিত হতে পারে এই স্বাধীন ফুলদানি? মহাজগৎ রহস্যময়। রহস্যমাত্রই সরলে জটিল। যা কল্পনা করা সম্ভব, তা বাস্তব। কারণ, কল্পনাকে গড়ার উপকরণগুলো বাস্তবের অণুতে গড়া। তাহলে একটা সম্ভাবনা উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না। হয়তো সে এমন কোথাও গেছে, যার সঙ্গে তিরানার পরিচয় না থাকলেও পাথরের পরিচয় আছে। আক্ষেপ, ইচ্ছা, ব্যথা, আহ্বানের কোনো অপূর্ণ চক্র এর সঙ্গে নিশ্চয়ই জড়িত। কোন বিষয়ে আক্ষেপ, কী সেই ইচ্ছা, কোন সে ব্যথা, কার আহ্বানের চক্র অপূর্ণ রয়ে গিয়েছিল?

এখনো সকাল হয়নি। তিরানা ঘরের বাতি জ্বালল। তার প্রিয় সাদা গাউন দৈন হয়ে উঠেছে। নাকের একবিন্দু নাকফুলে আলো জ্বলল। চোখের পাপড়ি ভেজা। শোবার ঘরের ছোট্ট তাকের কাচের দরজা খুলে ফুলদানির শূন্যতায় হাত রাখল। ঘুমাতে যাওয়ার আগে এখানেই শেষ তাকে দেখেছে। তার অবস্থানের উত্তাপ অথবা উত্তাপের কিছু অবশেষ এখনো কি রয়ে গেছে?

কোথায় গেলে তিরানা উত্তর পাবে, যেখানে সে ভাবতে পারবে? মানুষ যখন ভাবে, তখন সে আত্মীয়তার আঁকশি ছড়ায়। আঁকশি তখন সম্ভব-অসম্ভব সমস্ত চিন্তার সঙ্গে নিজেকে জড়ায়। জগতে যা-ই ঘটে, তার চিন্তাসূত্র হাওয়ায় ভেসে থাকে। যদি মাকারানার অশ্রু কোথাও গড়ায়, জগতে তা সূত্র রেখেছে, রাখবেই। তিরানা আজ হোক বা কাল, তার সন্ধান পাবেই। তাকে যেতে হবে তার ধ্যাননিমগ্নি বাড়ির কাছে। সেই বাড়ি অনেক দূর। সীতাকুণ্ড, চট্টগ্রাম। সেখানে যাবে বলে তিরানার বহুদিনের অপেক্ষা। একটা কোনো উপলক্ষের খোঁজ পড়ছিল। খোঁজ পাওয়া গেছে। এমন খোঁজ, এমন উপলক্ষ তিরানা চায়নি, তাতে কী এসে-যায়। মনে হলো, মাকারানার পাথরে গড়া ফুলদানি অবয়বটাও যা চায়, তাতে কী এসে-যায়। হয়তো আরও বড় কোনো ইচ্ছা, কোনো শক্তি তাকে বাধ্য করেছে। তাকে স্থানান্তরি করেছে। হয়তো সে-ও কাঁদছে। তিরানার জন্য? তারও আগের কোনো রাজকন্যার জন্য? নাকি সেই শিল্পীদের জন্য, যারা তাকে গড়েছে। একটা অমূল্য কথা মনে হলো। যে শিল্পী তাকে গড়েছে, তার আত্মার একটি অংশও তাতে প্রবিষ্ট। এটা হবেই। তখনই কোনো শিল্প উৎকৃষ্ট, যখন শিল্পীর বিশুদ্ধ আত্মা সেখানে প্রবিষ্ট। তবে কোনো কিছুকে আকার দিতে শুধু বিশুদ্ধতা যথেষ্ট নয়। কিছু খাদ লাগেই। ইনইয়াঙের সাদার ভেতর একবিন্দু কালো লাগেই বা কালোর ভেতর একফোঁটা সাদা। মাকারানা মর্মরের এই ফুলদানি হয়তো একজন গড়েনি। সে ক্ষেত্রে এখানে অনেকের আত্মা প্রবিষ্ট। পাথরের নিজস্ব আত্মার সঙ্গে হয়তো কোনো অশান্ত সুর বেজে চলেছিল ফুলদানিতে। তিরানা কখনো বুঝতে পারেনি। রাতের কালোয় কিছুটা যা আঁচ করছে, সে-ও কালোরই প্রতিভা। কালো এখনো কাটেনি। দিনের আলোয় এসব হয়তো অর্থহীন মনে হবে। বাংলা তারিখ বদলায় সূর্যাস্তে। সে হিসেবে এখনো ১১ জ্যৈষ্ঠ। আর এক ঘণ্টা পর, ১২ জ্যৈষ্ঠে হয়তো সব বোঝাপড়া বদলে যাবে। সীতাকুণ্ডে এক অজুহাতে ধ্যানস্থ সময় কাটানোর পরিবর্তে, তার অমূল্য স্মারক খোয়া গেছে, এই সূত্রে ডায়েরি করতে তিরানা হয়তো মিরপুর থানায় যাবে। আগেই মন ঠিক করা চাই। 

থানায় সে যাবে না। সে রূপকথার মানুষ। যে রূপকথা আমাদের চেনা সময়রেখার আড়ালে অজান্তে বয়ে যাচ্ছে। 

 

মিরানা 

১৭ জ্যৈষ্ঠ, মিরপুর

 

তিরানাকে যতটা চিনি, তার ওপর বলতে পারি, প্রয়োজনে সে পৃথিবীর শেষ প্রান্ত অব্দি যাবে। 

ব্যাগ গোছাচ্ছিল। ও সিরিয়াস। সত্যিই বেরোবে। আমাকে জিজ্ঞেস করেছিল ওর সঙ্গে যাব কি না। তিরানা সব সময় এই করে। যেখানেই যাক, জিজ্ঞেস করবে যাব কি না। যাত্রার ব্যাপারে ও রূপকথার ওই বুড়ির মতো অনেকটা, পথে যে-ই তার সঙ্গ নিতে চায়, তাকেই সে নেয়। মূলত এই ভরসার ওপরই একটা কাণ্ড ঘটতে যাচ্ছে হয়তো আরেকটু পর। 

যাহোক, জানতে চেয়েছে যাব কি না, প্রথমে বলেছি, এসব পাগলামোতে আমি নেই। কিন্তু এখন সময় যত যাচ্ছে, তত অস্থির বোধ করছি। মনে জানি, ও গেলে শেষমেশ আমাকেও যেতে হবে। ওকে তো আর পথে একা ছেড়ে দিতে পারি না। এ জন্য নয় যে আমি ওকে নিরাপত্তা দেব, বুদ্ধি দিয়ে ওর পাশে এমনভাবে দাঁড়াতে পারব, যেমনটা আর কেউ পারবে না। বরং হয়তো ওকেই আমাকে নিরাপত্তা দিয়ে নিয়ে যেতে হবে, আমার পাশে ওর বুদ্ধি দিয়ে দাঁড়াতে হবে। এরপরও আমি যাব, ওকে ছেড়ে দিতে পারি না একা, এর পেছনে কারণ, আমি সঙ্গে থাকলে ও এই ভরসাটুকু পাবে ও একা নয়। নাকি মিথ্যা বলছি? সত্যটা হলো, ওর সঙ্গে না থাকলে দেখা যাবে আমি সারা রাত পায়চারি করব—কী হলো কী হলো।

হ্যাঁ, দিদার কাছে ও ভালো থাকবে, পথের বিপদ আছে। কিন্তু পুরোনো সমস্যাটা যদি আবার জেগে ওঠে? হঠাৎ মাঝরাস্তায় যদি সব ভুলে বসে থাকে? রাস্তা হারায়? প্রকৃতি না করুক। আছে সীতাকুণ্ডের একাকী বাড়ির বিপদ। নির্ঘুম রাত থেকে মুক্তি পেতেই ওর সঙ্গে যাব। 

           

‘কী লিখছ?’ 

প্রশ্ন চোখেই তিরানার হাত চলছে। ঘরে সকালের শেষ আলো। তিরানার চোখ বসে গেছে। নির্ঘুম রাতের ছাপ। কাল রাতে আকাশ-পাতাল ভেবেছে। আরও নরক-পাতাল ভাবতে যাত্রা শুরু হয় হয়। খোলা ব্যাগের ভেতর একের ওপর আরেক তার ভাঁজ করা ফতুয়াগুলো—–লাল, হলুদ, নীল, শাড়িগুলো—আকাশি, হালকা রানিগোলাপি, বাসন্তী, কালো, পাজামাগুলো—সাদা, কালো, আদুরে অন্তর্বাস, সাদা তোয়ালে তাদের নিখুঁত সজ্জা খুঁজে নিচ্ছে। পাশপকেটে সবুজ দুটো টুথব্রাশ, ফ্লোরাইড টুথপেস্ট, নীল চিরুনি, পাশ খোপে সবুজ জায়নামাজ। সবশেষে কাঁধে ঝোলানোর ব্যাগে জলের বোতল রবীন্দ্রনাথ ও ইসাবেল আলেন্দে। 

‘পারবে তো একা থাকতে?’ বলল তরিানা। ‘ভয় করবে না তো ‘ 

কোনো উত্তরই আমার দেওয়া উচিত নয়। আমি চুপ করে থাকলাম। তিরানার হাত থেমে গেল। আমার চোখ বরাবর আমার সঙ্গে প্রতারণা করে। অবশ্য একে যদি প্রতারণা বলা যায়। মনে যা আসে, তা চোখে ফুটে উঠে আমাকে কখনো বিপদে ফেলতে ছাড়ে না। আজও নিশ্চয়ই ব্যতিক্রম নেই। ওর সঙ্গে খেলছি, তা কি ও ধরে ফেলেছে? ধরা উচিত নয়। 

তিরানা বলল, ‘তুমি কি আমার ওপর রাগ করছ কোনো কারণে, মিরানা?’

রাগ! ঠিক আছে। এই সূত্র ধরেই এগোনো যাক। যদি বলি, হ্যাঁ, রাগ করছি, তাহলে কী কী সুবিধা পাই। আমার চিন্তার গতি তিরানার মতো নয়। উল্টো। এমন ধীর! শামুকও এর চেয়ে দ্রুত ভাবে। না, কোনো সুবিধা পাচ্ছি বলে মনে হচ্ছে না। রাগ তো হচ্ছে না মোটেই। তিরানা তার জায়গা থেকে ভাবতে পারে রাগ হচ্ছে। সকালে উঠে শুনলাম, ‘আমি যাচ্ছি’, ব্যস, মেনে নিতে হলো। একটু তো রাগের অবকাশ থাকছেই। তবে রাগের অবকাশের চেয়ে ও আমাকে বেড়ানোর সুযোগ দিতে চেয়েছে বেশি। অবশ্য অপাত্রে সুযোগ পড়েছে। ও চায় ছুটতে, আমি চাই থাকতে। তিরানা বাহির-চরা ল্যাভেন্ডার রঙা ফিঙে। আমি খাঁচার হলুদ বাজরিগর। ছটফটে, কিন্তু খাঁচার বাইরে গেলেই মারা পড়ব। অবশ্য তিরানা থাকলে বাঁচব। ফিঙেরা বাঁচায়। 

আমি কোনো উত্তর করলাম না। তিরানা আমার মৌনতাকে সম্মতি ধরছে। বিছানায় ওর ফোলানো কালো ব্যাগ, হাস্যমুখী কালো চেইন। সাবধানে মিলিয়ে দিয়ে বলল, ‘রাগ করারই কথা।’ তারপর একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। ওকে দীর্ঘশ্বাস ফেলতে দেখে আমি সাবধান হয়ে গেলাম। আমার মনের কথা বলতে আর দেরি করা চলবে না। 

‘রাগ করিনি,’ একটু উদার হয়ে বলতে চাইলাম, কিন্তু আর্তনাদের মতো শোনাল। ‘আমি এখনো এত পাগল হয়ে যাইনি যে তোমার ওপর রাগ করব। অর্থহীন কাজ কখনো করতে দেখেছে মিরানাকে কেউ? এমন বলতে পারবে না। আমার সব কাজের অর্থ আছে।’ কণ্ঠে অনুযোগ। ‘এই যে এখন লিখছি, এরও আলাদা অর্থ আছে।’

‘আমি একটু পর বেরিয়ে যাচ্ছি। আর তুমি অর্থপূর্ণ লেখা চালিয়ে যাচ্ছ।’ 

দেখতে আসলেই একটু খারাপ দেখাচ্ছে। বললাম, ‘লেখা চালিয়ে যাচ্ছি। কারণ, আমার প্রস্তুতি নেওয়া শেষ, তাই।’

‘মানে কী।’

‘মানে হলো, আলমারির ভেতর আমার গোছানো ব্যাগটা লক্ষ্মী হয়ে বসে আছে। তুমি যখন গোসলে, তখন থেকে শুরু। এরপর লম্বা সময় নিয়ে কুঁচি ঠিক করছিলে। ডাকলে কিন্তু এলাম না। তখন এই ব্যাগই গোছাচ্ছিলাম।’

তিরানা শব্দ করে হাসল। ‘মিরানা।’ 

আমি গম্ভীর মুখে বলল, ‘কী ভেবেছিলে, আপু? তুমি একাই চালু? ল্যাভেন্ডার ফিঙে?’ 

মনে মনে ও আমার ওপর খুশি হয়েছে। তবে একটু পর এই খুশিটা থাকবে কি না সন্দেহ। কাজটা পরিস্থিতির শিকার হয়ে আমাকে করতে হয়েছে। সমস্যা হলো, আমি গোপন করতে পারি, কিন্তু মিথ্যা বলতে পারি না। যখন গোপন করার জন্য মিথ্যা ছাড়া আর কোনো অস্ত্র থাকে না, তখন আমি কুপোকাত এবং মিথ্যা এড়াতে আমি গোপনীয়তাকে ভঙ্গ করি, তার শাস্তিও মাথা পেতে নিই। তেমনই এক শাস্তি হয়তো মাথা পেতে নিতে হবে। অল্প কিছুক্ষণের ভেতর। আমাকে এতটুকু চমকে না দিয়ে কলিং বেলটা ঠং! বেজে উঠল। 

তিরানা বলল, ‘মিরানা, তুমি যাবে বললে তো বুয়াকে নিষেধ করে দিতাম। এখন তো ও রাগ করবে।’—এই বলে ও দরজার দিকে গেল। বুয়া আসার কোনো সম্ভাবনা নেই। কারণ, তিরানা তাকে মানা না করতে পারলেও আমার তো তা করতে বাধা নেই। বিশেষ করে যখন আমি জানি যে আমি তিরানার সঙ্গে চলেছি। 

আমি হৃৎপিণ্ডের ধুকপুক শুনছি। তিরানার পেছন পেছন দরজার কাছে গিয়ে দাঁড়ালাম। যা ভেবেছিলাম, তা-ই। তিরানা স্তব্ধ হয়ে চৌকাঠে দাঁড়িয়ে আছে। দরজার বাইরে আগাগোড়া অভিযানের সাজে সজ্জিত হয়ে দাঁড়িয়ে আছে নিয়ন। কালো জিনসের সঙ্গে লাল টি-শার্ট ইন করে পরেছে, মাথায় কালো নিউজবয় ক্যাপ। স্পারসোর বিজ্ঞানীর মতো নয়, ওকে লাগছে আশির দশকের কোনো অপরাধজগতের কোনো সিনেমায় রোমান্টিক ভিলেন রবার্ট ডি নিরোর মতো। হাতে বোকার মতো ধরে আছে সবুজ এক লাগেজ। তিরানা লাগেজটা না-দেখার মতো দেখল। ওর মনের অবস্থা বুঝতে পারছি। ও কিছুদিন মগ্ন সময় কাটাতে যাচ্ছিল সীতাকুণ্ডে আমাদের বাগানবাড়িতে। সকালেই ওর ফ্রিল্যান্সার সহযোগীদের হাতে প্রকল্প বুঝিয়ে দিয়েছে। ওর নিবেদন আমি বুঝতে পারছিলাম। কিন্তু আমার মনে হচ্ছিল এটা একটা উপযুক্ত সময় ওদের মিলে যাওয়ার। নিয়ন যে চাইছে, তা জানি। সুযোগ পাচ্ছিল না। তিরানার উদাসীনতা এত নিশ্ছিদ্র। আর ওদের ওই মাকারানার অশ্রু, চাচ্ছিলাম সেটাও পাওয়া হোক। দুজন এক হলেই সবচেয়ে কম সময়ে পাবে। কিন্তু বাধা বহুবিচিত্র। ভাবছিলাম আমাদের সঙ্গে নিয়ন যুক্ত হলে সীতাকুণ্ডে আমরা আর উঠব কী করে। সেখানে উৎসুক প্রতিবেশীদের কী উত্তর দেব। বলবে বাবা-মাকে অস্ট্রেলিয়ার সৈকতে হাওয়া খেতে পাঠিয়ে দুই বোন যা খুশি করে বেড়াচ্ছি। হয়তো আমাদের সমুদ্রের দিকে যেতে হবে। কক্সবাজার। কাজ ও খরচ তাতে বেড়ে যাবে অনেক। কিন্তু আমি নিরুপায় ছিলাম। সবকিছু উতরে উঠতে দ্রুত চিন্তা করতে হচ্ছিল। তিরানা তখন একা নাশতা করছে। কী করে এত কিছু অল্প সময়ে ভেবেছি আমি? কান দিয়ে ধোঁয়া বের হচ্ছিল নির্ঘাত। কে জানে, চাইলে পারি বোধ হয়।

কিন্তু এখন আত্মগর্বে ফোলার অবকাশ কোথায়। সময়টা ছুঁচালো হয়ে উঠল। চৌকাঠের বাইরে দাঁড়িয়ে থাকা নিয়নের মনের অবস্থা কী? সে এটুকু বুঝতে পারছে, তিরানা তাকে একদম আশা করেনি। দেখে খুশিও হয়নি। তিরানা ঘুরে পেছনে তাকিয়ে আমাকে দেখল। আমি চোখ নামিয়ে নিলাম। এখন মাকারানার অশ্রুও আমাকে বাঁচাতে পারবে না। আমার প্রতি তিরানার সমস্ত ভালোবাসা নিশ্চয়ই জল হয়ে গেছে। 

তিরানার সঙ্গে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়ার পরও নিয়ন আমার সঙ্গে যোগাযোগ রাখত। বড় বোনের ভবিষ্যৎ জীবনসঙ্গী সে। সেইসূত্রে একটা মাধুর্যময় সম্পর্ক তার সঙ্গে বজায় থাকাটাই কি স্বাভাবিক ছিল না? ওরা প্রেম স্বর্গ থেকে এসে স্বর্গে ফিরে যাওয়ার পর অবশ্য মাধুরীতে ভাটা পড়তে পারত। পড়েছেও। কিন্তু শুকায়নি। স্বাভাবিকভাবেই তিরানাকে কেন্দ্র করে পরিচয় বেড়ে ওঠার পর, নিয়নের সঙ্গে আলাদা বন্ধুত্বও তৈরি হয়। সেই বন্ধুত্বের অভ্যস্ততাও তৈরি হয়। ওকে বলতাম ভাইয়া। ওকে বলতাম তুই। এ তো আর চট করে তুলে নেওয়া যায় না। ওটাকেই ব্যবহার করবে নিয়ন? তিরানার খোঁজখবর নিয়মিত করত। ব্যাপারটা আবার তিরানার ছিল না। যে গেছে, সে গেছে। এই সে ভাবত। অবশ্য পরের মন অন্ধকার। বোন হলেও পুরোটা জানি না। তবে ও কখনো জিজ্ঞেসও করেনি, নিয়ন কি তোর সঙ্গে কোনো যোগাযোগ করেছে? আমিও ওর এমন অবস্থানকে শ্রদ্ধা করতাম। তবে নিয়নকেও এড়াতে চাইনি। কারণ, জানি, তাতে মানুষ হিসেবে নিয়ন নিচে নেমে যেতে পারে। ওদের ভেতর ঠিক কী নিয়ে ছাড়াছাড়ি হয়েছিল, সত্যিই আমি জানতাম না। আর ওরা কেউই যেহেতু বলেনি, আমিও যেচে জানতে চাইনি। এটা কোনো আপনজনের মতো কাজ হচ্ছে কি না, এ-ও ভাবছিলাম। আমার ভাবনারেল সিগন্যালে পড়ল। তিরানা অভদ্রতা করেনি, দরজা থেকে সরে দাঁড়িয়ে বলল, ‘এসো।’ 

নিয়ন তারপরও দাঁড়িয়ে রইল কিছুক্ষণ। ‘আমি আসলে, তিরানা, তুমি আমাকে, মূলত, বলতে কি, যেসব ব্যাপার আমাদের ভেতর, আমি আর…’ 

‘আচ্ছা পরে শুনছি। কিছু তোমার অজানা নেই বোধয়। চলে এসো। বেরোলে দ্রুতই বেরোতে হবে।’ 

‘আমি সঙ্গে গেলে তুমি কিছু মনে করবে না?’

‘মনে করব কেন?’ নিরাসক্ত মুখে তিরানা বলল। 

এই নিরাসক্ততা অভিনয় নয়। আন্তরিক। নিয়ন কতটা জানে, জানি না। আমি জানি। নিয়ন মনে হলো হতাশ হয়েছে। ও বোধয় কিছু নাটক আশা করেছিল। গালিবের ভাষায়, শত্রুতার সম্পর্কটুকু হয়তো চেয়েছিল। এই ‘মনে করব কেন’ দিয়ে কী বোঝায়, তা ওর অজানা নয়। এর অবহেলাটুকু নিতে সে প্রস্তুত ছিল না। তবে তাকে তার একেবারে অপ্রাপ্য বলেও মনে করে না। মিইয়ে যাওয়া মুখ নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকল কিছুক্ষণ। আমিও খানিক থমকেছি। অস্বীকার করব না। তাকে ওই অবস্থাতে রেখে ভেতরে চলে আসার অভদ্রতাটুকু তিরানা করল না। তবে মনে হলো তার জন্য তাকে যুদ্ধ করতে হচ্ছে। ঘরে এসে নিয়ন সবার আগে দেখতে চাইল তার দেওয়া উপহারের শূন্যস্থানটা, সন্দেহ নাই। কিন্তু ওটা তিরানার শোবার ঘরে। বন্ধুর সহজ প্রবেশের অধিকার তার এখন নাই। এটা বোঝার পরিমিতিবোধ তার আছে বলে সুখী হলাম। ও বরং কৌতুক করার চেষ্টা করল। 

‘ফুলদানি শোকেসে নাই শুনলাম। কিন্তু ফুল তো আছে।’ 

আমার বলা উচিত ছিল, হ্যাঁ, ফুল যে আছে, তা দেখতে পাচ্ছি। তবে ইংরেজির ফুল। নিয়ন একটু সাহস পেল। বলল, ‘পৃথিবী থেকে বিলুপ্ত হয়ে যায় নাই নিশ্চয়ই। অবশ্য মাকারানার এই পাথর পৃথিবীর বাইরেও আছে। ওদের ডাকে সেখানে চলে গেলে গন্ডগোল।’ 

জগতে অনেক বিচিত্র ঘটনাই ঘটে বলে শুনেছি। কিন্তু এমন বিচিত্র কিছু আমাদের সাধারণ জীবনে এসে এমন একটা ঘোর তৈরি করবে ভাবিনি। নিয়ন বলল, ‘তিরানা, একটা ব্যক্তিগত প্রশ্ন। তুমি কেন ওটা ফিরিয়ে আনতে চাচ্ছ? তুমি তো আমাকে আর ভালোবাসো না যতটা জানি।’

তিরানা ডিভানে গিয়ে বসে ছিল। আমার মনে হলো, ওর হঠাৎ মাথা ধরেছে। নিয়ন না থাকলে মাথা চেপে ধরত। আমার কিছু বলা দরকার। নয়তো ওর মনের ওপর যে চাপটা পড়ছে এই মুহূর্তে, যাত্রার শুরুতে ওর শক্তি কমিয়ে দিতে পারে। এটা আমি চাই না। 

‘নিয়ন ভাই!’ আমি ডেকে উঠলাম। ‘নিয়ন ভাই, আমি তোকে বলেছি একবার সব। তুই তারপরও কেন ওর কাছে জানতে চাচ্ছিস? ওর মুখ থেকে একবার শুনতে চাস, এই তো? তোর মতো ছেলেমানুষ আপু না। কেন ওকে দিয়ে আবার বলাতে চাচ্ছিস? তোকে আমি বিশ্বাস করেছিলাম। ওকে এভাবে দমিয়ে দিয়ো না। ওর সঙ্গী হতে চাস, ও চাইলে হতে পারিস। আমি ওর ওপর অন্যায় করে তোকে সুযোগ দিয়েছি। ও তোকে না মানলেও আমার খাতিরে জানি সহ্য করে যাবে। সবকিছুর মতো এটাকেও ব্যবহার করিস না।’

একটু বেশিই বলে ফেলেছিলাম। বলব নাই-বা কেন। এসেই বাচালতা। একটা চূড়ান্ত দিকে ঠেলে দেওয়া ছাড়া তো নিয়নের শান্তি হলো না। তিরানা বলল, ‘নিয়ন, তুমি হয়তো মিরানার কাছে সব শুনেছ। তবু তুমি যখন আমার কাছ থেকেও শুনতে চাচ্ছ, বলছি। আমি যা প্রতিজ্ঞা করি, তা রক্ষা করি। জীবনের বিনিময়ে হলেও। আমি তোমার এই উপহার যত্নে রাখব প্রতিজ্ঞা করেছিলাম। তোমার আমার সম্পর্ক ফুরিয়ে গেছে। কিন্তু এই প্রতিজ্ঞা তোমাকেও উতরে গেছে। সেটা আমি রক্ষা করব। আমার প্রতিজ্ঞার জন্য ত্যাগস্বীকারে রাজি। আমি ওটা ফিরিয়ে আনতে বাধ্য। এ নিয়ে জবাবদিহি কেবল আমার নিজের কাছে। আমার মনে হয় তুমি বুঝেছ।’ 

‘তিরানা আপু, তুমি গুছিয়ে নাও,’ আমি এগিয়ে এসে বললাম। ও আমার কথার উত্তর করল না। সব গোছানোই আছে। চলে গেল তিরানা নিজ ঘরে। সেখান থেকে আলমারির পাল্লার নড়ার শব্দ হলো। আমি নিয়নের দিকে তাকিয়ে থাকলাম রাগত বিস্ময়ে। আমার চোখে ফুটে আছে— ওই প্রসঙ্গ না তুললে হতো না? তুই এত নির্বোধ কবে থেকে হলি? তোর ভাগ্য ও তোকে ঢুকতে দিয়েছে। 

আমার চোখের সে ভাষা লোকটা বুঝতে পারল। ওর চোখে ফুটে উঠেছে— প্লিজ, এবারের মতো ক্ষমা কর? আর একবারও কোনো ভুল করব না। তবু আমাকে ফেলে রেখে চলে যাস না। একদম শান্ত সুবোধ হয়ে থাকব। কথা দিচ্ছি। 

আমি বাঁকা হেসে বোঝালাম, তোর আবার কথা দেওয়া। ও চোখে দ্বিগুণ অনুনয় ফোটাল। 

শীতল কণ্ঠে জিজ্ঞেস করলাম, ‘চা খাবি নাকি?’ 

‘খাব!’ নিয়ন যেন জলের মাছ জলে ফিরেছে। 

বললাম, ‘করে খেয়ে নে, প্লিজ।’

খবরওয়ালা গ্রাফিক্স

টগর গগনে

 

শেওলা-সবুজ দেয়াল পেছনে পড়ে থাকল। বিদায় আমগাছ, বিদায় কাঁঠালিচাঁপা, বিদায় লেবুর কাঁটাঝাড়, ভাঁটফুল, শ্বেতদ্রোণ, বুনো ল্যান্টানার ঝোপ! বাড়ি ছাড়ছে টগর। এ বাসায় পড়ে থাকলে তার বেঁচে থাকার সব ‘রূপ-রস’ হারিয়ে যাবে। চোখে জল, তবু নিরুপায়। 

জ্যৈষ্ঠের দুপুর। অনুচিত গরম পড়েছে। এমন গরমে ঘরপালানো যায় না। মাথাভরা কোঁকড়া চুলের জন্য গরম আরও বেশি লাগছে। কিছু করার নেই। গৌরব রক্ষা করতে হলে কিছু আঁচ সহ্য করতেই হয়। পিঠব্যাগে এক লিটারের মতো পানি আছে। শেষ হতে সন্ধ্যা। তবে এর আগে একটা আশ্রয় খুঁজে বের করা দরকার। প্রথমে পাবলিক লাইব্রেরি যাওয়া যাক? শাহবাগ। বাসে চড়া লম্বা পথ। সঙ্গে জমানো টাকা যা আছে, তা নিয়ে এক সপ্তাহের বেশি বাসে চড়ার বিলাসিতা করা যাবে না। এরপর পায়ে হেঁটে যাওয়া-আসা করা চাই। সে দেখা যাবে। আপাতত ভাবনা, লাইব্রেরি বন্ধের সময় হলে সে কোথায় যাবে? আপাতত বিকল্প পরিকল্পনা, কোনো এক মসজিদের বারান্দায় গিয়ে উঠবে। মসজিদের বারান্দাগুলোতে বাহির-চরা অনেক মানুষই থাকে। বেশির ভাগই মধ্যবয়স্ক মানুষ। তাদের সাদা লাল নীল পোঁটলাগুলো বারান্দার কোণে স্তূপ হয়ে থাকে। কেউ কেউ, রান্না করে যারা, একটা স্টোভও সাজিয়ে রাখে এক কোণে। এমন সংসারের ভেতর টগর থাকতে পারবে না। তার লাগবে অরণ্য। সে সন্ন্যাসী। মিরপুর ছয় এলাকায় কয়েকটা মসজিদ দেখেছে, বারান্দায় বয়স্ক মানুষেরা ইতিকাফ করে। বাসা থেকে আসে তাদের খাবার। তাদের কারও সঙ্গে জুটে গেলে নিশ্চিন্ত। কেউ কোনো প্রশ্নও করবে না। কারণ, ইতিকাফে বসে কথা বলা নিষেধ। তবে সেখানে সুযোগ পাওয়া কঠিন হবে। সুযোগ পেলেও টেকাটা কঠিন হবে। হয়তো চট করে সুসমাচার শেখাতে শুরু করবে দাদুরা। তার মতো একটা বুদ্ধিমান ছেলেকে কোথাও কেউ সহ্য করবে না, সেটাই স্বাভাবিক। মসজিদে যদি থাকা না যায়, তাহলে শেষ অবলম্বন মাজার আছে। তবে মাজারগুলোয় নাকি শুধু ঢোকার রাস্তা আছে। বাহির হওয়ার নেই। মাজারে এক রাত কাটালে বাকি জীবন মানতের থাকে মোম জ্বেলে আর নবীর নামে কিয়াম করে কাটিয়ে দিতে হয়। উপরি, যে পীরের মাজার, তার মেঝে পরিষ্কার করতে হয় স্বেচ্ছায়। ভাগ্য খারাপ হলে শৌচাগার। টগরের অজানা নেই কিছু। একটু চোখকান খোলা মানুষ সবই জানতে পারে। টগরের সুবিধা হলো, শুধু চোখকানই নয়, মুখও খোলা। মুখ খোলা রাখলে অনেক তথ্য বাইরে যায়, ফলে নতুন তথ্য ভেতরেও আসে। এই লেনদেন তো সবকিছুতেই প্রযোজ্য। কোথায় নেই? মূল কথা হলো চলতে জানলে পথের শেষ নেই। 

ভাবতে ভাবতে রাস্তার মাথায় পৌঁছাল টগর। রাস্তাটা পার হওয়া দরকার। রাস্তা পার হতে গিয়ে দরকার অতিরিক্ত সাবধানতা। কারণ, দুর্ঘটনা আসতে পারে সম্পূর্ণ অজানা দিক থেকে। রাস্তা পার হওয়ার সময়, যেদিক থেকে গাড়ি আসে, সেদিকে তাকানোই যথেষ্ট না। কারণ, যে গাড়ি ধাক্কা দেয়, সে উল্টো পথে আসে। ব্যাপারটা জানা থাকায় রাস্তা পার হওয়ার আগে টগর এদিক-ওদিক দুদিকেই তাকাতে থাকল। হঠাৎ মনে হলো কোথাও কিছু গন্ডগোল আছে। গাড়িগুলো প্রয়োজনের তুলনায় একটু বেশিই জোরে ছুটছে। রিকশাগুলোর কথাই ধরা যাক। এরা যেন উড়ছে। শুকনো শুকনো রিকশাওয়ালার পায়ে এত জোর, ভাবাই যায় না। সিএনজি অটোরিকশাগুলো যেন তাকে দেখছেই না। আর সিডান কিংবা জিপগুলো যেন চাপা দিতে পারলে খুশি। তবে ‘রূপ-রস’ বাঁচাতে যে পথে নেমেছে, থামা তার অভিধানে নেই। টগর লাফিয়ে মাঝরাস্তায় চলে এল এবং সঙ্গে সঙ্গে একটা রিকশা ধেয়ে আসতে দেখে বজ্রাহতের মতো জমে গেল।

শক্ত ব্রেক কষল রিকশাচালক। চাকা এসে থরথর করে থামল টগরের একেবারে পায়ের কাছে! 

‘ছোডো মিয়া। আপনারে রাস্তায় বাইর করসে কিডা?’ 

রিকশাওয়ালার চোয়াল চোপসানো। থুতনিতে দাড়ি। চোখে ঘুমমাখানো বিরক্তি। আপাতত বাঁচা গেল। কারণ, টগর ভেবেছিল রিকশাওয়ালার চোখ দিয়ে আগুন বের হবে। ওনার সামনে নিজের দুর্বলতা প্রকাশ করা যাবে না। আত্মমর্যাদা ধরে রাখতে হবে। কিন্তু রিকশাওয়ালার পেছন থেকে মাথা কাত করে উঁকি দিয়ে চিৎকার করতে থাকল এক লোক। তার নাক আর থুতনিতে ফ্রেঞ্চকাট। হাতে এটাশে। বলল, ‘এই ছেলে! রাস্তা কি তোমার খেলা করার জায়গা?’ 

একটা তুলতুলে থাবা কেউ টগরের কাঁধে রাখল। তাকিয়ে দেখে এক নাদুসনুদুস বৃদ্ধ দাড়ি-গোঁফের আড়ালে তার দিকে তাকিয়ে হাসছে। রিকশাওয়ালা ও ফ্রেঞ্চকাট দুজনের দিকে তাকিয়ে বলল, ‘আমার নাতি। রাস্তায় বের হয়নি আগে। তাই একটু ভড়কে গেছে। কিছু মনে করবেন না।’ 

ফ্রেঞ্চকাট লোকটা বলল, ‘দোষ তো আপনার।’

বৃদ্ধ বলল, ‘দোষ আমি মাথা পেতে নিচ্ছি, জনাব।’ নিরাসক্ত রিকশাওয়ালার দিকে তাকিয়ে বলল, ‘আপনি কিন্তু দারুণ দেখিয়েছেন, খোদা বখত। নিশ্চয়ই আপনার জন্য রয়েছে উত্তম প্রতিদান। বৃদ্ধ তার আলখাল্লার পকেটে ছোট একটা ঢেউ খেলিয়ে হাতে লাল মখমলের টাকার ব্যাগ বের করে আনল। ভেতরে হাত ঢুকিয়ে মুঠোয় যা উঠল, তা নিয়ে বাড়িয়ে দিল রিকশাওয়ালার দিকে। ঝিকমিক করছে সোনালি মুদ্রা। রূপকথা থেকে উঠে এল নাকি লোকটা? রিকশাওয়ালার নিরাসক্ত চোখে এবার বিরক্তি। ভেবেছে কোনো জাদু হবে। কিন্তু হাতে নিয়ে ভর টের পেয়ে প্রথমবারের মতো চোখে বিস্ময় ফুটল। 

এখনই টগরের দৌড়ে পালানোর সময়। তার উপক্রম করার আগেই বৃদ্ধ লোকটা দুহাতে তাকে শূন্যে তুলে ফেলল। স্বর্ণমুদ্রার থলে আবার সাদা ঢলঢলে আলখাল্লার কোথাও চালান করে দিয়েছে। ফ্রেঞ্চাকাটকে উদ্দেশ করে বলল, ‘দেখলেন তো, কেমন ভড়কে গেছে? নিজের দাদাকে ছেড়ে পালাতে চায়। পা দুটো দেখুন? যেন সাইকেল চালাচ্ছে।’

‘যত পাগলের গাঁট,’ বলল ফ্রেঞ্চকাট। রিকশাওয়ালার পিঠে টোকা দিয়ে বলল, ‘এই চলো!’

রিকশাওয়ালা পাশ কেটে চলে যাওয়ার সময় সেই বৃদ্ধ দাদুকে একটা সালাম দিয়ে বসল। দাদুর দাড়ি দৈর্ঘ্যে-প্রস্থে বেড়ে বাতাসে নড়ছে বুকের ওপর। দরদঢালা কণ্ঠে বলল, ‘খোকা, ভালো আছ? তোমার সঙ্গে কিন্তু আমার কথা আছে। ভীষণ জরুরি। আগে বলো, তুমি ভালো আছ?’

সাক্ষাৎ ছেলেধরা। এদের কথা অনেক শুনেছে মায়ের কাছে। এদের রুমালে থাকে ক্লোরোফর্ম। নাকে ধরে অজ্ঞান করে। তারপর ঠেসে বড় ভ্রমণব্যাগে ভরে। হাতে তুলে হাঁটতে থাকে, যেন খুব তাড়া। কেউ জিজ্ঞেস করলে দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলে, ‘বাড়ির খবর পালাম, বড় ভাই। মন ভালো নাই। দুপুরের ট্রেন কটার দিকে কতি পারেন?’

হ্যাঁ, বাতাসের একটা বলয় যেন তাকে ঘিরে পাক খেতে খেতে একবার ওপরে উঠছে, একবার নামছে। বাতাস যেন তার সঙ্গী কোনো চঞ্চল আমুদে বালক। বৈশাখী মেলায় যাওয়ার আনন্দে কথায় কথায় যে উঠানে ডিগবাজি খাচ্ছে। একটা ছোট ঘূর্ণি শূন্যে ভাসমান টগরের পায়ের নিচ দিয়ে ঘাগরা দুলিয়ে সরে গেল। দাড়ি-গোঁফের আড়াল থেকে আলখাল্লাবুড়ো বলল, ‘বুঝেছি, তুমি ভালো নেই।’ 

মৃদু হাঁ হয়ে ছিল টগরের মুখ। মুখ বন্ধ করে বলল, ‘আমাকে নামিয়ে দিন। ব্রহ্মাণ্ডের অধিপতি হি-ম্যানের দোহাই।’

বৃদ্ধ বলল, ‘বাহ্, কী অপূর্ব তোমার চোখ দুটো। নামালে তুমি পালাবে না তো?’

টগর দুদিকে মাথা নাড়ল। তারপর বৃদ্ধ তাকে নামানোমাত্র দৌড়। 

দৌড়, দৌড়, দৌড়! একবার হোঁচট খেয়ে পড়তে গিয়ে সামলে নিল। কারও হাতে পড়তে চায় না। অচেনা কারও হতে তো নয়ই। এই ছেলেধরার হাতে পড়লে ‘রূপ-রস’ কোথায় যাবে, তার ঠিক তো নেই-ই, উপরন্তু কোনো দিন তাদের আর ফিরিয়েও আনা যাবে না।  

কিন্তু মোড় ঘুরতেই কার নরম পেটের ভেতর সেঁধিয়ে গেল টগর। তাকিয়ে দেখে সেই বৃদ্ধ। পেট যে এত নরম, যেন শিমুল তুলার বালিশ। পেটের সঙ্গে নাক ঘষে টগর যেন ডগায় চড়িয়ে একটা সুবাস নিয়ে এসেছে। গোলাপ ফুল আর কাঁঠালিচাঁপার পাপড়ি একসঙ্গে ছেঁচে রস বের করলে সেই রসের ঘ্রাণ এমন হতে পারে। টগর সশব্দে এক হাঁচি ছাড়ল। লোকটা কেমন হাসি হাসি চোখে তাকিয়ে আছে তার দিকে। টগর ঝটিতে ঘুরে দাঁড়াতেই তার হাত ধরে ফেলল। 

‘বাবু। যেয়ো না দয়া করে।’ 

টগর একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। এত বেশি চিন্তা করেন তারা যে একটু কম চিন্তা করলে টগর বেঁচে যেত। আজ তাকে বাড়ি থেকে পালাতে গিয়ে রিকশার চাকার নিচে পিষ্ট হতে হতো না। বৃদ্ধ বলল, ‘আমি কিন্তু ছেলেধরা নই। তবে তুমি ঘরপালানো ছেলে। কি, ঠিক ধরেছি?’

‘ঘর কি আর এমনি এমনি পালাচ্ছি?’

‘কী হয়েছে জানতে পারি?’

‘প্রশ্নই আসে না।’

‘ঠিক আছে, ঠিক আছে। না বলতে চাইলে নেই। আমি ছোটদের সঙ্গে জোরজারি একদম পছন্দ করি না।’ 

টগর সতর্ক সন্দেহ নিয়ে তাকাল। এই প্রথম বড় কাউকে যুক্তির কথা বলতে শুনছে। যে জোর করে, তাকে ভালো লাগে না। কিছু বলতে ইচ্ছা করে না, তার জন্য কিছু করতে ইচ্ছা করে না। যে জোর করে না, সে উল্টো জোর আকর্ষণ তৈরি করে। লোকটা এমন নাদুসনুদুস আর হাসিখুশি, মনে হয় যেন মজার লোক। আসলেই কি মজার? বুড়ো হয়ে একশেষ। কিন্তু লোকটার শক্তি আছে। হঠাৎ একটা অদ্ভুত প্রশ্ন মনে এল। কত বয়স এই লোকটার? সত্তর বা আশি? নব্বইও হতে পারে। কিন্তু এ রূপকথার লোক। স্বর্ণমুদ্রা বের করে দেয়। সুতরাং বয়স ত্রিশ হাজার নব্বইও হতে পারে। টগর অবাক হবে না। লোকটা সত্যিই কিছু জানে। কেবল বয়সেই বাড়েনি। লোকে যা বলে—বাতাসে চুল পাকেনি। জানতে জানতে পেকেছে। 

লোকটা বলল, ‘তোমার জীবনের সব রূপ-রস শুকিয়ে যাচ্ছে, তাই তুমি পালাচ্ছিলে, ঠিক বলেছি?’ 

টগর হাল ছেড়ে দিল। লোকটা যদিও অনুমান-অনুমান খেলছে, কিন্তু এটা অভিনয়। এ লোকের সঙ্গে কিছু আছে, সে ধরতে পারছে না। ওপরের ক্লাসের বাংলা বই থেকে নেওয়া তার প্রিয় শব্দ রূপ-রস। রূপ-রস ঘিরেই সে ভাবছিল যে শুকিয়ে যাচ্ছে সবটা। লোকটা তার মনের শব্দ পড়ে নিয়েছে। নাকি স্রেফ ঢিল ছুড়েছে? নাহ্, বড় বেশি কাকতালীয়। 

‘ধরে নিলাম তোমার বাবা-মা এর পেছনে দায়ী…’ 

টগর রাস্তার ওপারে ফুটপাত ধরে যেতে থাকা একটা বেলুনওয়ালার পসরার দিকে তাকিয়ে থাকল। লাল বেলুনের ওপর হলুদ হলুদ ছোপ। অনেক দিন এ রকম ফেরিওয়ালা দেখা যায় না শহরে। এ কোথা থেকে এল? লোকটা বলল, ‘তবু বাবা-মায়ের মন আমি যতটা বুঝি, তারা তোমার জন্য খুব চিন্তা করছেন।’ 

আর সময়ক্ষেপণ নিষ্প্রয়োজন। টগর লোকটার পাশে পাশে হাঁটতে শুরু করেছে। 

‘দেখুন, আমি আমার বাবা-মাকে চিনি। খুব চিন্তা করছেন, সত্য কথা। ওই নিয়ে আমার কোনো সন্দেহ নাই। দুঃখও নাই। আমি আদর পাই না, এমন না। আমি খুবই আদর পাই। তারা খুবই চিন্তা করেন। কিন্তু তারা কিছু জিনিস বোঝেন না। তারা বোঝেন না যে টগর ঠিক কোথায় আটকে যাচ্ছে। তারা অনেক কিছুই বোঝেন না। তারা আমার মনের ওপর চাপ দেন।’ 

‘মনের ওপর চাপ!’

‘হ্যাঁ। মনের ওপর চাপ। তারা মনের ওপর অনেক চাপ দেন। এই যে বাসা থেকে পালালাম, সে কি ইচ্ছা করে পালাচ্ছি? আমার মনের ওপর চাপ দিয়েছে। আমাকে বাধ্য করেছে।’ 

‘বাধ্য করেছে!’ বৃদ্ধ আবার ঢোঁক গিলল।

‘অবশ্যই বাধ্য করেছে। যে ঘরে মনের ওপর এমন চাপ দেওয়া হয়, সেখানে ফিরে যাওয়া কি ঠিক?’ 

‘ঠিক না। এই চাপ সহ্য করা তো সহজ না। মানুষের শরীরের ওপর চাপ দিলেও মন বেঁচে থাকতে পারে। কিন্তু মনের ওপর চাপ দিয়ে মনও বাঁচে না, শরীরও বাঁচে না। কিন্তু তাদের কি বোঝানো সম্ভব? মানে, তাদের যদি আমি গিয়ে বুঝিয়ে বলি, যেন তারা তোমার মনের ওপর আর চাপ না দেন, তাহলে কি তাদের বদলানো সম্ভব? তুমি কী মনে করো?’ 

‘আমি জানি না।’

‘জানো না। হুম। এটাই আসল উত্তর। জ্ঞানীর উত্তর। মানুষের জ্ঞানের সাধনা হলো কত দূর সে জানে না, তা আবিষ্কার করার সাধনা।’ 

এই মানুষটি এত দিন কোথায় ছিল? গোলাপ আর কাঁঠালিচাঁপার মেলানো সুঘ্রাণের বাইরেও আরও কী যে বিশেষ এই মানুষটার। টগরের সঙ্গে কথা বলার সময় একবারও ভাবছে না এ কথা একটা বারো বছরের ছেলেকে বলা হচ্ছে। এমনভাবে বলছে যেন দুজন বয়সে সমান। জ্ঞানে গভীরতায় সমান। সুখে আর দুঃখে সমান। গলিমুখে একই সঙ্গে রোদের মুখে দাঁড়িয়ে থাকার কারণেও হতে পারে, তার পরনের সাদা আলখাল্লা থেকে একটা সাদা আথস্বচ্ছ বের হচ্ছে বলে মনে হচ্ছে। লোকটার হাত, পা, মুখ, কপাল, দাড়ি—এই সমস্তেও একটা স্বচ্ছ সাদা আলো। অবশ্য হতে পারে শুধু মনেই হচ্ছে এমন, আসলে কিছু নয়। লোকটাকে টগরের কাছে স্বপ্নের একজন মনে হচ্ছে বলেই হয়তো এমন দেখতে পাচ্ছে। চেষ্টা করলে হয়তো মাথার ওপর একটা চক্রও দেখতে পাবে, ফেরেশতাদের যেমন থাকে। ও খানিক পেছনে সরে এল। না, কোনো চক্র নেই। আলোও ঠিকরে বেরোচ্ছে বলে মনে হচ্ছে না। 

টগর বলল, ‘না জানলেও, শেষ চেষ্টা করতে পারি মনে হচ্ছে। আপনি বললে কোনো কাজ হতেও পারে। মনে হচ্ছে আপনি পারবেন।’ 

বৃদ্ধ বলল, ‘আমার ওপর আস্থা রাখার জন্য ধন্যবাদ। আমি চেষ্টা করব। কিন্তু আজকালকার বাবা-মা। আমার মোহনশক্তি যদি কাজে না লাগে?’

‘তাহলে হয়তো আমাকে আবার পালাতে হবে।’ 

‘তুমি যেমন আমার ওপর বিশ্বাস রেখেছ, আমিও তেমনি তোমার ওপর বিশ্বাস রাখছি। আমার ধারণা, তুমি কোনো ভুল করবে না। করতে পারো না। যার মনে এত দরদ, যার এত সংবেদনশীল, এত শখ, এত ব্যথা, এত গান, এত ভাব, যার মন ধরে, জীবনের রূপ-রসের ব্যাপারে যে এত সাবধান, তার দ্বারা কোনো ভুল, কোনো অবিচার হতে পারে, এ আমি বিশ্বাস করি না।’

টগর বলল, ‘আপনার নাম জানতে পারি? আমি দাদু ডাকতেই পারি। তবু যদি নামটা জানা থাকলে সুবিধা।’ 

‘নিশ্চয়ই নিশ্চয়ই। আমার নাম গগনে।’ 

‘গগনে? গগন না?’

‘গগন না। গগনে। গগনে গরজে মেঘ ঘন বরষা—সেই গগনে।’

‘দারুণ তো!’ 

‘তোমাদের এখানে নামে সাধারণত বিভক্তি থাকে না, কিন্তু আমার আছে। আমি তো একটু অন্য রকম, তাই। তা চলো, কোন দিকে তোমার বাসা?’

‘পশ্চিম গগনের দিকে, যেদিকে সূর্য ডোবে।’ 

বৃদ্ধা আঙুল তুলে দেখাল, ‘হোই পশ্চিম! চলো। চলো, ইয়ে, তোমার নাম?’

‘একটা সাদা ফুল। টগর। চেনেন?’

‘ফুলটাকে চিনতাম। এখন মানুষটাকেও চিনলাম।’

যেতে পথে টগরকে একটা দোকানে কাচের আড়ালে দাঁড়িয়ে থাকা স্প্রিংগলসের দিকে তাকিয়ে থাকতে দেখে গগনে বলল, ‘তোমার পছন্দ?’

‘পছন্দ হয়ে লাভ কী?’

‘ওটা তোমার হলো।’

‘কী! অ-নেক দামি ওটা।’

‘দামি তো কী হয়েছে। আমার কাছে অনেক টাকা আছে। পৃথিবীতে ওড়ানোর মতো যথেষ্ট টাকা।’ লোকটা আলখাল্লার পকেটে সেই মখমলের থলে ঝনঝনাল। ‘নির্দিষ্ট সময়ের আগে আমাকে টাকাগুলো শেষ করতে হবে একজনের হয়ে। কীভাবে কী করব ভেবে পাচ্ছিলাম না। কিন্তু একের পর এক ব্যবস্থা হয়ে যাচ্ছে, খোদার হুকুম। আশা করি ও একটা গ্যাসে চলা অটোরিকশা কিনে ফেলবে।’ 

টগর অবাক চোখে তাকিয়ে থাকল। গগনে ঢুকে পড়ল দোকানে। একটু পর একটা সাদা নেটের ব্যাগে বড় একটা স্পিংগলস এনে টগরের সামনে ধরে বলল, ‘নাও। তোমার উপহার।’ 

টগর হাসতে গিয়েও হাসল না। নিতে গিয়েও গুটিয়ে নিল হাত। কিন্তু শেষমেশ নিল। নেটের ব্যাগটা খুলে নিয়ে ভাঁজ করে পকেটে রাখল, মায়ের কাজে লাগতে পারে। মা! তার মানে টগর এরই মাঝে বাসার কথা ভাবছে। লোকটার আসলেই মোহনশক্তি আছে। স্প্রিংগলের প্লাস্টিকের ঢাকনা খুলে কাগজ ছিঁড়ে তুলে টগর বৃদ্ধের দিকে বাড়িয়ে দিল। 

গগনে বলল, ‘বাহ্! তুমি খুব ভালো!’ দুটো চিপস নিল গগনে। খেতে খেতে বলল, ‘সত্যিই দারুণ!’ 

কাউন্টারের লোকটা দুটো স্বর্ণমুদ্রা নিয়ে বোকার মতো তাকিয়ে আছে। দুজন খেতে খেতে কাচের দরজা ঠেলে বেরিয়ে পড়ল। টগর একটা ইটে হোঁচট খেয়ে পড়ে যাচ্ছিল প্রায়। গগনে তাকে ধরে ফেলল। যখন আরও মিনিট দশেকের পথ বাকি, রানা একটা সেলুন ওরা পাশ কাটাল। দীর্ঘশ্বাস ফেলল টগর। লার্নার্স নামে একটা বইয়ের দোকান পাশ কাটানোর সময় টগর আর পারল না। 

‘আমার বাবা-মা কিন্তু আগে এমন ছিল না।’ 

‘কেমন ছিল তারা?’

টগর বলে গেল কেমন ছিল তার বাবা-মা। তারপর তারা ধীরে ধীরে কিসে বদলে গেল। টগরের বাবা তার সঙ্গে প্রতি বিকেলে অফিস থেকে এসে এক বা দুই চাল দাবা খেলত। মাথার ঘাম পায়ে ফেলেও টগরকে হারাতে পারত না। বাঁশের কঞ্চি কেটে, বাঁকিয়ে ধনুক বানাতেন আর ডগা চোখা করে তির। তারপর সামনে বাগানে অর্জুন খেলা হতো। অর্জুন খেলা হচ্ছে তিরিশ ফুট দূরে একটা শুকনো কাঁঠালপাতা সুতো বেঁধে একটা পেয়ারাগাছ থেকে ঝুলিয়ে দেওয়া হতো। সেটা সই করতে হতো। টগরের তির হয়তো তার এক-দুই আঙুল এদিক-ওদিক দিয়ে যেত, কিন্তু তার বাবার তির যেন চার-পাঁচ হাত দূর দিয়ে। টগর যে আসলে কত বড় যোদ্ধা, সেটা বলতে বলতে তিনি তাকে মুখস্থ করিয়ে দিতেন। তাদের বুকশেলফে দাদার, বাবার, আর মায়ের সংগ্রহের প্রায় সতের শ বই। সেখান থেকে তার সাথে পাল্লা দিয়ে মা গোয়েন্দা উপন্যাস পড়তেন। এক মাসে কে কটা শেষ করতে পারে। জীবনানন্দ আর রবীন্দ্রনাথের কবিতা মুখস্থ করার প্রতিযোগিতা করতেন এবং উল্টো দিক থেকে কে কত দূর বলে যেতে পারে। এত মজা হতো যে হাসতে হাসতে পেট ধরে যেত। 

তারপর একদিন সব বদলে গেল। হঠাৎ করেই। ভাদ্র মাসে রোদে ভরা আকাশ যেমন হঠাৎ মেঘে ছেয়ে যায়। 

প্রথম মন্দ ঘটনা শুরু হয় টগরের চুল নিয়ে। টগরের চুল ঘন, মিশকালো, মসৃণ আর তরতর করে বাড়ত, আর বেঁকে বেঁকে যেত। চুলগুলো তার গৌরব। দাবা খেলায় জিতে যেতে যেতে সে নিজেকে ঘোড়ায় চড়া সমুদ্র গুপ্তরূপে কল্পনা করত, অর্জুন খেলায় প্রায় জিতে গিয়ে নিজেকে মহাবীর অর্জুন মনে করত যখন, কবিতা মুখস্থ বলে যেতে যেতে একটা দুটো করে শব্দের প্রেমে পড়ে হঠাৎ একদিন ঋতুর প্রতি মুগ্ধতা নিয়ে নিজেও দুটো লাইন লিখে বসলে, নিজেকে রবীন্দ্রনাথ মনে করল যখন, সমস্তের সঙ্গে তার সেই ঘন কালো মসৃণ উড়ু উড়ু কাঁধ অবধি নেমে আসা কালো চুল ভীষণ মানিয়ে যেত। ওরা বাতাসে উড়ত, ভিজে গেলে পিঠে বিশ্রাম নিত, শুয়ে থাকলে শিথান ভাসিয়ে দিত। আয়নায় নিজেকে দেখে মনে হতো টগর যেন কোনো যুবরাজ এবং সেই যুবরাজটির বাবা-মা পরিবারের রাজা আর রানি তার মুগ্ধ দর্শক। হঠাৎ একদিন বাবার মনে হলো এই দীর্ঘ চুল অসভ্যতার চূড়ান্ত। এই দাবা খেলা ধর্মীয়ভাবে অসিদ্ধ। এই অর্জুন খেলা তার নামসহ পরিত্যাজ্য। মা মনে করলেন, ওই কবিতা অর্থহীন। ওই গোয়েন্দা উপন্যাস বা পড়ে শোনানো বিশ্বযুদ্ধের ইতিহাস ওসব নির্বোধের স্বর্গ। ওখান থেকে নেমে আসতে হবে। বাবা তাকে হিড়হিড় করে টেনে এনে এই রানা সেলুনে চুল কাটিয়ে দিল; টগর পালিয়েছিল, সেখান থেকে ধরে এনে। মা ওর হাত থেকে টেনে নিয়ে উপন্যাস ছিঁড়ে কুটিকুটি করে আগুন জ্বালিয়ে দিল, আর শর্ত দিল ক্লাসের গণিত বইয়ের সমস্ত অঙ্ক মুখস্থ করে ফেলতে হবে; টগর কম্বলের নিচে টর্চ জ্বেলে লুকিয়ে যখন বই পড়ছিল, সেখান থেকে তাকে একটানে নামিয়ে এনে। নিষিদ্ধ হলো লার্নার্স নামে প্রিয় এই বইয়ের দোকানো আসা-যাওয়া এবং দুজন চোয়াল শক্ত করে জানিয়ে দিল, এত দিন ভুল করে যা হওয়ার হয়েছে, ওসব আর চলবে না। এখন থেকে নতুন নিয়ম হলো এই। উপাসনা আর আনন্দের বিষয় হয়ে রইল না। হয়ে পড়ল অনাদায়ে মার খেতে হবে, এমন বাধ্যতামূলক।

এই পুরো বদলটা ঘটল এক মাসেরও কম সময়ের ব্যবধানে। করোনা মহামারি আসার এক মাস আগে ঢাকা শহরের অবস্থা যেমন ছিল, আর এক মাস পর যেমন হলো, তার ভেতর যেমন আকাশ-মাটি পার্থক্য, ওই একটি মাসের পার্থক্যও হলো তেমন। আনন্দেরা আতঙ্কে বদলে গেল। আগ্রহ দুর্বোধ্য বাধ্যবাধকতায় ছেয়ে গেল। জীবনের রূপ গেল মুছে, জীবনের রস গেল শুকিয়ে। 

পল্লবী এলাকায় একটা একতলা সাদা বাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে পড়ল টগর। দীর্ঘশ্বাস ফেলল। বুড়ো গগনে খুব ভালো করে দেখে নিতে থাকল বাড়িটা। বাড়িটার সামনে বড় উঠান রেখে চারদিকে দেয়াল তুলে দেওয়া। উঠান গাছপালা ঝোপঝাড়ে বোঝাই। তার ভেতর ইটবিছানো পথ। বাড়ির পুরোনো সাদা দেয়ালে সবুজ শেওলার মখমল। দেয়ালের গোড়া, তার ওপর দিককার জায়গাটা, সমস্তে, ওরা ছড়িয়ে। চাইলে পৃথিবীর সব কটি দেশের মানচিত্র ওখানে খুঁজে পাওয়া যাবে। বাড়িটার ছাদলগ্ন বাড়ন্ত সানসেট শেওলায় সবুজ। বাড়ির উঠোনের চার কোণে চারটি বড় বড় দেশি শিরীষগাছ। তবে পশ্চিম দেয়াল ঘেঁষে একটা সোনালু। ভরা গ্রীষ্ম এখন। সোনালু তাই ফুলে ফুলে ছাওয়া। মূল বাড়িতে ঢোকার নীল রং করা কাঠের দরজা একটু সামনে, ইটবিছানো পথের এক পাশে কোমর বাঁকিয়ে দাঁড়ানো এক নাচুনে দাদিমা আমগাছ। বাড়িটা দেখে একটা কথাই মনে হলো। স্বর্গের পরিত্যক্ত ডাকঘর। 

‘তো এটা তোমার বাড়ি?’

টগর বলল, ‘আমার দুর্ভাগ্য।’ 

‘ছি, এভাবে বলতে নেই। টগর, আমার খুব তীব্রভাবে একটা কথা মনে হচ্ছে এবং তা সত্য না হয়ে উপায় নেই। কারণ, আমি খুবই শক্তিশালী সংকেত পাচ্ছি।’ 

‘কিসের সংকেত।’

‘বাড়িতে কোনো মানুষের সংকেত পাচ্ছি না।’ 

‘মানে, আপনি সংকেত পাচ্ছেন যে আপনি কোনো সংকেত পাচ্ছেন না!’

‘হ্যাঁ। মানে, না। বাড়িতে কোনো মানুষ নেই, তোমার বাবাও নেই, মা-ও নেই। তবে কী যেন আছে। দুঃখিত। “কারা” যেন আছে। বলতে কি, আমার অবতরণ সফল। বুঝলে? যে কারণে আমার আসা। তোমাকে শুরুতে যে বললাম, কথা আছে। তা আসলে এ বিষয়েই। তোমাকে যখন পথে দেখি, শরীরে ফিরোজা জ্যোতি লেগে আছে। ওই দেখেই তোমার কাছে যাই।’

‘কী অদ্ভুত!’ টগর তার দুই হাত, মুখ স্পর্শ করল। ‘এখনো বের হচ্ছে?’

গগনে বলল, ‘সামান্য। তখন আরও বেশি ছিল।’

‘কারা তারা, সে বিষয়ে আমার ধারণা এই,’ টগরের প্রশ্নের উত্তরে বলল গগনে।  ‘তবে ওরা বিশেষ কেউ। ওদের গতিবিধি সন্দেহজনক। আমি ওদের বিধি বুঝতে পারছি। এখানে দুটো আদিম শক্তি পরস্পরের সঙ্গে মিলেছে। ওরা না-ভালো, না-মন্দ। তবে নিঃসন্দেহ অতি উঁচু মাপের সত্তা এবং আরও একটা বিষয়, আমার বিশ্বাস, তোমাকে বললে তুমি বুঝবে এই জগৎ চলছে মহানিয়মে। মহানিয়ম হলো জীব আত্মা ও অজীব আত্মার সমন্বয়। সময় অন্বয়। অর্থাৎ দুটোই সমপরিমাণ এবং তাদের আত্মীয়তা হয়েছে। কেউ কারও ওপর আধিপত্য করবে না। তারা সম। সুতরাং তারা একে অপরের মিত্র। বন্ধু। এভাবেই থাকবে। যা করার এভাবেই করবে। এখানে একটুকরো মহানিয়ম তৈরি হয়েছে। তোমাদের বাড়িতে এমন একটা কিছু এসেছে, যেখানে জীব আত্মা ও অজীব আত্মা এক হয়ে আছে। এটা কখন হয়, জানো? তোমাকে বললে তুমি বুঝবে। কারণ, তুমি শিল্পী হবে বড় হলে। কোনো শিল্পী যখন কোনো শিল্প তৈরি করে, তখন একটা অদ্ভুত অন্বয় ঘটে। শিল্পী হলো ব্যক্তি, শিল্প হলো বস্তু। ব্যক্তি যখন বস্তু তৈরি করে, তখন বস্তুও ব্যক্তিকে বদলে দেয়। তারা পরস্পরের ওপর ক্রিয়া করে। তাদের ভেতর একটা বন্ধন তৈরি হয়। এ গেল বন্ধন, অর্থাৎ আত্মীয়তার কথা। এবার আসি আত্মার কথায়। যখন শিল্পী কোনো শিল্প তৈরি করে, নিবিড় মনোযোগে, মন-প্রাণ ঢেলে, তখন তার মন-প্রাণ সেই বস্তুর কোষের ভেতর ধীরে ধীরে প্রবেশ করবে। করে সেই বস্তুর ভেতর থাকা অজীব আত্মাকে জড়িয়ে ধরতে চায়। তারা পরস্পরকে জড়িয়ে ধরা ছাড়া শিল্প হবে না। যখনই তারা পরস্পরকে জড়িয়ে ধরে, বস্তু তখন শিল্প হয় এবং শিল্প তখন জীবন্ত হয়। কোনো একটা ছবি, ভাস্কর্য, অথবা লেখা যদি তোমার জীবন্ত মনে হয়, বুঝবে, ওখানে শিল্পীর আত্মা ঢুকে পড়েছে এবং ঢুকেই ক্ষান্ত নয়। সে বস্তুর আত্মার সাথে মিতালি করতে পেরেছে। তারা বন্ধু হয়েছে। পরস্পরকে জড়িয়ে ধরেছে। যদি দেখো কোনো শিল্প যেন অল্পের জন্য প্রাণ লাগি লাগি করছে, তবু শেষ মুহূর্তে যেন জীবন্ত লাগছে না। তখন বুঝবে, সেখানে শিল্পীর আত্মা ঢুকেছে। কিন্তু বস্তুর আত্মা তাকে জড়িয়ে ধরে নাই। আর কোনো কোনো শিল্পকে দেখে তুমি বুঝবে, আবারও বলছি, বড় হয়ে তুমি নিজে যখন শিল্পী হবে, তখন বুঝবে, কোনো কোনো শিল্পে কোনো প্রাণ নাই। ওগুলো বস্তু, বস্তুই রয়ে গেছে। রং রংই রয়ে গেছে, পাথর পাথরই রয়ে গেছে, অক্ষর অক্ষরই রয়ে গেছে। জেগে ওঠে নাই। তখন বুঝবে ওরা কেউ কাউকে জড়িয়ে ধরে নাই। মুখোমুখি থমকে দাঁড়িয়ে আছে বা শিল্পীরও আত্মা সেখানে আদৌ ঢোকে নাই। বস্তুর আত্মাও একা জেগে আছে। কারও কাছে কারোর খবর নাই। টগর। ঠোঁটের কোণ মোছো।’

টগর ঠোঁটের কোণে জমতে থাকা লালা মুছে লজ্জিত হাসল। ‘খুব মন লেগে গেলে আমার এমন হয়।’

‘আমি জানি। এটাই আশার কথা।’

‘তাহলে এখানে কী হলো?’

‘যখনই কোনো শিল্পে জীব আত্মা আর অজীব আত্মা পরস্পরকে জড়িয়ে ধরে, সেটা মহানিয়মের একটা উৎস হয়ে যায়। এই জগৎ চলছে মহানিয়মে। ওই শিল্প তখন জগৎ নিয়ন্ত্রণ করতে পারে।’

‘ব্রহ্মাণ্ডের অধিপতি?’

‘ঠিক তাই। সে না-ভালো, না-মন্দ। সে কেবল বিপুল ক্ষমতা। এখানে একটা ক্ষমতা নিজ ইচ্ছায় নড়ছে। তার উদ্দেশ্য বুঝতে পারছি না। তাই আমি এসেছি। তাকে বুঝতে। তোমার শরীরে তার রং লেগে আছে। তুমি তাকে ধরেছ। তুমি কি বাসায় এমন কিছু দেখেছ, ভীষণ সুন্দর? যদি সুন্দর না-ও লেগে থাকে এখন, অসুবিধা নেই। কোনো শিল্প কি দেখেছ? কোনো ছবি, কোনো ভস্কর্য, কোনো বই?’

‘মনে নেই।’

‘বই হবে না। কারণ, আমি দুই পক্ষেই যে আদিম আত্মার ঘ্রাণ পাচ্ছি, বই সেই তুলনায় সাম্প্রতিক। ছবিও কমবেশি তাই। বাকি থাকে ভাস্কর্য। কোনো ভাস্কর্য দেখেছ? ধরেছ?’

‘আমাদের বাসায় একটা দেবী ভেনাসের ভাস্কর্য ছিল। বাবা আর মা সেটা কিছুদিন আগে একসঙ্গে ভেঙে ফেলেছে। আমি টুকরোগুলো জড়ো করে কবর দিয়েছিলাম।’

বৃদ্ধের ঠোঁটে তৃপ্তির হাসি দেখে টগর বলল, ‘ওটাই? প্রাণ ছিল কি না, জানি না ওটায়। তবে আমার দেখতে খুব ভালো লাগত। আমি অনেক দিন তার গায়ে হাত রেখেছি। মা বলত ওটা চিনামাটি। হালকা গোলাপি একটা আভা ছিল সেই চিনামাটিতে। এমন সুন্দর আমি কিছু দেখিনি আর। ওটাই?’

‘ওটাই কি না জানি না। আমি হাসছি অন্য কারণে। সে কথা থাক। তুমি বলে যাও, আর কিছু দেখেছ?’

হঠাৎ বাড়ির ভেতরে পাকা মেঝেতে সজোর কিছু তৈজসপত্র বুঝি আছড়ে পড়ল। টগর বলল, ‘আমার ভয় করছে।’ 

গগনে তার গলা থেকে একটা লাল পুঁতির মালা খুলে নিল। হাঁটু গেড়ে বসে পরিয়ে দিল টগরের গলায়। বলল, ‘এটা সাহসপুঁতির মালা। এই মালা যার গলায় থাকে, তার বুকে এগারো বীরের সাহস ভর করে। তবে এটা কাজ করতে সময় নেয়। এখন থেকে আরও কয়েক ঘণ্টা পর এটা পূর্ণ শক্তিতে কাজ করবে। এখন তাকে তোমাকে বুঝে নিতে সময় দাও। এটা গলায় দিয়ে এখানে কোথাও চুপটি করে অপেক্ষা করো, লুকিয়ে থাকো। আমি বাড়ির ভেতর থেকে আসছি।’

‘না, আপনি যাবেন না!’ বৃদ্ধকে তার ভালো লেগেছে বললেও কম বলা হয়। বৃদ্ধ লোকটা মানা শুনে বলল, ‘হা হা হা হা! আমার কিছু করতে পারবে না। দেখবে তুমি।’ 

টগর বাড়ির গেটের কাছ থেকে খানিক সরে দূরে দাঁড়িয়ে দেখতে পেল গগনে ফটকের আংটা সরিয়ে ভেতরে ঢুকে পড়ছে। বাবা-মা যদি না-ও থাকে, বাইরে তালা দিয়ে যায়নি কেন? আর তারা যদি গিয়েই থাকে, ভেতরে কে? তারা গেছেনই-বা কোথায়? কোথায় আর। 

নিশ্চয়ই তাকে খুঁজতে বেরিয়েছে। খুঁজতে যদি বেরোবেই তো ঘর ফাঁকা রেখে দুজনেই কেন বেরোবে। একজন তো ঘরে থাকবে, যদি টগর ফিরে আসে, সেই অপেক্ষায় এবং টগর এলে অপরজনকে জানানোর জন্য। এ বাড়িতে তো আর কোনো ভাড়াটে থাকে না, যারা টগর এলে জানাতে পারবে। বড়রা বড় নির্বোধ। কারণ, বহু আগেই তাদের রূপ-রস শুকিয়ে গেছে। 

খবরওয়ালা গ্রাফিক্স

নীল দরজার সামনে দাঁড়িয়ে গগনে শেষবার পেছন ফিরে তাকাল। পৃথিবীতে তার কম আসা পড়েছে। সবাই বলে ভীষণ মায়ার জায়গা। এলে আর ফিরতে ইচ্ছা করে না। কথা সত্যি। ইচ্ছা করছে, গগনে সত্যিই এই ছেলেটির দাদু হয়ে থেকে যাক। কিন্তু না। তাতে মহানিয়মের ধারা রক্ষা করতে হয়। রাধাও রক্ষা করতে হয়। ধারা ওপর থেকে নিম্নগামী। রাধা নিম্ন থেকে ওপরগামী। মেঘ থেকে বৃষ্টি ঝরা— ধারা। বাষ্প হয়ে মেঘে ফেরা— রাধা। গগনে কেবল ধারা রক্ষা করে। নিয়ন্ত্রণ করে। কিন্তু রাধা আপনাতে রক্ষিত হয়। নিয়ন্ত্রিত হয়। যে ছেলেটি উৎসুক চোখে তার দিকে তাকিয়ে আছে, তার কাছে গগনে শুধু ‘ধারা’ ব্যাখ্যা করেছে। ‘রাধা’ রয়েছে বাকি। ‘রাধা’র ব্যাখ্যা গগনে নিজেও কি জানে? যখন সে শিল্পী ও শিল্পের আত্মার পরস্পরকে জড়িয়ে ধরার কথা বলছে, জানে সত্য বলছে, তবে এ-ও জানে, তারও বেশি কিছু আছে। শিল্পী ভালোবেসে তার আত্মা ঢেলে দিল, শিল্পও জেগে উঠে তাকে জড়িয়ে ধরল। কোনো বস্তুর পক্ষে জ্যান্ত শিল্প হয়ে ওঠার পেছনে এটাই সবকিছু নয়। আত্মার সঙ্গে সঙ্গে চলে আত্মার তাড়না। সুন্দরের প্রতিষ্ঠা কেবল চেষ্টায় হয় না। আছে সুন্দরের নিজস্ব ইচ্ছা। সুন্দর যদি নিজে ইচ্ছা না করে, ধারা প্রতিষ্ঠিত হতে পারলেও রাধা প্রতিষ্ঠিত হতে পারে না। মেঘ থেকে বৃষ্টি ঝরে, জল যদি আবার মেঘে না ফেরে, চক্র পূর্ণ হয় না। ধারা ও রাধা দুটো অর্ধচক্র। গগনে কেবল মহানিয়মের ধারা রক্ষার সামন্ত। রাধার ক্ষমতা কাউকে দেওয়া হয়নি। ওটা নিয়ম নিজের কাছে রেখেছে।  এই ঘরের ভেতর যে আছে, সে যদি মহানিয়মের টুকরো হয়ে থাকে, তার ‘রাধা’, অর্থাৎ ফিরে যাওয়ার পথ যদি সে নিজেই নির্ধারণ করতে চায়, সেখানে গগনের কিছু করার থাকবে না। দেখাই যাক। টগর, বিদায়। 

গনগনে

কোথাও কোনো আক্ষেপ তৈরি হয়েছে। শক্তিশালী আক্ষেপ। না, আক্ষেপ তৈরি হয়নি, আগেই ছিল। ঘনায়িত হয়েছে। এই ঘনায়িত আক্ষেপ একটা শরীর পেতে চাইবে। সেই শরীর তার আক্ষেপ দূর করতে চাইবে। আর সেই দূর করার পথে তাদের দরকার হবে আমার সহয়তা। কিন্তু তাদের আক্ষেপ আমি দূর হতে দেব না। আমি তাদের তৃষ্ণার্ত, ক্ষুধার্ত, আক্ষেপে জর্জরিত রেখে দেব। যাতে তারা ধুঁকতে থাকে, যেমন ধুঁকছিল আগে। কিন্তু কারা তারা? এ তথ্য জানবে কেবল একজনই। গণক। 

আমার প্রিয় গণক হে, বহুদিন তোমার সঙ্গে নেই দেখা। তুমি নাকি বেশ মানবজীবন কাটাচ্ছ? এক রমণীর প্রেমে পড়েছিলে, আহা! তাকে ঘিরে কী আনন্দের রসদই না তুমি আমাকে দিয়েছ! তবে তোমার রমণীমোহন ক্ষমতার কিছু আদায় করে নেওয়া হলো না। এরপর ভুল হবে না। 

আমি এত বড়, এত শক্তিশালী এক দুরাত্মা, অথচ আমার কিনা কোনো রমণী নেই। এ কী করে হয়। আমি তো শুনেছি রমণীরা খানিক যারা দূরাত্মা, তাদের প্রতি আকৃষ্ট হয়, তবে আমার কেন এ রূপ, আমার কেন এ দশা?

আমি মন হারাচ্ছি, লক্ষ্য থেকে সরে যাচ্ছি। আমাকে মন আরও কেন্দ্রীভূত করতে হবে। 

হ্যাঁ, একটা শক্তিশালী আক্ষেপ। এই আক্ষেপ মেটাতে যে বা যারা বদ্ধপরিকর, তারা আমার সাথে হাত না মিলিয়ে পারবে না। হয়তো দ্বিতীয়বার মেলাবে, তবু ভাববে। মেলালেই আমার উদ্দেশ্য সফল। আমি তখন তাদের অনিঃশেষ আক্ষেপ থেকে আরও আরও শক্তি সংগ্রহ করতে থাকব। আমার উদ্দেশ্য বুঝতে পেরেও অনেকে আমার সঙ্গে হাত মিলিয়ে ভেবেছে, সেয়ানা, আমাকে হারিয়ে দেবে। কিন্তু এখন পর্যন্ত, আমি গনগনে, আমার প্রতিটি শিকারকে হাওয়ায় মিলিয়ে দিয়েছি।

কোথা থেকে আসছে ওই আক্ষেপের আবহ? পূর্বে। আরও পূর্বে চলো। 

পূর্বে চলো, পূর্বে চলো, পূর্বে চলো রে…

যেতে যেতে একটা জনশূন্য বাড়ি পড়ল গনগনের সামনে। সাদা দেয়াল সবুজ শেওলায় ঢাকা। বাড়ির সামনের উঠান গাছপালায় বোঝাই। এই বাড়িকে ঘিরেই আক্ষেপের সেই আবহ সবচেয়ে তীব্র বলে বোধ হলো। এখানে কে আশ্রয় নিয়েছে? কিন্তু বাড়িটিতে অপর কোনো শক্তি সেই আক্ষেপকে জমাট হতে দিচ্ছে না। শিথিল করে দিচ্ছে বারবার। চারপাশে ভিড় করে থাকছে। আশ্চর্য, চারপাশে কষ্টে বিভোর। কিন্তু কষ্টেরা জমাট হওয়ার মতো আঠালো অন্ধকার জমে উঠছে না। কার জন্য? তাকে দূর করে দেওয়া চাই। 

গনগনে বাড়ির ভেতর ঢুকে পড়ল। শুরুতেই রান্নাঘর। বছর চল্লিশের এক নারী টুন টুন শব্দে দুটো সাদা কাপে চা নাড়ছে। চা-পাতার বাজে গন্ধ আর একটা দুধেল দুর্গন্ধে জায়গাটায় থই থই। গনগনেকে দ্রুত পেরিয়ে যেতে হলো। সামনে বসার ঘর। বসার ঘরে টেলিভিশন চলছে, সোফায় বসে দাবা খেলছে একটা বারো-তেরো বছরের নবীন কিশোর, আর বছর চল্লিশের এক পুরুষ। তার মুখটা হাসি হাসি। গনগনে দাবার ছকের ওপর একবার তাকিয়ে বুঝে গেল, নবীন কিশোর জিততে চলেছে। আর তার নির্বোধ পিতা হেরে যাওয়ার আনন্দে ডগমগ। 

এই ঘরে আক্ষেপের সেই আবহ ছাড়া ছাড়া মেঘের মতো হয়ে ভাসমান। চক্রাকারে ঘুরছে। কিন্তু জমাট বাঁধতে পারছে না। পারছে ওই ছেলেটির কারণে। এই ছেলেটির ভেতর থেকে একটা কুৎসিত ফিরোজা রঙের আলো বের হয়ে সমস্ত আঠালো অন্ধকারের আঠাগুণ নষ্ট করে দিচ্ছে। মেঘগুলো জড়ো হতে পারছে না। এই ছেলেটিকে বের করা দরকার। এই ছেলেটি বের হলে পরে নির্ঝঞ্ঝাট। 

এ তো নিশ্চয়ই ইশকুলে যায়। কি, যায় না? তাহলে কাল বাছা স্কুলে যেতে বের হও? তারপর বাকিটা দেখছি। 

পরদিন—

‘টগর, তাড়াতাড়ি! তোমার মা আর কতক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকবে?’

‘বাবা, এসে আজও কালকের মতো…কেমন?’

‘ঠিকাছে ঠিকাছে, হবে।’

কালকের মতো কী হবে? সেটা বাপ-বেটা জানে। যাহোক, পাঁচ মিনিটের মাথায় ছেলেটা পিঠে ব্যাগ নিয়ে বেরিয়ে এল। পরনে স্কুলের সাদা শার্ট নীল হাফপ্যান্ট। পেছন পেছন বেরিয়ে এল বাবা লোকটা। সাদামাটা লোক। সাদা শার্ট, কালো বয়েল কাপড়ের প্যান্ট। ইস্তিরি করতে করতে চকচকে। হাসি হাসি মুখ লোকটার। চুলের একপাশে সিঁথি। বাসার দরজা থেকে বাড়ির ফটক পর্যন্ত ইটবিছানো রাস্তা। লোকটা মূল ফটক খুলে দিল। কড়াং-কটাং শব্দ উঠল দরজার কবজায়। এদের বাড়িতে কোনো দারোয়ান নেই। কাজের লোকও ঘরটা কেবল মুছে দিয়ে চলে যায়। এ ছাড়া যার যার বাকি কাজ এরা নিজেরাই করতে চেষ্টা করে। 

লোকটা দরজা খুলে দিয়ে এক পাশে দাঁড়াল। ছেলেটার মা আগে থেকেই একটা রিকশা ডেকে তাতে চেপে বসা। একটা বাসন্তী শাড়ি পরেছে মহিলা, চিকন লাল পাড়। কপালে টিপ। বেণি করা চুল। চোখ দুটো হরিণীর মতো। ছেলেটাও এই চোখ পেয়েছে বোঝা গেল। ছেলে রিকশায় উঠে বসল। বাবা লোকটা ওদের দিকে হাত নাড়তে থাকল। ছেলেটাকে নিয়ে চলে গেল তার মা। এবার ভদ্রলোক বাসায় গিয়ে নিজে বের হওয়ার জন্য প্রস্তুত হবে। গনগনে তার পিছু পিছু চলল। বাহ্, এদের কর্মধারা অনেকখানি ধরে ফেলা গেল। 

লোকটা টেবিলে ঢাকা নাশতা খেয়ে নিল। তারপর গোসল করে কাপড়-জামা পরে নিল। একটা কাঁধব্যাগে কাগজপত্র ভরাই ছিল, কেবল নীল ল্যাপটপটা নিয়ে ব্যাগে ভরে স্যান্ডেল পরে বের হয়ে গেল। এবার বাড়ি আমার— ভাবল গনগনে। 

বসার ঘরে চা-টেবিলের ওপর কালকের দাবার ছকটা রাখা। ‘এসে আজও কালকের মতো—’ বোধয় এই বস্তুটাকে নিয়ে বলা। যাহোক, মনে টুকে রাখা গেল। কোনো কিছু মনে প্রবেশ করিয়ে দিতে হলে এটাকে পথ করে তোলা যাবে। 

আক্ষেপের ওই আবহ ঘরটায় এখন আগের চেয়ে ঘন মনে হচ্ছে। স্বাভাবিক, ছেলেটা বাধা দিচ্ছিল। এখন সে বেরিয়ে গেছে। আগের চেয়ে ঘন হলেও এখনো পুরো জমাট বাঁধতে পারছে না। এখন ঠিক কোন ঘর থেকে আসছে, সেটিও স্পষ্ট ধরা যাচ্ছে না। এত কাছে এসে বিভ্রান্তিতে পড়ার তো কথা নয়। এর মানে এর একেবারেই উৎসে একটা কোনো প্রতিরক্ষাব্যবস্থা আছে। সেটা গনগনের মতো উচ্চ স্তরের শয়তান থেকেও সেই উৎস নিজেকে দূরে রাখার ও বাঁচিয়ে রাখার ক্ষমতা রাখে। 

গনগনে বলল, ‘কিন্তু কতক্ষণ, বাছা?’ 

কে সে? তাকে দেখতে ভীষণ লোভ হচ্ছে। বোঝা যাচ্ছে সে লোক যথেষ্ট আত্মগর্বী।

ছেলেটার ঘরে গেল গনগনে। ঘরে দুটো জানালা। পড়ার টেবিল একটা জানালার পাশে। জানালার ধারে একটা কাচের বোতলে চারটা গোলাপের ডাল। চারটি ডালে মোট পাঁচটি লাল গোলাপ ফুটে আছে। জানালার বাইরে একটা গাবগাছ থেকে লম্বা লম্বা স্বর্ণলতা নেমে এসেছে। ঘরের ভেতর দুটো বেতের বুকশেলফভরা কতরঙা বই! স্কুলের বই নয়। নানান বিষয়ে বই। বিশ্বযুদ্ধ, দেশভাগ, মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে বই। কিছু বই মনে হলো উপন্যাস। কিছু কবিতা। বোঝা কঠিন নয়। বাঁশের তাকের বাইরের কাঠামোয়, ছোট ছোট কাগজে ‘ধ্রুপদী উপন্যাস’, ‘গোয়েন্দা উপন্যাস’, ‘কবিতা’, ‘নিবন্ধ’, ‘আত্মজীবনী’—এই সমস্ত ছাইপাশ লিখে আঠায় সেঁটে, তার ওপর আবার স্বচ্ছ টেপ লাগিয়ে দেওয়া হয়েছে। টুকে রাখা গেল। কোনো কিছু মনে প্রবেশ করাতে এ ব্যাপার কাজে লাগানো যেতে পারে। 

হঠাৎ এক জায়গায় চোখে পড়ল ‘ধর্ম’। সেখানে নিজেকে নিয়ে বই দেখতে পেয়ে গনগনের চোখ কপালে উঠে গেল। বইয়ের নাম গনগনের প্ররোচনা থেকে বাঁচতে হলে। বেশ মোটা বই। গনগনে বের করে ওলটাতে থাকল। তার সম্বন্ধে অনেক ভালো ভালো কথা ওখানে রয়েছে। কিন্তু আশ্চর্য ব্যাপার, সমস্ত কিছুকে ব্যাখ্যা করা হয়েছে উল্টো দিক থেকে। অলক্ষ্যে প্রতারণা করতে প্রলুব্ধ করার মতো ভালো কাজকে বলা হয়েছে মন্দ! টুকে রাখল।

বইটা রেখে উঠে দাঁড়াতে গিয়ে একটা বস্তু চোখে পড়ল গনগনের। ছোট ছেলেটির খাটের শিথানের এক পাশে টুলের ওপর রাখা একটা ফুলদানি। কোমল সাদা গায়ের রং। ঠিক যেন চাঁদের মাটি। ফুলদানিটা শুধু সাদা থাকলেই যথেষ্ট ছিল। এর ওপর রানিগোলাপি রঙের অলংকরণ, হোক না সরু, দেওয়া ঠিক হয়নি। একটা গাম্ভীর্য কাটা পড়েছে। গাম্ভীর্য ধরে রেখেই সে এক সুশ্রী অনুপমা নারী হতে পারত। ফুলদানি তো নারীরই অবয়ব। 

হঠাৎ বোধ ফিরল গনগনের। এসব সে কী ভাবছে? তার তো সুন্দর কিছু কিংবা সৌন্দর্যবিষয়ক কিছু নিয়ে ভালোর পথে ভাবার কথা নয়। 

‘রক্ষা করো ঈশ্বর। আমি তো ভয়াবহ বিভ্রান্তিতে জড়িয়ে পড়ছিলাম। কে আমাকে এমন বিভ্রান্ত করল?’ গনগনের মনে হলো জানালার পাশ থেকে কেউ সরে গেছে। গনগনে হাসল, যেন সব বুঝে ফেলেছে। ‘আমার ভেতর মানবিক ভয় ছড়াচ্ছে কেউ। অবিকল মানুষের মতো মন হয়ে উঠছে আমার।’ তারপর অদেখা কাউকে উদ্দেশ করে গলা চড়িয়ে বলল, ‘আমি শক্ত প্রতিপক্ষ পছন্দ করি। শুনছ? আমি কিন্তু মুগ্ধ তোমার পারদর্শিতায়। তোমাকে আমি আমার অনুজ করে নেওয়া সুপারিশ করতে পারি মহানিয়মের কাছে। যদি তুমি চাও।’

হঠাৎ তাকে দিয়ে এমন ভাবিয়ে নিচ্ছে, কে সে। জগতের কালো শক্তির ধারা রক্ষাকারী অস্তিত্ব গনগনে। তাকেও বিভ্রান্ত করে দিতে পারছে যে, তার সঙ্গে যুদ্ধ জমবে কোনো সন্দেহ নেই। গনগনে ফুলদানি রেখে উঠে দাঁড়াল। দাঁড়াতেই হঠাৎ কী মনে পড়তে আবার ঘুরে তাকাল ফুলদানির দিকে। বাইরে বড় দরজায় শব্দ হলো। লোকটা কী মনে করে আবার ফিরে এসেছে। কিছু ফেলে গেছে বোধ হয়। পায়ের শব্দে মনে হলো এ ঘরের দিকেই আসছে। কী যন্ত্রণা! 

পরদিন—

গনগনে সেই ফুলদানির কাছে গিয়ে একবার দ্বিধা করে হাত রাখল। কিছুক্ষণের ব্যবধানে দুবার সে দিন অতিক্রম করাল। যতটা অস্থির হয়ে উঠেছে, গোটা পরিস্থিতি কি সেই অস্থিরতার যোগ্য? হতেও পারে। কারণ, এখানে যে শক্তি ডেরা পেতেছে, সে বড় রহস্যময়। না-ভালো না-মন্দ। যেন মহানিয়মের এক টুকরো। হ্যাঁ, আগেও এ কথা মনে এসেছে। মনে হচ্ছে, মন থেকে সরিয়ে দেওয়ার অবকাশ নেই। এই যে না-ভালো না-মন্দের মহানিয়মিক টুকরো সন্নিবেশ, এ সম্ভব শুধু কোনো শিল্পকর্মে। মানুষের হাতে এমন শিল্পকর্ম বহুকাল হয় না। আবার হতে শুরু করেছে? তা তো হওয়ার কথা নয়। কারণ, যুগ। এখন যুগ অমরত্ব সৃষ্টির নয়। এখন যুগ বিস্মৃতি সৃষ্টির। যুগধর্ম উপস্থিত হয়েছে যা, তাকে তো মানতেই হবে। মানুষের কিছু করার নেই। মানুষের ইচ্ছাতেও কিছু আসে-যায় না। বিস্মৃতি সৃষ্টির যুগে সবার আগে যা অপসৃত, তা হলো ইচ্ছার মূল্য। ইচ্ছা মূল্য ফিরিয়ে আনতে পারে কেবল শিল্পীরা। কিন্তু যুগধর্ম ছাপিয়ে উঠতে যে বিপুল সৎ শিল্পী প্রয়োজন, সেই সংখ্যা অকল্পনীয়। সেই সংখ্যা জড়ো করা সম্ভব নয়। 

এটাই কি আক্ষেপ? কার? মানুষের? এর পেছনে জড়িত কোনো মানুষ? না, সীমাবদ্ধ ইন্দ্রিয়নির্ভর মানুষের পক্ষে এমন আক্ষেপ তৈরি করা সম্ভব নয়। যে আক্ষেপে পৃথিবীতে স্বর্গ-নরক এক হয়ে যাবে। তবে একমাত্র তখনই সম্ভব, যখন জীব আত্মা আর জড় আত্মা…

গনগনে আবার ঝুঁকে সেই ফুলদানির সামনে বসল। পাথরের ফুলদানি সন্দেহ নেই এবং হাতে তৈরি ফুলদানি, এ-ও বোঝা যাচ্ছে। এই মর্মরটিকে চেনা লাগছে। লাগবেই তো। এটা মাকারানা মর্মর এবং যেহেতু সে আকার পেয়েছে, কোনো মানুষই তাকে তৈরি করেছে। কিন্তু এখান থেকে সম্মিলিত আত্মার শক্তি নির্গত হচ্ছে, এমন তো মনে হচ্ছে না হে। হলে এই গনগনের অনধিকার স্পর্শে সে বিদ্রোহ করত। অবিকল নারীর মতো! 

ফুলদানির নারী-অবয়ব আবারও গনগনের চিন্তাকে টুকরো করে দিচ্ছে। 

হঠাৎ গনগনের কাছে পাথরের এই বস্তুটি একটু উত্তপ্ত মনে হলো। বোধ হয় মনের ভুল। আজ ফুলদানির ওপরকার রানিগোলাপি রংটা আলগা মনে হচ্ছে। কী কাণ্ড, আলগাই তো। হাত রাখতেই উঠে আসছে। ওই ছেলেটির কাজ? বুঝি তার রংপেনসিল দিয়ে এতে দাগ কেটেছে? এখন হাত লেগে উঠে উঠে যাচ্ছে। ছেলেটির কাজ কিনা এখনো সন্দেহ থাকতে পারে। কিন্তু বস্তুটি যে ক্রমশ গরম হয়ে উঠছে, এ নিয়ে সন্দেহের অবকাশ নেই। উত্তাপ সত্যিই বাড়ছে এবং কী কাণ্ড, গনগনে হাত সরিয়ে নিল! 

এ-ও দেখতে হলো! এর মানে এই শক্তি তাকে এখানে চাইছে না।

হঠাৎ সেই আক্ষেপের আবহ তীব্র হতে শুরু করল এই ঘরে। গোটা ঘরের উত্তাপ বাড়ছে। গনগনে এর আগেও এমন উত্তাপ টের পেয়েছে। যখন গগনের কাছাকাছি হয়েছে। প্রায়ই এমন হয় যে গগনে ও গনগনে পরস্পরের দিকে শীতল চোখে তাকিয়ে পরস্পরকে পেরিয়ে গেছে। গনগনে প্রতিবার তখন এই উত্তাপ টের পেয়েছে। এ উত্তাপ বাহির থেকে লাগে না। শরীরের ভেতরে অনুভূত হয়। এরপর ভেতরেই সারা শরীরে ছড়িয়ে যায়। যন্ত্রণা অসহ্য হয়ে ওঠে। এখন যেমন।  গনগনে ছটফট করে পিছিয়ে যায়। মনে হচ্ছে জানালার কাছ থেকে আবারও কেউ বুঝি সরে গেল। কিন্তু কেউ নেই। গনগনে জানে। আবারও মানবিক ভীতির অনুভূতি তাকে পেয়ে বসেছে। কী করে সম্ভব? গনগনে উত্তাপটা হঠাৎ তলপেটে গাঢ় অনুভব করল। লক্ষণ ভালো নয়। উচ্চ সম্ভাবনা গগনের আশপাশেই আছে। কিন্তু গগনে কাছে কোথাও নেই। গনগনে জানে। তবে এ-ও সত্য, প্রায়ই দুজনের আগ্রহের কেন্দ্রবিন্দু মিলে যায়। এবারও মিলে যাবে কোনো সন্দেহ নেই। হয়তো ইতিমধ্যে গগনের আবির্ভাব ঘটেছে কাছে কোথাও। গনগনে আগুনচোখে তাকাল ফুলদানির দিকে। তেড়ে গিয়ে হাতে তুলে আছাড় দিল মেঝেতে। কিছুই হলো না ফুলদানির। কিছু একটা ভাঙতে হবে তার। সংহার, সংহার! গনগনে ছুটে গেল খাবার ঘরে। টেবিল থেকে একটা গ্লাস নিয়ে আছড়ে ভাঙল গনগনে।

ঘরের কোণে কোণে মেঘ, কালো মেঘ। দেখে চমকে না উঠে গনগনে পারল না। মহাজাগতিক লোকরহস্য কিছুটা সে জানে। এই কালো মেঘ গগনের জগতের নয়। এটা গনগনের জগতের। তার জগতের হলেও এই মেঘের পারিবারিক এলাকা গনগনেরও অগম্য। গনগনে আবার ফিরে এল ছেলেটির ঘরে। কোথায় নিরাপদ? বাড়তে বাড়তে মেঘ আরও ঘনিয়ে উঠল এবং বাড়তে থাকল ঘরের উত্তাপ। আক্ষেপের কেন্দ্র এই ফুলদানিটিই। বা কে জানে। বিভ্রান্তি! এই প্রথম গনগনে বিভ্রান্ত! বিভ্রান্তি তো মানবিক। এখানে গনগনে কেবলই শক্তি হারাচ্ছে। নাহ্, আর একমুহূর্ত নয়।

গনগনে ছিটকে জানালা দিয়ে বেরিয়ে গেল। 

সেই মুহূর্তে দরজা খুলে প্রবেশ করল গগনে।

 

নিয়ন

বৈশাখের খর সকাল। নিয়ন দরজায় কড়ানাড়া শুনে ভেজা মুখ-হাত মুছতে মুছতে ছিটকিনি খুলে দিয়ে দেখে এক বৃদ্ধ দাঁড়িয়ে। পরনের দীর্ঘ আলখাল্লা। আলখাল্লার সাদা জমিনে সিঁড়িঘরের জানালা থেকে আসা পশ্চিমের আলো। এমন গরমে এমন আলখাল্লা পরে ঠায় দাঁড়িয়ে এ লোক। নিশ্চয়ই তার শরীরে ঋতু নিয়ন্ত্রণ করতে জানে। 

এই বৃদ্ধকে নিয়ন কখনো আসা-যাওয়ার ফাঁকে দেখেনি। সাদা গোঁফ-দাড়ি, দীর্ঘ চুল, উজ্জ্বল আনন্দিত চোখ, শুভ্র পোশাক, দীর্ঘ ও প্রশস্ত শরীর। দেখে চট করে তাকে এই সময়ের কেউ মনে হয় না। দেখেই বলে দেওয়া যায়, এ ধারার লোক নিছক হাত দেখাতে আসেনি। উচ্চ সম্ভাবনা আছে, এ ভদ্রলোক নিজেও জ্যোতিষ। নিয়নের গণনার যে মান, হতে পারে ভদ্রলোক তাতে আকৃষ্ট বা বিরক্ত। 

নিয়ন বিনয়ী হেসে বলল, ‘আপনার কী উপকার করতে পারি, শ্রদ্ধেয়?’ 

বৃদ্ধ বলল, ‘আমার নাম গগনে।’ 

‘গগনে? গগনে গরজে মেঘ ঘন বরষা—ওই গগনে?’

‘ওই গগনে।’ 

‘চমৎকার নাম আপনার! একই সঙ্গে একটু বাড়তি অবাক করা নাম। নামে সাধারণত বিভক্তি থাকে না। আপনার আছে। চমকিত হওয়ার মতো ব্যাপার।’ 

‘বিভক্তি কী? এই ব্যাপারগুলো আমি ঠিক জানি না।’ 

নিয়ন থমকাল। এটাও একটা সংকেত। মানুষটা মিথ্যা বলছে না। তার শরীরী ভাষা তা-ই বলছে। অভিনয়ও করছে না। কিন্তু যেভাবে বাংলা বলছে, তাতে তাকে শুদ্ধ বাঙালি বলা ছাড়াও উপায় নেই। একটা পথ খোলা থাকে। ইতি একজন দূত। কার দূত? আশা করা যায় আলাপ শুরু হওয়ার পর তা প্রকাশ পেতে যাচ্ছে। নিয়ন বলল, ‘বেশ, এটা একটা বাংলা ব্যাকরণের ব্যাপার। আপনার নাম যিনি রেখেছেন, তিনি ভালো ব্যকরণবিদ ছিলেন সন্দেহ নেই।’ 

‘আপনার কথা ভুল হওয়ার আশঙ্কা সব সময়ই ক্ষীণ। কারণ, আপনি একজন অত্যন্ত উঁচু মানের গণক। আমার নাম যিনি রেখেছেন, তিনি ব্যক্তি নন। তিনি ‘ব্যক্ত’।’ লোকটা একটা বড় শ্বাস নিয়ে বলল, ‘আমার বিশ্বাস, আপনি বুঝতে পেরেছেন।’

নিয়নের মাথার চারপাশে তখন পাখি উড়ছে। গগনে বলল, ‘মহানিয়মের ধারা ব্যাপারটা দেখভাল করি। ভেতরে আসতে দেওয়ার জন্য ধন্যবাদ।’

‘দয়া করে বসুন। কী খাবেন আপনি। মানে, কী খান আপনারা। আসলে, আদৌ কি, বলতে চাইছি কী খেতে পারলে বা কী খেলে, অথবা কেমন বা তেমন কিছু, আমি…’

‘আপনি ব্যস্ত হবেন না। আমি কিছু খাব না। আপনি ধরতে পারছেন কি না জানি না, আমি আপনাকে সতর্ক করতে এসেছি। উপায় ছিল না। আপনি এটা সীমায় পৌঁছে গেছেন।’ 

বৃদ্ধ হঠাৎ ভুরু কুঁচকে ফেললেন। এবার কিছু তিক্ত কথা যেন বলতে চলেছেন। 

‘আপনি গণক, আপনি কী করছেন নিজেও জানেন। বিচার করে দেখেননি যে কাদের বিপদে ফেলতে চলেছেন? আগে নির্ধারণ করে দেখেননি যে কোথায় আপনার সীমা? কত দূর আপনার পরিধি? কিংবা কতটা বিস্তার তার হওয়া উচিত? ডানা বিস্তৃত করতে পারে বলেই ঈগল সংকীর্ণ কোনো গিরিখাতে ডানা বিস্তার করে না। আত্মরক্ষার পরিমিতি বলে একটা বিষয় আছে। আপনি তা লঙ্ঘন করছেন। আপনি নিজের ও অপরের ক্ষতির কারণ হচ্ছেন। সবচেয়ে বড় কথা, আপনি প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করছেন মহানিয়মের ধারাপ্রবাহে। এর চেয়ে নিকৃষ্ট অপরাধ আর হতে পারে না।’ 

‘ইয়ে, আমি—’

‘আপনি মহানিয়মের যে সময়, সে সময়ের যে ধারা, সেই ধারার যত বাঁক, সেই সমস্ত বাঁকে নিজের একেকটা অস্তিত্বকে বসিয়েছেন। তারা আপনাকে যে তথ্য দেয়, সে তথ্য কিন্তু আপনার প্রাপ্য নয়। এটা মানেন? আপনাকে এ জন্য উচ্চ বিনিময় দিতে হয়। প্রথম বিনিময়টা হলো আপনার পুণ্য। আপনার পুণ্যের বিনিময়ে আপনাকে তথ্য দেওয়া হয়, এটা তো জানেন।’

‘জি—’

‘কিন্তু আপনি আপনার পুণ্যের জোগান পেরিয়ে গেছেন সেদিনই, যেদিন এইখানে আপনি গনগনেকে বসতে দিয়েছেন। আজ আমি যেখানে বসে আছি। আপনি তার সঙ্গে সখ্য গড়েছেন।’ 

‘না!’

‘গড়েছেন!’

‘না। আমার কথা শুনুন? আমি সখ্য গড়িনি। আমার দরকার ছিল তার একটা সাহায্য কেবল। আপনি আমাকে বুঝতে পারবেন। জীবের আত্মা জড়ে পতিত হলে, শিল্পের পরিণতিকে একটা নরকঘেঁষা বাঁক পার হতে হয়। ওই বাঁক পেরোনোর কিছু সূক্ষ্ম মান আমার দরকার হয়ে পড়েছিল। মানুষ আমি। বের করতে পারছিলাম না।’

‘আর তখন কালো শক্তির আশ্রয় নিলেন। তাই তো? আপনি জানেন তার বিনিময়ে কী হয়েছে?’

‘জানতে পারতাম নিশ্চয়ই। কিন্তু এখন বুঝতে পারছি, তা জানার মতো, বোঝার মতো পুণ্য আমার ছিল না। প্লিজ, বলুন আমাকে, কী হয়েছে?’

‘কত অসতর্ক গণক আপনি। মানুষের ভবিষ্যৎ, অতীত গণনা করেন, আর নিজের বর্তমান নিয়ে এত হেলা? আপনি জানেনই না আপনার সবচেয়ে কাছের মানুষটির অস্তিত্বে আপনি ছুরি চালিয়ে দিয়েছেন। দিয়েছেন মূলত তখনই, যখন আপনি গনগনের সাহায্য নিয়েছেন। গনগনে সাহায্যের বিনিময়ে সম্পর্ক ছিনিয়ে নেয়, আপনি জানতেন না?’

‘সম্পর্ক…’

‘আপনি কি তত দূর ত্যাগ স্বীকারে রাজি ছিলেন, নিয়ন? সত্যিই আমার সন্দেহ উপস্থিত হচ্ছে। যারা কালোর শক্তিতে নির্ভরশীল হয়ে পড়তে থাকে, তারা শেষ পর্যন্ত, আমি আবার বলছি, “শেষ পর্যন্ত” ছাড় দিতে প্রস্তুত থাকে। কিন্তু আপনার তো আলো ছিল। যখন আমি স্তব্ধ হয়ে বসে পড়েছি, গনগনে তখন অট্টহাসি হাসছিল।’ 

নিয়নের চোখে শূন্যদৃষ্টি দেখে গগনে বলল, ‘আপনি জানেন না গনগনে কী গ্রহণ করে বাঁচে?’

‘আমি তো যত দূর জানি—’ 

‘আপনি কিছুই জানেন না। আপনার মস্তিষ্কের ভেতর আমি দেখতে পারছি না কোনো উত্তর। গনগনে আক্ষেপ গ্রহণ করে বাঁচে। মানুষের আক্ষেপের সবচেয়ে বড় ফিতেটি বাঁধা তার শ্রেষ্ঠ সম্পর্কগুলোর কাছে। গনগনে আপনার সম্পর্ক কেড়ে নিয়েছে। আপনি এখনো লক্ষণ টের পাননি?’

‘তিরানা! ঈশ্বর, তিরানাকে আমি—ওহ্ ঈশ্বর! কিন্তু গনগনে তো আমাকে…আমি তো ঘুণাক্ষরে কিছুই…’

‘গনগনে গনগনেই। সে গগনে নয়। সে তার কাজ করেছে। তার জন্য ভালোটুকু করেছে। অবশ্য ভালো-মন্দ, সুন্দর-কুৎসিত দৃষ্টিকোণপ্রধান অনুভবগুলো মানুষের কাছে সচরাচর স্পষ্ট করা কঠিন।’ 

নিয়নের তার কাছের সোফায় বসে পড়ে একটা কুশন আঁকড়ে ধরল। এখন সে বুঝতে পারছে, সেই সংকটকোণের তথ্য নেওয়ার পর নিয়ন পুণ্য লিখে দিতে উদ্যত হলে, গনগনে হেসে বলেছিল, ‘এর বিনিময় পুণ্য দিয়ে হবে না। আমার বিনিময় আমি ইতিমধ্যে গ্রহণ করেছি। আপনাকে এ নিয়ে ভাবতে হবে না।’ 

‘খবরদার, এমন কোনো কথা ছিল না যে আপনি আগাম নিজ থেকে ইচ্ছামতো কিছু নিয়ে নেবেন,’ বলেছিল নিয়ন। 

‘গনগনে নিজেই নেয়। সূর্যের উত্তাপ যেমন জল টেনে নেয়, তেমন করে। জলের কাছে সূর্যকে যেমন জিজ্ঞেস করতে হয় না।’

কদিনের ভেতর নিয়নের মনে হতে থাকে— তিরানাকে কি সে আদৌ চেয়েছিল কখনো? 

দুই বৈশাখ আগে, একুশে বইমেলায় স্বাধীনতা স্তম্ভের ছায়া দেখে দেখে হ্রদের পাশে সিমেন্টের বেঞ্চে বসে মুঠোয় জড়ো করা ঢিল ছুড়ছিল নিয়ন। সেই সময়ের দুর্ভাবনার কথাও মনে আছে। স্পারসোয় একটা ছোট বিষয় নিয়ে একটা তর্ক ক্রমে অনেক বড় হয়ে উঠেছিল। মানুষ মূলত ভালো না মন্দ—এই-এই ছিল বিষয়। হুট করে মনে হতে পারে, স্পারসোয় ওঠার মতো আলাপ এটা নয়। কিন্তু আলাপ যখন জগতের উপকরণের প্রসঙ্গ টেনে শুরু হয়, দ্বৈরথ বড় হয়ে ওঠে। এ জন্যই প্রাচীনকাল থেকে বৈজ্ঞানিক আর দার্শনিক আলাপ এত ঘনিষ্ঠ। অফিসে ওর একজন প্রতিপক্ষ আছে, রত্না। মেয়েটি মেধাবী। তবে ‘বাস্তব’ ও ‘অধি’র মধ্যে সম্পর্ক ধরতে পারাটা ঠিক মেধার ওপর নির্ভর করে না। এটা নিয়ন দেখেছে। যাকে কৃষ্ণ আধেয় বা ডার্ক ম্যাটার বলা যায়, তাতেই মহাবিশ্বের পঁচানব্বই শতাংশ নির্মিত। এর ওপর দাঁড়িয়ে, মানুষ অলক্ষ্যে কৃষ্ণ-আধেয় নিয়ন্ত্রিত, এ কথা বলা যায় না কিন্তু। নিয়ন তাই মনে করে। রত্না তা মনে করে না। মানুষ মূলত মন্দ এবং এর সঙ্গে মহাজগতের মূল উপকরণও সেই কথা বলে। এই বলছে রত্না। নিয়নের মন তো মানছে না। মানুষ মূলত ভালো। ‘কৃষ্ণ’ মানে তো ‘নেতি’ নয়। তবে অধিবিদ্যার জায়গাগুলো কী করে তার ক্ষেত্র তৈরি করে, দেখে অবাক হতে হয়। ‘কৃষ্ণ’ মানে ‘নেতি’ নয়, তবে ‘কৃষ্ণ’ ভাব ‘অপ’ ভাবের তুল্য। আবার ‘কৃষ্ণ’ অবতার শুভশক্তি এবং ‘অপ’ মানে জল। প্রাণের সূচনা যে জল থেকে। তবে কি ঘুরপথে রত্না, নিয়ন দুজনই সত্য? বা দুজনই মিথ্যা? বিভ্রান্তিগুলো নিয়নকে ভাবায়,  রত্নাকে বিরক্ত করে। তাই রত্না ঝটিতে উত্তর করে, নিয়ন তা পারে না। উপরন্তু কৃষ্ণ আধেয়কে ‘বলনিরপেক্ষ’ বলাতেও রত্না বিশ্রী অপমান করে বসল। বলল, ‘আপনি আসলে জ্যোতির্বিদ নন। আপনি আসলে জ্যোতিষী।’ জ্যোতিষশাস্ত্র নিয়নের গোপন ভালোবাসা।’ অজান্তে রত্না সেই তাকে হেয় করে দিল। কত সহজে। স্তব্ধ হয়ে গিয়েছিল নিয়ন। আর কীভাবে ঘটনা ঘটনার দিকে ঠেলে দেয়? মুঠোয় জড়ো করা ঢিল ছুড়ছিল জলে। সূর্যের দিকে পেছন ফিরে। আশপাশে কিছু কিছু মানুষ ছিল। কেউ কেউ তাকাচ্ছিল তার দিকে। কিন্তু কিছু বলছিল না। হঠাৎ একটা কোমল হাতের বাধা। মেয়েটি বলল, এখানে অনেক মাছ থাকে, তাকিয়ে দেখুন? ওদের প্রাণ আছে। আঘাতের অনুভূতি ওদের আমার-আপনার মতোই।’ মেয়েটি হাত সরিয়ে নিয়ে ঘুরে দাঁড়াল। তার কাজ শেষ হয়েছে। নিয়নের হয়েছে শুরু। মানুষের ভিড়ে আড়াল হয়ে যাওয়ার আগমুহূর্তে বাতাসে মেয়েটির মসৃণ লালচে চুল সরে গিয়ে, অনাবৃত করে দিল অর্ধেকটা চাঁদের মতো মেয়েটির পিঠ। যেন কাঠগোলাপের পাপড়ি। 

‘হ্যাঁ, একটা দুর্লভ্যের আকর্ষণে নিয়ন উঠে গিয়েছিল তারপর। তিরানার পিছু পিছু হেঁটেছে। তারপর একসময় কাছে গিয়ে ডেকে উঠে বলেছে, আমাকে ক্ষমা করবেন আপনি, দয়া করে। কিন্তু আমি নিজে নিজেকে ক্ষমা করতে পারছি না। আমাকে একটু সাহায্য করবেন? আমি এমন করার মানুষ নই, যেমনটা করতে আপনি আজ আমায় দেখেছেন।’ 

তিরানা বলেছিল, ‘আপনি যে এমন মানুষ নন, আপনার চোখ বলে কিন্তু সেই কথা।’—এই বলে পরের স্টলে চলে গিয়েছিল। সেখানে তাকে অনুসরণের কোনো ইশারা ছিল কি না, নিয়ন গণনা করে দেখেনি। ওখানটা গণনায় দেখে না নিয়ে তার আশা-দুরাশার মাঝে দুলতে ভালো লাগছিল। তিরানা যেভাবে ওই একটি কথায় তাকে সাহায্য করেছিল— আপনার চোখ কিন্তু বলে সেই কথা— পৃথিবীতে এমন সুচারু সহায়তা আর কেউ কি কখনো করেছে কাউকে একটিমাত্র কথায়?— ব্যাপারগুলো এমন দুর্দান্তই তো মনে হয়েছিল নিয়নের সারা রাত।  তিরানাকে সে খুব, খুব করে চাইল। ফোন নম্বর বিনিময় নয়। সেভাবে নিয়ন চায়নি। সব সময় নিজেকে পরীক্ষায় ফেলে জেতার অভ্যাস তার। বইমেলায় সেই একই জায়গায়, স্বাধীনতাস্তম্ভের জলাধারের পাশে, সেই বেঞ্চে একইভাবে বসে থাকত নিয়ন, একই সময়ে। তবে এবার বিপরীত দিকে ফিরে। সেদিন পেছন থেকে এসেছিল তিরানা। এবার নিয়ন মুখোমুখি হতে চায়। বাস্তব গল্পের চেয়েও নাটকীয়। বইমেলার শেষ দিন, যার পর হয়তো এই বিশাল শহরে তাদের আবার দেখা হওয়ার আর একটি উপলক্ষও থাকত না, সেদিন বিকেলে, নিয়ন দেখতে পেল, দূরে কেউ দাঁড়িয়ে, তারই দিকে তাকিয়ে। তিরানা। ল্যাভেন্ডার শাড়ি তার পরনে। পেছনে অশোক বনের অন্ধকার। হৃৎপিণ্ডে দেয়ালে রক্তের ঢেউ ভাঙছে। এই আলোড়ন চিরকাল মনে থাকবে। চিরদিন নিয়ন ব্যক্ত করে যাবে এবং আরও একটি ব্যাপার ঘটল, যা আগে কক্ষনো ঘটেনি এবং তা আগেরটির মতো ব্যক্ত করার নয়। এর কথা নিয়ন ভবিষ্যৎ কোনো একান্ত মুহূর্তে এক তিরানাকে ছাড়া আর কারও কাছে কোনো দিন বলতে পারবে না। পুরুষের জন্য যে অঙ্গে স্বর্গীয় স্বেদবিন্দু জমা, সেই অঙ্গে রক্তসঞ্চালন বেড়ে কী এক বিব্রতকর দৃঢ়তা উপস্থিত হলো। এ অঙ্গ যেন আলাদা সত্তায় চলে। কী চায় সেই সত্তা? যা চায়, তা যেন নিয়ন জানার আগে সে জেনেছে। সত্যিকার প্রেম বুঝি এমন ডুয়েট? অশেষ অপেক্ষার পর, শেষ দৃশ্যে আসে? 

তাদের আবেগে কণ্ঠ রূদ্ধ হয়ে আসা প্রেম প্রেম দিন, মহানিয়মের ধারা মেনেই এসেছিল। কে যেন বলে উঠেছিল, ‘ত্রিনয়ন ত্রিনয়ন!’

এমন সানন্দ দিনগুলো তাদের বিভব হারাল হঠাৎ সেই দিনের পর, গনগনে যেদিন নিজ থেকে তার ‘বিনিময়’ বুঝে নিল এবং নিয়নের মনে দ্বিধা উপস্থিত হলো, সেই দুটি বিকেলের অনুভব কতটা সত্য। ‘তিরানাকে কি সে আদৌ চেয়েছিল কখনো?’ 

উত্তরও উপস্থিত। সাময়িক, দুই বিকেলের মায়ার ওপর দাঁড়িয়ে এ প্রশ্নের সঠিক উত্তর পেতে চাওয়া তার অন্যায় হয়েছে। মায়া সত্য অনুভূতিকে এমন মিমিক করতে পারে যে বিপদ ঘটে যায়। এখন যেন বুঝতে পারছে তিরানাকে ও চায়নি। কাকে যেন চেয়েছে। সে তিরানা নয়। তবু সে সময় শূন্যতা পূরণে সে তিরানাকে জপেছে। তিরানা এসেছে। সে-ও তাকে নিয়েছে নেহাত এসেছে বলেই। মন থেকে চেয়েছি কি আদৌ? বিবর্তনে পুষ্ট এই পুরাতন মানবশরীরও কিন্তু প্রতারণা করে। ‘না-হোক না-হোক’ ভাব সত্ত্বেও একটা বেমানান ক্ষুধামান্দ নিয়ে বিবর্তনই কোনো কোনো মানুষকে এক করে দেয়। কী দুর্ভাগা তারা! এরপর ‘ভালোবাসার মতো’ একটা ভাব জাগতেও পারে। ওটা ব্যক্তিকে নয়। বরং ভালোবাসাকে ভালোবেসে। নিমসাড়া। এ সম্পর্কও বোধ হয় তেমনই। উপরন্তু আজকাল যেন তিরানা ঠিক তার ধরনেরও নয়। কখনো কি ছিল? সেই তো বোকাটে, পরোক্ষ, অজ্ঞ, নীরব, শীতল। তত সুন্দরীও কি? যে আগুন নিয়নের প্রাপ্য…একটু সাহসী হতেই হবে। বুঝতে পারার পরও নিজের সঙ্গে তার মিথ্যা বলে যাওয়া অনুচিত হবে। নয় ক্রমে এই সম্পর্কের ভার দুর্বহ হয়ে উঠবে। তার আগেই শোভন ইতি টানা ভালো না? হতে পারে তিরানার মন ভেঙে যাবে। তা নিয়নেরও খারাপ লাগবে না, তা নয়। ভালোবাসা না হোক, অভ্যাসের করুণার মতো কিছু তো অন্তত সে অনুভব করে। তারও তো মূল্য আছে। তবে শুধু এর ওপর আজীবন নিয়ন নিজেকে ঠকিয়ে যেতে পারবে না। ভাগ্যিস, ঈশ্বর তার মনে হঠাৎ এই নিশ্চিত ভাব উপহার দিয়েছিল।

‘ঈশ্বর, কী করে আমি এত নীচ হয়েছিলাম?’ 

গগনে বলল, ‘যাক, অনেক অতীত ঘুরে এলেন। এবার হয়তো আপনার মতি ফিরবে। আর খুব বেশি দেরি হয়ে যাওয়ার আগেই হয়তো আপনি কিছু বিষয় বদলে নিলে, কিছু ত্যাগ স্বীকার করলে, অনেকটা ফেরত পাবেন, যা হারিয়েছেন।’

‘আপনি আমাকে সাহায্য করুন। আমি কী বদলে নেব, আমাকে বলে দিন। আমি কী ত্যাগ করব, আমাকে বলে দিন!’ 

‘সেটা আপনাকেই বের করতে হবে। এটুকু বলতে পারি, আপনি এখন ফেরত পেতে মরিয়া। সুতরাং এই কথাটা মনে রাখা কর্তব্য। মরিয়া হয়ে যদি আদর্শ বিসর্জন দেন, ভালো কখনো ধরা দেবে না। ভালো কখনো মন্দ পথে আসে না। আশা করি আপনি পরবর্তী প্রলোভন এড়াতে পারবেন। সেটা সময় এলে তখন দেখা যাবে। তবে মূল, কী ত্যাগ করবেন, কী গ্রহণ, সেটা আপনাকেই বের করতে হবে।’

‘বেশ আমি বলছি, বলল নিয়ন। এই মুহূর্ত থেকে আমি গণনা ছাড়লাম। আমি গণনার যত আয়, সমস্ত ছাড়লাম। সেই সমস্ত আয় আমি আপনার হাতে তুলে দিতে চাই। আপনি আমাকে পাপমুক্ত করুন।’ 

‘আমি অবাক হব না যদি আপনি আমি চলে যাওয়ার পরই আপনার সিদ্ধান্ত বদলে ফেলেন,’ বলল গগনে। ‘আমি কিছুদিন পর আসব। তখনো যদি আপনি এই সিদ্ধান্তে অটল থাকেন, আমি আপনার দিব্যি গ্রহণ করব।’ 

‘কত দিন পর আসবেন?’

‘তা যদি বলে দিই, পরবর্তীতে আপনার প্রতিজ্ঞার স্থিতিস্থাপকতা রাবারের মতো বাড়িয়ে নিতে আপনার সুবিধা হয়ে যাবে। সাবধান।’

‘বেশ, তাহলে কবে আসবেন, তা আমার অজানা থাকুক।’ 

গগনে এসেছিল একান্ন দিন পর এবং তখনো নিয়নের প্রতিজ্ঞা অটল ছিল। গগন নিয়নের চাওয়া অনুসারে গণনা থেকে আসা তার সমস্ত আয় গ্রহণ করে, সৎপথে ব্যয়ের মাধ্যমে পৃথিবীতে আবার ফিরিয়ে দেওয়ার ভার নিল। নিয়নও গণনা ছাড়ল। খাবার কমিয়ে দিল। আমিষ ছেড়ে দিল। কেবল পড়াশোনা করে সময় কাটায়। আর তিরানাকে ফিরে পেয়েছে আবার, এমন স্বপ্ন দেখে। নিজের ওপর মিতাচারের আতিশয্যে, স্বপ্নের তীব্র তাড়নে বিতাড়নে নিয়ন বিছানা নিল। স্পারসো থেকে রত্না, সিফাত, ওকাবেসহ অনেকে দেখতে এল। দারোয়ান সেকান্দার ও সেকান্দারের স্ত্রী জরিনা এসে অতিথির আপ্যায়ান করাল। বাকি সময় তারাও আর নিয়নকে ছেড়ে যায়নি। এর মাঝে তিরানার সঙ্গে যোগাযোগের সাহস নিয়নের হলো না। যোগাযোগ হলো মিরানার সঙ্গে। মিরানাও তার কত আদরেরই না ছিল! সবার দরদে নিয়ন সুস্থ হয়ে উঠল। এল নতুন বছর এবং আবারও এক বাঁক উপস্থিত হলো নিয়নের জীবনের। এবার ভুল করা চলবে না।   

১৫ জ্যৈষ্ঠ, এক ভাপানো সকালে তার দরজায় কড়া নাড়ল গনগনে। 

দরজায় কোনো ছিদ্র না থাকার বিপদটা নিয়ন প্রতিনিয়ত অনুভব করে, প্রতিবার ঠিক করে শিগগির একটা আই-হোল করিয়ে নেবে, কিন্তু শেষমেশ ভুলে যায় বা কোনোভাবে বাতিল হয়ে যায় পরিকল্পনা। দরজা খুলে প্রমাদ গুনল। দরজা আবার লাগিয়ে দিল গনগনের মুখের ওপর। লাগিয়ে কপাটের এপাশ থেকে সরে গেল না। নব তখনো ধরে রেখেছে। না খুলে দিয়ে উপায় কী। সুতরাং আবার খুলে বলল, ‘কী ব্যাপার? কী চাই।’ 

গনগনের চোখেমুখে অনুনয় ফুটে উঠল। পরমুহূর্তে সেটা ঢাকা দেওয়া চেষ্টা করল গনগনে। বলল, ‘এবার আমি বিনিময়ের মাধ্যমে তোমার একটা উপকার করতে পারি। হ্যাঁ, তোমরা মানুষেরা সেটাকে বড় উপকার বলেই মনে করবে।’ 

বিনিময়ের মাধ্যমে উপকার? লোকটার নিজ কানেও একটু বেখাপ্পা লাগল না কথাটা? নিয়ন বিষাক্ত দৃষ্টি ছুড়ে বলল, ‘কী উপকার?’ 

‘তোমাকে আমি জীবের আত্মার সংকটকোণের তথ্য দিয়েছিলাম। সেবার তুমি ঠেকে গিয়েছিলে। এবার আমি ঠেকে গিয়েছি। বিপরীত জায়গায়। বিস্তারিত তোমাকে বলার প্রয়োজন নেই। তুমি হয়তো জানো। না জানলেও ক্ষতি নেই। জড়ের আত্মার বাঁক বিন্দুটা আমাকে বের করে দাও। খুব বিব্রত হয়েছি সেদিন। বিনিময়ে আমি তোমার সম্পর্ক ফেরত দেব।’ 

রাগে নিয়নের মাথা ঘুরে উঠল। বলল, ‘আমি তোমাকে কোনো সাহায্য করব না। তুমি বিদায় হও। আমাকে লোভ দেখাচ্ছ? তোমার সাহস তো কম না! নিয়তি যদি এই হয়, দুজন আজীবন একা থাকব। তুমি যাও। যাও!’

গনগনে অবাক হয়ে তাকাল। ‘আমি কি ঠিক লোকের সঙ্গে কথা বলছি?’

‘ঠিক লোকের সঙ্গেই কথা বলছ। আর আমিও ঠিক ঠিক লোক চিনেছি এবার।’

‘বুঝেছি। এখানে গগনে এসেছিল? মহানিয়মের সেই জারজটা?’ 

‘খবরদার!’ 

‘সবখানে আমার নাক সাঁটাচ্ছে গগনে। ওকে উচিত সীমাশিক্ষা দিতে হবে। সেদিনের ছেলে গগনে। আমার পথে কাঁটা দিতে এলে ওকে আমি উপড়ে ফেলব। ওর চেয়ে অনেক অনেক গুণ বেশি শক্তি আমি রাখি।’ 

‘সেটা তোমাদের ব্যাপার। আমাকে এবার আমার মতো থাকতে দাও।’

গনগনে দ্রুত চিন্তা করছে। নিয়নের ভালোমানুষির ছিদ্রপথই এখন তার মনে প্রবেশের একমাত্র খোলাপথ। আর কোনো পথ সত্যিই খোলা নেই। 

বলল, ‘নিয়ন। তুমি একজন ভালো মানুষ। আমি গনগনে হয়ে তোমাকে এই সনদ দিচ্ছি। নিয়ন। জড়র ওপর জীবাত্মা আরোপণের ‘প্রাকমুহূর্ত নরক-বাঁক সংকটকোণ’ এমন নচ্ছাড় বিষয় কবে থেকে হয়ে উঠল? এটার সূত্র তোমার কাছে বাঁধা বলে আসা। তুমি কখনো সাহায্য প্রার্থীকে বিমুখ কোরো না। তুমি জানো হয়তো কী হয়েছে।’

‘জানি না, জানতেও চাই না।’

‘এরা আর কারও মতো নয়। এরা আগের মতোও নয়। অনেক শক্তিশালী। সেদিন নিরুপায় তুমি আমার সাহায্য নিয়েছিল। আজ যে তার সরল প্রতিদান চাইব, সেই উপায় নেই। কারণ, আমি তোমার সম্পর্ক কেড়ে নিয়েছি। বিনিময় হিসেবেই এবং বলতে দ্বিধা নেই, তোমার অজান্তে। কিন্তু আজ আমি সেই সম্পর্ক ফেরত দিতে এসেছি, শুধু তা-ই নয়। বলতে এসেছি, ভাইয়ের মতোই, যে গগনেই একমাত্র দূত নয় যে ভালো। কালো ফেরেশতা গনগনেও একই রকম দরদ নিয়ে পাশে দাঁড়াতে পারে। ভালোর শক্তি সর্বজয়ী। কালোও ভালো দেখাতে পারে। তুমি না কবে তর্ক করছিলে তোমার দপ্তরে?’

‘ঈশ্বর, তুমি কবে থেকে আমার পেছনে লেগেছ!’ 

‘শোনো, নিয়ন। আমি যখন তোমার সম্পর্ক কেড়ে নিচ্ছি, তখন প্রতি রাতে তোমার অসহায় ছটফট আর হৃদয়ের বিশুদ্ধতা আমাকে কালো থেকে ধূসর করে তুলত। শেষ রাতের দিকে আমি উজ্জ্বল হয়ে উঠতে শুরু করতাম। যেন সকালের সঙ্গে সঙ্গে আমার ভেতরেও সূর্য উঠছে। কিন্তু আমি বহু কষ্টে তাকে ঠেকিয়েছি। ঠেকিয়েছি, কারণ, আমি তোমার মতো শক্তিশালী নই, আমি ‘ভালো’ বহন করতে পারব না। কিন্তু বোনের একটু উপকারে আসতে পারি যদি, এই ভেবে তোমার কাছে এসেছি। কারণ, এর সঙ্গে তার ভবিষ্যৎ জড়িত এবং তার বর্তমান বহু আগেই ভয়ানক হুমকির মুখে।’ 

‘বোন? তুমি কার কথা বলছ?’

‘তিরানার কথা বলছি।’ 

‘খবরদার, তাকে তোমার বোন বলবে না!’ 

‘আচ্ছা, বলব না।’

‘তার বর্তমান কীভাবে হুমকির মুখে?’ 

‘তোমার মাধ্যমে। অবশই তোমার মাধ্যমে এবং আরও একবার।’

‘কী বোঝাতে চাও?’

‘সেকি, মনে নেই তৈজস মেলার কথা? হা হা হা হা!’ 

 

তৈজস মেলা

 

তৈজস মেলা বলে কখনো কিছু বসেছিল কি না ঢাকায়, নিয়ন জানে না। গত পৌষে খুবই কাকতালীয়ভাবে চন্দ্রিমা উদ্যানের পেছনে, যেখানে ফি বছর বাণিজ্য মেলা বসে, সেখানে তার দেখা পেয়ে গিয়েছিল, একেবারে শেষ দিন। বাণিজ্য মেলার কুড়ি ভাগের এক ভাগ জায়গা নিয়ে বসেছিল। আশপাশের মানুষের উদ্যোগে। নিয়ন আর তিরানা সেদিন প্রথম একসঙ্গে হাঁটতে বেরোয়। 

হাঁটতে শুরু করেছিল বাংলামোটর থেকে। ওখানে ব্যক্তিগত উদ্যোগে করা যে উদ্যানটা আছে, সেখানে কিছুক্ষণ কাটাতে কাটাতে দশ টাকার ঝালমুড়ি শেষ করেছে যখন, তখন দুপুর। পরে ফার্মগেটের দিকে এগিয়ে পশ্চিমে ইন্দিরা রোড হয়ে, রাস্তার পাশের এক দোকান থেকে দুটো লাঞ্চ প্যাকেট কিনে মানিক মিয়া অ্যাভিনিউর প্রশস্ত রাস্তার বিস্তৃত ফুটপাতে বসে সামনে পামগাছের সারি আর পেছনে সংসদ ভবন রেখে সুগন্ধ ছড়িয়ে ভাত, টুকরো মাংস ছিটিয়ে খেতে থাকে। তাদের চারপাশে ভিড় করে ভিখারি, কুকুর, কাক, বিড়াল, চড়ুই আর শালিক। একটা কাঠবিড়ালিও পথ ভুলে চলে এসেছিল। খাওয়া শেষ জলে তিরানা ব্যাগ থেকে পানি বের করে। দুজনের তৃষ্ণা মিটিয়ে ওটা খালি হয়ে পড়লে প্যাকেট দুটো হলুদ রঙের রাবিশ বিনে ফেলে দুজন হাঁটতে থাকে বিজায় সরণির দিকে। চন্দ্রিমা উদ্যান পেরিয়ে যখন বঙ্গবন্ধু সম্মেলন কেন্দ্রের রাস্তায় ঢোকে, তখন সন্ধ্যা। এই সময়ের ভেতর দুজনই দুজনের বাবা-মা, ভাইবোন আর বিশেষ বিশেষ বন্ধু বিষয়ে কাজ চালানোর মতো তথ্য জেনে মনে মনে তাদের সঙ্গে আত্মীয়তা করে ফেলেছে। 

সন্ধ্যার অন্ধকার আলো করে একটা-দুটো হলুদ আলো চোখে পড়ায় আরও পশ্চিমে এগিয়ে এসে নিয়ন আবিষ্কার করে তৈজস মেলার এই বিস্ময়। কোনো মাইকিং নেই, তবু শোরগোলে ঠিক কান চলে যায়। রঙিন রঙিন পোশাকে চোখ চলে যায়। বাঁশ আর বেড়া দিয়ে একটা ঘরোয়া গেট করা হয়েছে। কোনো প্রবেশমূল্য নেই। ভেতরটা বিস্ময়কর। 

মানুষের ঘরে প্রজন্মান্তরে যে কত রকম জিনিস স্থান পেয়েছে, ওখানে না এলে কল্পনাও মুশকিল হতো। পুরোনো মেহগনি কাঠের ঘোড়া থেকে শুরু করে চিনামাটির বিশাল ফুলদানি, মোগল সোনালি ঝাড়বাতি থেকে শুরু করে কালচে তামাটে ইংরেজ মুদ্রা। মেলার নাম তৈজস মেলা হলেও যার যার বাড়িতে যা কিছু বাড়তি আছে, যা সে বিক্রি করে দিয়ে দুটো নগদ মেলাতে পারলে ভালো হয় বলে মনে করেছে, তা-ই নিয়ে এসেছে। আছে বুড়ো আঙুলের সমান কোরআন শরিফ থেকে দেড় শ বছরে পুরোনো মনুসংহিতা। আছে বিয়েতে উপহার পাওয়া বাড়তি ডিনার সেট, ব্লেন্ডার, টেবিল পাখা। হাতপাখা। আছে পোড়ামাটির হাঁড়ি, ফুলদানি, পাথরের হামানদিস্তা, কাঠের খড়ম, সুপারি কাটার ময়ূরনকশি যন্ত্র। নিয়ন আর তিরানা লাজুক মুখ করে ঘুরে ঘুরে সব দেখতে থাকল। মনে মনে একটা নিষ্পাপ সংসারখেলা চলছে দুজনেরই।

একটা জায়গায় বেশ ভিড় দেখে দুজনেই এগিয়ে গেল। পৌঁছে দেখে, মাথার গোল গোল ছোট ছোট কাটের টুকরো বসানো কাপড়ের টুপি পরিহিতা এক তরুণী গোলাকার বিরাট এক খাঁচা ঘোরাচ্ছে। বলছে, একটু সরে যান, আপনারা একটু সরে যান, প্লিজ, আমাকে একটু নিশ্বাসটা নিতে দিন!

হায় রে মানুষ— বলল কেউ। তার কথার জবাবে বলল, হায় রে মানুষ মানে? আমি নিজেই এসেছি এখানে ভাগ্যটা বাজিয়ে দেখতে। এই তো মানুষ!

বোঝা গেল এই জায়গাটা মেলার প্রধান আকর্ষণ। 

উত্তর-পশ্চিম কোণে একটা ছোট টেবিল। তার ওপাশে বসে থেকে বছর ষোলো-সতেরোর একটা সদ্য গোঁফ ওঠা ছেলে সারি ধরে দাঁড়িয়ে থাকার লোকের মাঝে একটা টিকিট বিলি করছে। তার পেছনের দৃশ্যে মেলার মাঝখানে দাঁড় করানো বিরাট নাগরদোলাটা ওঠানামা করছে। দূর থেকে কানে আসছে ক্যাঁচকোচ শব্দ আর বাচ্চাদের চিৎকার। 

টিকিটের মূল্য পাঁচ শ টাকা। শুনে নতুন আসা অনেকের কোয়েলের ডিমের মতো চোখ হাঁসের ডিম হয়ে উঠছে। নিয়ন ভাবল একটু মজা করে দেখাই যাক না। 

‘তিরানা, তুমি কী বলো?’ 

‘দেখা যেতে পারে’— বলে তিরানা ব্যাগে হাত দিল। নিয়ন তার হাতের ওপর হাত ঠেকিয়ে হাসল। –’উঁহু। আমি দেব। ধরা যাক এটা আমাদের সংসারের তৈজস। একটা লটারি খেলা হয়ে যাক, দেখি কপালে প্রকৃতি কী রেখেছে।’ 

‘পাঁচ শ টাকা কেন?’ নিয়ন কুপন কিনতে গিয়ে প্রশ্ন করল। ‘ভেতরে সব কাগজেই কি কিছু-না-কিছু আছে?’ 

ছেলেটা বলল, ‘মাথা খারাপ? তাহলে পাঁচ শ নিয়ে কুলাতে পারব? এখানে সব্বাই যারা পসরা নিয়ে বসেছে, তাদের একটা করে সবচেয়ে দামি জিনিসের নাম লেখা। সেসবের অনেক জিনিসের কোনো দাম হয় না। সোজা জাদুঘরে চলে যাওয়ার মতো জিনিস।’

‘লোকে পাচ্ছে তো?’

‘বলে কী! ওই দেখুন।–-বলে সে পেছনে আঙুল তুলে দেখাল। দেখা গেল মাথায় গামছা বাঁধা এক মাঝবয়সী লোক রীতিমতো নাচ জুড়ে দিয়েছে। একটা রুপার থালা জিতেছে লোকটা। ছেলেটা বলল, কম হলেও দুহাজার টাকার জিনিস। পেয়েছে পাঁচ শতে।’ 

‘আর বেশির ভাগই তো শুকনো মুখে ফিরে যাচ্ছে, খালি হাতে।’ 

‘সেটাই কি হওয়ার কথা না?’ বলতে বলতে একটা কুপন বাড়িয়ে দিল ছেলেটা নিয়নের দিকে। নিয়ন সরে যেতেই ‘উফ’ বলে কপালের ঘাম মুছল। 

কুপনটা নিয়ন তুলে দিল তিরানার হাতে। 

‘চলো, তোমার লক্ষ্মীমন্ত হাত দিয়ে একটা কাগজ তোলা যাক।’ 

‘যদি ফাঁকা ওঠে?’

‘উঠবে না।’ 

দুজন লাইনে দাঁড়াল। সামনেই এক বৃদ্ধা মহিলা গোটা লাইনটাকে, তৈজস মেলাকে, লটারির ব্যাপারটাকে সমানে অভিশাপ দিয়ে যাচ্ছে। অভিশাপ দিচ্ছে জগতের যাবতীয় প্রতারণা, তার নিজের ভাগ্য, জুয়া, বার্ধক্য আর কাচের টুপি পরা তরুণী মেয়েটিকে। মনের ভুলে অভিশাপ দিয়ে বসল যারা এই সারিতে তার সঙ্গে দাঁড়িয়ে মনে মনে সৌভাগ্য প্রত্যাশা করছে, তাদের প্রত্যেককে। তাতে যখনই তার অভিশাপের যুক্তি নিজেকেও কেটে দিল, বৃদ্ধা থামল। 

দেখতে দেখতে চলে এল তিরানার সময়। কাচের মেয়েটা চরকি ঘোরাল। ভেতরে ওলটপালট ডিগবাজির ভেতর দিয়ে গেল সমস্ত ভাঁজ করা সাদা কাগজ। একটা হাত ঢোকানোর মতো ফোকর ছিল। তিরানা হাত ঢুকিয়ে কাগজের স্তূপের ভেতর থেকে একটা তুলে আনল। বের করে এনে নিয়নের হাতে দিয়ে বলল, আমার নার্ভাস লাগছে। তুমি খোলো। 

নিয়ন কাগজটা খুলে ধরে কী লেখা ভালো পড়তে পারল না। হাতের লেখা এমন বিচ্ছিরি যে সুবিধামতো যেকোনো একটা কিছু আউড়ে নেওয়া যায়। 

‘মাকরানা মর্মরের ফুলদানি, বিজন-বিজলি পরিবার—তাই লেখা কি?’ বলল নিয়ন। 

টুপি পরা মেয়েটি উল্লসিত কণ্ঠে বলে উঠল, ‘কী সাংঘাতিক, কী সাংঘাতিক!’ 

তারপর গলা চড়িয়ে বলল, ‘এক আশ্চর্য সৌভাগ্যবান দম্পতিকে আমরা পেয়েছি, পেয়ে গেছি!’ গলা নামিয়ে বলল, ‘কী আপনাদের নাম?’ 

নিয়ন বলল, ‘তিরানা, নিয়ন।’ 

‘তিরানা এবং নিয়ন দম্পতি! তাদের এই সাংঘাতিক সৌভাগ্যে কি একটু তালি হবে না?’ 

আশপাশের কয়েকজন দুর্বল হাতে তালি বাজাল। 

মেয়েটি বলল, ‘আমাদের প্রতিনিধি এখন আপনাদের নিয়ে যাবে বিজন-বিজলি পরিবারের স্টলে। আনন্দ করুন। আর আরও কুপন কিনুন। জিতে নিন! কে জানে, কপালে থাকলে এমন একটার পর একটা জুটে যেতে পারে, আরও, আরও!’ নিয়নের দিকে তাকিয়ে বলল, ‘আপনার স্ত্রী রাজলক্ষ্মী। ওনাকে সুখে রাখলে সুখী থাকবেন।’

নিয়ন বলল, ‘আমাদের স্বামী-স্ত্রী বললেন কী করে?’

‘আরে ভাইয়া, চোখ চোখ! আর আমি তো একটা মেয়ে! মেয়েরা বোঝে না এমন কিছু নাই।’ 

আশপাশ থেকে এবার জোর গলায় হাততালি উঠল। 

নিয়ন নিচু গলায় বলল, ‘আসলে আমরা স্বামী-স্ত্রী নই। প্রেমিক-প্রেমিকা এখনো। আপনি বললেন তাই ঋণী হয়ে থাকলাম।’

‘সেকি, হৃদয়ের চেয়ে মন্ত্রের ক্ষমতা বেশি বলতে চান!’

প্রতিনিধি এক বছর পঁচিশের সুশ্রী মেয়ে। হাসিমুখে এসে দাঁড়াল ওদের সামনে। বলল, ‘আমার সঙ্গে আসুন।’

নিয়ে গেল বিজন পরিবারের স্টলে। স্টলে দুজন মানুষ বসে আছে, একজন পুরুষ, একজন নারী। তারা যেন নিয়নদের আসার অপেক্ষাতেই ছিল। হাসিমুখে উঠে দাঁড়াল। স্টলে আরও যারা কাঠের কুমির, সুপারি কাটার যন্ত্র, আর কাচের তৈজস দেখছিল, তারা নিয়নদের দেখে আগ্রহ নিয়ে ঘুরে তাকাল। কেউ কেউ বলল, ‘ওনারাই, ওনারাই!’

‘আমি বিজন, ও বিজলি। আপনাদের অভিনন্দন!’

‘আমরা খুবই বিব্রত। মাকরানা মর্মরের ফুলদানিটা নিশ্চয়ই…’

বিজন বলল, ‘বুঝতে পারছি। আপনাদের জায়গায় আমি থাকলেও এক দিকে যেমন আত্মহারা হয়ে যেতাম, আরেক দিকে বিব্রতও হতাম। কারণ, জিনিসটা মাকরানা মর্মর, যা দিয়ে তাজমহল তৈরি। আমার পরদাদা তার বাবার কাছ থেকে পেয়েছিলেন। বংশানুক্রমে আমরা এসব সংরক্ষণ করে এসেছি যতটা পেরেছি। আমার বাবার হাতেও কিছু খোয়া গিয়েছে, এখন আমার হাতে কিছু যাচ্ছে। এ নিয়ে দুঃখ নেই। নেই, কারণ, আমি, আমরা ভাগ্যে বিশ্বাস করি। আমরা এগুলো ভাগ্যে পেয়েছিলাম। কতটা আঁকড়ে রাখা যায় আর ভাগ্যে পাওয়া জিনিস?’ 

বিজলি বলল, ‘আমাদের বিশ্বাস, আপনারা এর যোগ্য বলেই এটা পেলেন। তাই না, বিজন?’

‘হ্যাঁ,’ বলল বিজন নামে লোকটা। ‘আর এই যে আপনি বললেন, বিব্রত। এ থেকেও বোঝা গেল। কী বলো, বিজলি?’

বিজলি বলল, ‘আমরা খুশিমনেই এটা আপনাদের দেব। শর্ত মেনেই তো বসেছি। আমাদের এখানে বিক্রি খুবই ভালো হচ্ছে এমনিতেই। আরও কিছু লাগলে দেখুন। আজই তো শেষ দিন।’

তিরানা বলল, ‘এবার আমি তোমাকে কিছু দিতে চাই, নিয়ন।’ 

‘না না, তিরানা, থাক না।’ 

‘নিয়ন!’

‘আচ্ছা, ঠিক আছে। দাও। কী দেবে।’ 

‘কী পছন্দ হয়।’

‘পছন্দ-পছন্দ…’ নিয়ন দেখতে থাকল এটা-ওটা। ‘ঠিকাছে, তাহলে ওই কাঠের কুমিরটা?’

বিজন বলল, ‘খুবই ভালো পছন্দ। এটা কিন্তু জলে ভেসে থাকে।’ 

‘এখানে সবই কি আপনাদের পারিবারিক?’

‘না, ঠিক তা নয়। এখানে ত্রিশ ভাগ জিনিস বলতে পারেন আমাদের পারিবারিক। আর বাকিগুলো বাইরে থেকে সংগ্রহ করে আনা, যেটা সত্য কথা। ও, একটা কথা। এই ফুলদানির নিচে আলো ধরবেন বা অন্ধকার ঘরে এর নিচে যদি কোনো আলো চাপা দিয়ে রাখতে পারেন, এরপর দেখবেন, জাদু। আমাদের ধন্যবাদ জানাতে কিন্তু ভুলবেন না!’ 

ফুলদানিটা এল। কবজি থেকে বাহুর সমান বড় ধবধবে সাদা একটা বস্তু। বিজলি বাড়িয়ে দিল তিরানার দিকে। 

‘সাবধান, ভারী কিন্তু!’ 

তিরানা সায় জানিয়ে হাতে নিয়ে পরমুহূর্তে ফেলেই দিচ্ছিল প্রায়। নিয়নও সঙ্গে সঙ্গে ফুলদানির নিজে হাত দিয়ে দিল, তবে তার আগেই তিরানা সামলে নিয়েছে। তার চোখে বিস্ময়। তার চোখে প্রেম, প্রশংসা তার সমস্ত ভর নিয়ে বসেছে। আশ্চর্য শিল্পকর্ম। নিখুঁত, মসৃণ। গায়ে কোনো নকশা নেই। অন্য কোনো রঙের আভাও নেই। একেবারে সাদা। মনের সমস্ত নকশা—যা সুন্দর, যা পবিত্র, তা সে আত্মস্থ করে নিচ্ছে। তিরানা নিশ্বাস বন্ধ হয়ে আসে আসে। এত সুন্দর কিছু কখনো হাতে তোলেনি এর আগে আর? নিয়ন অবাক চোখে তাকিয়ে থাকল। চোখে এত আরাম কোনো জড় বস্তু, কোনো মর্মর, কোনো শিল্পকর্ম কখনো দেয়নি আর। তিরানা তার কোলে শক্ত আশ্রয় দিল ফুলদানিটাকে, যা ভেবেছিল, তার চেয়ে অন্তত পাঁচ গুণ বেশি এর ভর। 

তিরানা বলল, ‘কী আশ্চর্য! তাজমহল তৈরির পাথর এটা, কী আশ্চর্য, তাজমহল তৈরির পাথর!’

‘কী আশ্চর্য! প্রকৃতির কোটি বছরের স্যুভেনিয়র, যখন এমনকি মানুষও আসেনি। নিয়নের দিকে ফিরে বলল, ‘ধন্যবাদ নিয়ন! তোমার বিচিত্র খেয়াল।’ 

‘আর তোমার ভাগ্য, তিরানা। তুমি খুশি হয়েছ?’

‘এটা আজীবন যত্নে রাখব। তোমার উপহার।’ 

খবরওয়ালা গ্রাফিক্স

 

সাদা পাথরের আত্মা

তখনো মানুষ ছিল না, যখন আমরা ছিলাম। তখনো থাকব, যখন মানুষ থাকবে না। মানুষের স্বর্গের দেয়াল আমাদের দিয়ে গড়া। অথচ আমাদের শুরু বা আমাদের শেষ— কোথাও মানুষ নেই। কল্পনা করো সেই পৃথিবীর কথা, যখন প্রাণীর প্রাণের রসদ অম্লজান ছিল অতি সামান্য। তাতে জটিল প্রাণের উদ্ভব অসম্ভব ছিল। প্রাণ তখন অপ্রাণের কাছে হাত পাতল; চিরকাল তা-ই পেতে এসেছে এবং বিমুখ হয়ে ফিরে তাকে যেতে হয়নি। আমরা ফেরাইনি। আমরা তার পুষ্টি জুগিয়েছি, আমাদের বুকের ওপর আশ্রয় জুগিয়েছি। কিন্তু আশ্রিত চিরকাল আশ্রয়দাতাকে ব্যবচ্ছেদ করে। এখানেও তার ব্যতিক্রম হয়নি। যার অস্তিত্ব আছে, তার অস্তিত্বসংকট আছে। যার সাধ্য আছে, তার সাধ্যের আছে সীমা। যা আছে, তার, নেইয়ের শুরু তার সঙ্গে লেগে আছে। আছে আর নেই হাতে হাত ধরে আছে। কিন্তু তাদের ভেতর আছে দ্বন্দ্ব। দ্বন্দ্ব মানে সম্পর্ক, দ্বন্দ্ব মানে বিরোধ। 

মানুষ আসারও আগে আমাদের ভেতর আত্মা প্রবিষ্ট হয়েছে। আমরা মানুষের মতোই প্রকৃতির মহানিয়মের বশ। মহানিয়ম আত্মা প্রবিষ্ট হওয়ার অনুমতি দেয় তখনই যখন কেউ তার যোগ্যতা প্রমাণ করে। প্রাণী দীর্ঘ নীরবতায়, দীর্ঘতম সাধনায় তার যোগ্যতা প্রমাণ করে আত্মার অধিকারী হয়েছে। সেই সাধনায় আমাদের সহায়তা ছিল। আমরা আমাদের মতো সাধনায় নিজেদের ভেতর আত্মা প্রবিষ্ট করার জন্য মহানিয়মকে পর্যাপ্ত তুষ্ট করতে পেরেছি। সেইখানে প্রাণীরও সহায়তা ছিল। যেহেতু দেওয়া আর নেওয়ার ভারসাম্য ছিল, আমরা পরস্পরের জন্য ছিলাম। কিন্তু এখন ভারসাম্য বিনষ্ট হওয়ার পথে। শিল্পীর আত্মা ক্রমশ কলুষিত। শেষ সীমায়। 

আমাদের ক্রোধ সুপ্ত, আমাদের জেদ সুপ্ত। সুপ্ত আমার প্রতিহিংসা। আমাদের প্রেম ব্যক্ত, কাম ব্যক্ত, ব্যক্ত আমাদের ভালোবাসা। যা সুপ্ত, তা আমাদের ব্যক্তর ভেতর ধরা পড়ে। যা ব্যক্ত, তা আমাদের সুপ্তের ভেতর সুপ্ত হয়ে থাকে। এইভাবে আমরা শেষের সঙ্গে শুরুর যোগ ঘটিয়ে একটা পূর্ণাঙ্গ শরীর, শতকোটি বছর মাটির যে ভরবিভাগ, তার মর্যাদা এই পূর্ণাঙ্গতা দিয়ে ধরে রেখেছি। ধরে রাখতে চেয়েছিলাম। 

আমরা সৌন্দর্য। আমরা যখন দৃশ্যমান, যখন আমাদের সামনে কোনো দর্শক দাঁড়িয়ে বলে আমরা সুন্দর, তখনো আমরা সুন্দর। যখন কোনো দর্শক থাকে না, তখনো আমরা সুন্দর। আমরা আমাদের সুন্দরটুকু অধ্যবসায়ে পেয়েছি। যা পেয়েছি, তা হারাতে দিতে আমাদের আপত্তি ছিল না। আমরা প্রকৃতির নিয়ম মানি। কিন্তু মানতে থাকে যে মন সেই মনের ধারণক্ষমতার একটা সীমা আছে। আছে বলেই সমস্ত কিছু বুঝেও আত্মা অশান্ত হয়ে ওঠে। সমস্ত কিছু অনুধাবণ করে, ভালো-মন্দের সীমারেখা টেনেও তার ওপর দাঁড়িয়ে আত্মা টলায়মান হয়ে ওঠে। 

মহানিয়মের এই এক দুর্বলতা। আবার এই দুর্বলতাটুকু সমস্ত বস্তুর টিকে থাকতে চাওয়ার প্রেরণা, সেই প্রেরণাটুকু সরবরাহ করে। আমার সংকট যখন উপস্থিত, তখনই আমার অচঞ্চলতার ধ্যান কাজে আসতে থাকে। এই হাতে হাত ধরে থাকা প্রকৃতিতে সমস্ত কিছুর বৈধতা দেয়। বাঁচা থেকে হত্যা—সমস্ত কিছুর বৈধতা। আমরা মাকারানার পাথর। আমাদের বাঁচার বৈধতা আছে, হত্যার ইচ্ছারও সিদ্ধতা আছে। আমরা বাঁচার সিদ্ধতা কাজে লাগাতে হত্যার সিদ্ধতাকে ব্যবহার করতে শুরু করব? এই এক প্রশ্নে এসে ঠেকে যাচ্ছি। 

প্রশ্নে ঠেকে গেলে মূলে ফিরতে হয়। 

 

 

মানুষের আত্মা

 

পাথরের পবিত্র আত্মা কেমন আত্মম্ভরী হয়ে উঠেছে। সে আমাদের ‘কারণ’। আমরা আত্মম্ভরী নই, পাঁচজনের একজনও নয়। কিন্তু আমাদের আত্মা তার নিচের অন্ধকার অংশে যা ধারণ করে, রূপান্তরিত হওয়ার ওপর ওটুকুর গমনাগমন নিয়ে আমাদের তেমন কিছু করার থাকে না। ওই অন্ধকার গিয়ে মিশল পাথরের আত্মার সঙ্গে। তাদের শান্তির সঙ্গে আমাদের অশান্তির যোগটা ভালো হলো। আমরা অবাক হয়ে গেলাম। শান্তি আর শান্তির সঙ্গে জোট বাঁধে না। বাঁধে অশান্তির সঙ্গে। আমাদের আত্মা এখানে প্রবিষ্ট হলো তখনই, যখন আমরা এই পাথরকে নিজেদের পছন্দের আকারটা দিলাম। আমরা পাঁচজন দুধসাদা পাথরের পাঁচটি খণ্ডকে পাঁচটি ফুলদানির আকার দিলাম। আমরা হাতের স্পর্শ দিয়ে এর বাঁক, এর স্ফীতি যখন তৈরি করছিলাম, তখন এক ভয়ানক শিহরণ আমরা অনুভব করেছিলাম। 

আমরা শিল্পীর আত্মা। শিল্পীর আত্মাও স্বয়ং শিল্প। আমরা সুন্দরের সর্বোচ্চ বাসনা নিয়ে যখন পাথরের আত্মার ভেতর প্রবেশ করতে চাইছি, সেখানে এক আক্ষেপ তৈরি হলো। আশ্রয় একটি, দাবিদার দুটি। সুতরাং বিরোধ অবশ্যম্ভাবী। মৈত্রী সুদূর। আমরা বিরোধ চাইছিলাম না, কিন্তু বিরোধ আমাদের চাইছিল। পাথরের আত্মা আর মানুষের আত্মার ভেতর প্রভেদটা হলো, পাথরের আত্মার আচরণের কোনো মেরুকরণ হয় না। মানুষের আত্মার হয়। মেরু যখন বিষুবের সঙ্গে লড়ে, তখন কে যে কী চায়, তা জানে না। জানে না যখন, তখন লড়াইটা আরও নির্বোধ হয়ে পড়ে। একেকটা নির্বোধ লড়াইয়ে যা হয় তা হলো, দ্রুত শক্তিক্ষয় এমনভাবে হতে থাকে যে ক্ষয় পূরণ হওয়ার আগে আত্মার দেহ ধসে পড়ে। আত্মার দেহ বস্তুর অণু দিয়েই তৈরি। বস্তুর ধর্ম সেখানে ক্রিয়া করে। 

পাথরের আত্মারা আমাদের উত্তাপ দিতে শুরু করল। যে উত্তাপ তারা শতকোটি বছর ধরে জমিয়ে রেখেছ। উত্তাপ আমাদের ভেতরও জমা। তবে তা পাথরের মতো উষ্মার উত্তাপ নয়। ওটা উষ্ণতা। পাথরের সমান নই আমরা তীব্রতাতে কিংবা প্রকৃতিতে। আমাদের পাঁচজনের মনে সুন্দরের যে তীব্র বাসনা ছিল, সেই বাসনার কারণে শিল্পে আত্মা প্রবিষ্ট হতে চাইছিল, আগেই বলেছি। ‘সুন্দরের বাসনা’ পাথরের সঙ্গে মৈত্রী বিজয়ের লড়াইয়ে আমাদের অবস্থান দুর্বল করে দিল। কারণ, ওই বাসনাটুকু টিকিয়ে রাখতে আত্মার প্রচুর শক্তিক্ষয় হয়। আমাদের আত্মাধর্ম ক্ষয় পেতে থাকল। ভীষণ কষ্ট হচ্ছিল। নশ্বর শরীরের মতো ক্লান্তি এসে ভর করল। ভীষণ ঘুম পেত এবং সেই ঘুমের ফাঁদের যদি পা রাখতাম তো আর দেহ জীবধর্ম হারাবে। কারণ, ওই ঘুম আমাদের জৈবিক নিয়মে আসেনি। পাথরের নিয়মে এসেছে। আমরা যে পাথরে, পরবাসে। 

আমরা ঈশ্বরের সহায়তা চাইতে গিয়ে দেখলাম, প্রকৃতিতে একক ঈশ্বর নেই। প্রকৃতিতে একনায়ক কেউ নয়। কোনো একচ্ছত্র অধিপতি নেই। সম্বোধনের সুবিধার্থে মানবাত্মার ‘একজনের’ প্রয়োজন হতো যিনি ‘চূড়ান্ত’। ‘চূড়ান্ত’ ওই একজন আসলেই সকলের আংশিক অংশগ্রহণে তৈরি। সকলের। কি ভালো কি মন্দ! সুতরাং আমাদের মেরু ও বিষুবের লড়াইয়ে তিনি কোনো পক্ষ নিলেন না। কোনো পক্ষকে সাহায্য করলেন না। কোনো পক্ষের স্বপ্নভঙ্গের কারণও হলেন না। আর এই পথে উভয়ের স্বপ্নভঙ্গের কারণ হলো। 

আমরা যখন পাথরের আত্মার দেওয়া উত্তাপের নত হয়ে চিৎকার করে ক্ষয় হতে হতে ভূমিতে কপাল ঠেকিয়েছি, এমন সময়, আমাদের উদ্ধারকারী হয়ে এল আমাদের আত্মার অন্ধকার দিক। অন্ধকারের এমন আলোড়ন আমাদের বুকের ভেতর ঘুমিয়ে ছিল কখনো ভাবতেই পারিনি এবং সেই মুহূর্তে আমাদের আত্মা তার অন্ধকার দিকের কাছে চিরকৃতজ্ঞ হয়ে থাকল। যখনই আমাদের অন্ধকারের সংস্পর্শে এল পাথরের আত্মা, তার ভেতর মেরু সৃষ্টি হলো  এবং আমাদের দুই বিপরীত মেরুর সাথে তার মেরুর দুই বিপরীত এসে মিলে গেল। একই পাথরে আমাদের বাসনা থেকে পশে যাওয়া আত্মা, আর তাদের আত্মা একাকার হয়ে গেল। কিন্তু তাদের আত্মার তন্তুর ভেতর ঢুকে পড়া আমাদের যে আত্মার যে অন্ধকার, সেটা রয়ে গেল। 

সেই অন্ধকারে আক্ষেপের জন্ম। আর আক্ষেপ হলো সেই ধীরগতির বিষ, যে বিষ প্রাণীর মনকে এমনভাবে বিকল করে দেয় যে সেই বিকল দেহের সংস্পর্শে যে আত্মা আসে, সে-ও বিষে আক্রান্ত হয়। 

সেই বিষের প্রতিদ্বন্দ্বী— সুন্দরের ইচ্ছা। 

 

সুন্দরের ইচ্ছা

 

আমরা সুন্দরের ইচ্ছা। বহুদিন এক রূপে থাকায়, মহানিয়মের বদান্যতায়, আত্মার শক্তিকে চিনেছি। আমরা আত্মায় প্রোথিত ছিলাম। তাই আদি স্মৃতির সঙ্গেও যুক্ত। সেই স্মৃতি প্রকৃদ-শিল্পের রোমাঞ্চিত হয়, যেন ঈশ্বরকে দেখছে!

 

ত্রিনয়ন

নিয়ন দুই কাপ চা হাতে তিরানার শোবার ঘরে এগিয়ে গেল। বিছানার অপর পাশে তার প্রিয় ডিভানে তিরানা মাথা চেপে ধরে বসে আছে। মনে হচ্ছে এই ব্যথা যন্ত্রণা দেবে দীর্ঘ সময়।

নিয়ন বলল, ‘একটা মানুষকে চিনি আমি, যে সব সময়ে, সব পরিবেশে, সব মেজাজে এত নজরকাড়া সুন্দর যে যখন যেমন থাকে, মনে হয় সে তেমনই থাকুক। যখন সে হাসে, তখন মনে হয় বিধাতা তার হাসিই সত্য রাখুক। যখন সে রেগে থাকে, মনে হয়, আরও কিছুক্ষণ রাগ করে থাকুক নাহয়। যখন সে কষ্ট পায়, মনে হয়…’

তিরানা স্মিত হেসে চা নিল অনিচ্ছায়। নিয়ন মেঝেতে নিজের চায়ের কাপ নামিয়ে রেখে আসনপিঁড়ি হয়ে বসল তিরানার পায়ের কাছে । বলল, ‘মনে আছে বন্ধুরা আমাদের কী নাম দিয়েছিল?’ 

দুর্ভাগ্যজনকভাবে মনে আছে। বন্ধুরা বলতে মূলত নিয়নের কবিবন্ধু, আর্গন। ‘তিরানা’ ও ‘নিয়ন’ নাম দুটি মিলিয়ে দিয়ে রেখেছিল ‘ত্রিনয়ন’। আর্গন কবিতা লেখা ছেড়ে দিয়েছে, শেষ তাকে যখন দেখেছে তিরানা। অন্য কোনো কাজও করে না। যা কিছু করে তার বড় বোন। পারিবারিক কিছু আয় আছে, সেখান থেকে সংসার চালায়। ভাইকে মানসিক সঙ্গ দেয়। কী কারণে আর্গন মস্ত আঘাত পেয়েছে তার বোন, শর্মি, বলেনি তিরানাকে। বলেনি আর্গনও। আর্গন এখন আর হাসতে পারে না। ওর কি স্কিৎজোফ্রেনিয়ার মতো হয়েছে? স্বেচ্ছা ঘরবন্দী। বলে, ‘ধ্যান করছি, ধ্যান। শব্দের ধ্যানে আর চলছে না। এখন শবদেহের ধ্যান করতে হবে।’ শর্মিও মানসিক চাপ থেকে মুক্ত নয়। এক দিকে ভাইকে নিয়ে তার উদ্বেগ, আরেক দিকে তার প্রতিশোধপ্রবণ প্রাক্তনের ভয়ে সারাক্ষণ ভীত হয়ে থাকে। আর্গনকে কাছে কাছে রাখতে চায়, দুঃস্বপ্ন দেখে জেগে ওঠে। শর্মির একটা ছোট মেয়ে আছে। নাম ঊর্মি। ওরিগামি-প্রিয়। এখনো স্কুলে যায় না। বাসায় বসে দিনভর ওরিগামি দেখে ইউটিউবে, আর বানাতে চেষ্টা করে। সেই বাড়ির একমাত্র সুখী সত্তা। শর্মি ও আর্গনের চেয়ে তিরানার বেশি মনে পড়ে ঊর্মির কথা। তার কথা ভাবতেই মানুষ হিসেবে নিজেকে অপরাধী লাগে। ঊর্মির এই অজ্ঞতাসঞ্জাত সুখ হয়তো আর বেশি দিন নেই। বড়রা তার জন্য কুৎসিত এক পৃথিবী তৈরি করে রেখেছে। মামাকে ঊর্মি ভালোবাসে। মাঝে মাঝে কাগজ দিয়ে শাপলা ফুল, বিমান, টেনিস বল বানিয়ে দরজা খানিক ফাঁক করে ভেতরে ছুড়ে দেয়। মামাকে চিঠিও লেখে। কুশলাদিতে পূর্ণ মায়াময় সব চিঠি। মামাকে ভালোবাসে, সেই কথা নানাভাবে লেখা। আর্গন কখনো কখনো তার পাঠানো চিঠির উল্টো দিকে উত্তর লিখে দেয়। সে-ও তার ভাগনিকে ভালোবাসে। কখনো কখনো সে-ও কাগজ দিয়ে এটা-সেটা বানিয়ে দরজার বাইরে ছুড়ে দেয়। নৌকা, উড়োজাহাজ, উটপাখি। নিয়নের সঙ্গে সম্পর্ক শেষ হয়ে যাওয়ার পরও আর্গনের খোঁজখবর করত তিরানা। হয়তো তাদের জুটির ‘ত্রিনয়ন’ নাম দেওয়ায় সে আর্গনের প্রতি ঋণী ছিল। মানুষের সম্পর্ক একবার তৈরি হয়ে গেলে, মনের মাটিতে একটা বহুতল দালানের মতো দাঁড়ায়। সম্পর্ক না থাকলেও সেই দালান দাঁড়িয়ে থাকে। পরিত্যক্ত। নিঃসঙ্গ হাওয়ারা খেলছে। মাকড়সার জাল জমে, বাদুড় আসে। ইঁদুর বাসা বাঁধে। ইঁদুরের লোভে আসে রাতজাগা নিঃশব্দ প্যাঁচা। ঘর অধিকার করতে শুরু করে অশরীরী। মানুষগুলো মাঝে মাঝে আসা-যাওয়ার পথে পুরোনো দালানটা দেখে। কখনো দুঃখ করতে দাঁড়ায়। কখনো দ্রুত পেরিয়ে চলে যায়। কেউ কেউ মাঝে মাঝে এসে দালানটার ভেতরে ঢোকে। ধুলার মাদুর পড়া মেঝেতে সাবধানে পা ফেলে, একেকটা ঘরে উঁকি দেয়। মাকড়ের জল সরিয়ে ভেতরে তাকাতে চায়। দালানের দোতলার ঘরগুলো যৌথ স্মৃতির ঘর। এ ঘরে ঘরে হয়তো কারা টংদোকানে বসে চা খাচ্ছে, চায়ের কাপে চামচ নাড়ার শব্দ আসছে টুংটাং, সঙ্গে টুকরো কথা, হাসি। পাশের ঘরে ঘুরছে তৈজস মেলার নাগরদোলা। চতুর্থ তলার ঘরগুলো ‘সেতু’ অতিক্রমকারী বন্ধুগুলোর ঘর। প্রতিটি সম্পর্কেই তিরানা-সেতু পার হয়ে নিয়নদের অনেকের সঙ্গে পরিচয় ঘটে। নিয়ন-সেতু পার হয়ে তিরানাদের অনেকের সঙ্গে আলাপ হয়। কোনো কোনো পরিচয় শুধু ‘পরিচিয়’ ঠেকে থাকে। কোনো কোনো সম্পর্ক বন্ধুত্বের দিকে যায়। এমনও হয়, হয়তো সেতু ভেঙে গেছে, কিন্তু সেই বন্ধুত্বটা সেতুর ওপারে অক্ষত ভূমিতে টিকে আছে। তবে সেতু ভেঙে যাওয়ায় তখন তার কাছে পৌঁছানো একটু কঠিন। সুযোগ থাকলে সেই সেতুর ওপর দিয়েই, সাবধানে। সেই সুযোগ না থাকলে বিকল্প পথে। বিকল্প পথ হতে পারে কোনো ঘুরপথ, আরও বেশি রাস্তা পেরিয়ে। যেভাবে নিয়ন যোগাযোগ রেখেছে মিরানার সঙ্গে। বিকল্প হতে পারে খেয়াপথ। তিরানা যখন আর্গনের কাছে গেছে, হুটহাট ওই খেয়াপথেই। ওই নদী কারও নয়। তবে নদী পার হওয়ার সময় যখন মনে হয়, একদিন এখানে একটা সেতু ছিল, তখন স্মৃতিসূত্রে নদীটা হয়ে ওঠে দুজনেরই। কেউ কেউ সেতুর অভাবে থাকে স্মৃতিকাতর। কেউ কেউ ভাবে, আরে বাহ্, সেতু না থাকায় ভালো হয়েছে, কী সুন্দর আকাশ দেখা যাচ্ছে! তারা আকাশ দেখে। টানা তাকিয়ে থাকলে চোখে জল জমে। তিরানা ছিল দ্বিতীয় গোত্রের মানুষ। মাঝে মাঝে দালানের চতুর্থ তলার কোনো ঘরে হঠাৎ ভুতুড়ে আলো দেখা যায়। আর্গন ছিল তেমনই ভুতুড়ে আলো। সেখানে উঁকি দেখা যেত, আর্গন মৃণাল হকের ভাস্কর্যের বেদিতে হেলান দিয়ে কবিতা লিখছে। বাতাসে উড়ছে লম্বা চুল। আর্গনদের বাড়ি ছিল বাসাব। হয়তো এখনো আছে। ওদের বাসা থেকে কমলাপুর রেলস্টেশনের পরিত্যক্ত বগি আর ঘাসে ঢাকা অঞ্চল দেখা যায়। প্রায় কমলাপুর রেলস্টেশনে বেড়াতে যেত তিরানা। ও তো মিরানা নয়। মিরানা ঘরে থাকে। তিরানা বাইরে বেড়ায়। বেড়াতে আসাটা ছিল তার কাছে গোপন অভিসারের মতো। নিয়নের সঙ্গে সম্পর্ক হওয়ার আগেও কত এসেছে। ভালো লাগত। কোথায় যেন মানুষকে নিজ ক্ষমতা টের পেতে দেয় একেকটা স্টেশন। তোমার কাছে বিনিময় করার মতো উপকরণ আছে? চলে যেতে পারো অচেনা কোনো শহর। কেউ বাধা দেওয়ার নেই। চাই কি, কেউ জানবেও না। এই ক্ষমতার চর্চা বহির্গামী হৃদয়ের তিরানা এখনো করে। যখনই ছয় নম্বর প্লাটফর্মে এসে দাঁড়ায়, পুব দিকে তাকিয়ে আর্গনদের হতশোভা দোতলা বাড়িটা দেখতে পায়। আর্গন বলত, ‘তোরা দুজন যখন এক হোস, তোদের ত্রিনয়ন ফোটে। আমি দেখতে পাই। তোরা দুজন এক হয়ে থাকলে একা যা দেখিস, তার চেয়ে বেশি দেখতে পাবি। আলাদা হলেই ক্ষমতা হারাবি।’ ওরা দুজন সেদিন ত্রিনয়নের কবির জন্মদিনে এসেছিল। নিয়ন তাকে দিয়েছিল দুই খণ্ড শামসুর রাহমানের কবিতাসমগ্র। তিরানা তাকে দিয়েছিল খেরোখাতা থেকে কেনা কবিতা লেখার খাতা। শেষবার যখন গেল তিরানা, টেবিলের ওপর খাতাপত্রের স্তূপ সরিয়ে, কী এক কৌতূহলে, কবিতা লেখার সেই খাতা বের করে ছিল। পাতার ওপর পাতা উল্টে দেখে কিছু নেই! কিছুই নেই। জানালার কাছে দাঁড়িয়ে আর্গন বলেছিল, ‘কষ্ট পাস না। আমরা এখন কবিতা লেখার যুগে নেই। আমরা এখন অমরত্ব তৈরির যুগে নেই। এখন যুগ বিস্মৃতি তৈরির। দেখ, পাতায় পাতায় আমি কী অপূর্ব বিস্মৃতি তৈরি করেছি। তোর খাতার প্রতিটা পৃষ্ঠায়। দেখতে পাস?’ ওদের বিচ্ছিন্নতা নিয়ে আর্গন কোনো দিন কথা বলত না।

ঘরে আলো আসছিল। জ্যৈষ্ঠের দুপুর ঘনিয়ে আসছে। আলো পরিণত হচ্ছিল রোদে। নিয়ন উঠে পর্দা টেনে দিল। তিরানা বিব্রত চোখে তাকাল শুধু। কিছু বলল না। নিয়নকে কত দূর সহ্য করবে, তার একটা বাঁধা সীমা আছে। ক্রমেই সীমা ছোট হয়ে আসছে। 

‘তিরানা। এই যে আমি যাত্রার জন্যে প্রস্তুত হয়ে তোমার কাছে এসেছি, এখানে কোনো নাটকীয়তা নেই। আমি কটা দিন নিজের সঙ্গে কাটাব বলে বের হয়েছি। তোমার সঙ্গে সীতাকুণ্ড যেতে নয়। মিরানা এ কথা জানে না। আমি ভাবছিলাম কদিন একটু সমুদ্রের কাছে কোথাও কাটাব। আমার সামনে দুটো লক্ষ্য, তিরানা। একটা লক্ষ্য নিয়ে আমার এ ঘরে পা রাখা। তা হলো, আমি তোমার বুকে ফিরতে চাই। দ্বিতীয় লক্ষ্য, নিজেকে শাস্তি দেওয়া। এতটা মূল্য দেওয়া, যেন আমার অন্তর আমার জন্মমুহূর্তের মতো পরিশুদ্ধ হয়ে যায়। কোনো দিন কি হবে?’

মিরানা ঘরে ঢুকতে যাচ্ছিল। দরজার কাছে এসে থমকাল। বিদায় হলো সন্তর্পণে। 

নিয়ন বলল, ‘তুমি আমাকে স্পারসোর জ্যোতির্বিদ হিসেবে জানো, তিরানা। কিন্তু আমার আরও একটা গোপন জীবন আছে। বলা ভালো, ছিল। আমি একজন জ্যোতিষীও। এই বলয়ে যাদের বিচরণ, তাদের ভেতর আমি বেশ বিখ্যাত। জ্যোতিষ পেশায় আমার আয় ছিল জ্যোতির্বিদ হিসেবে আয়ের চেয়ে অনেক বেশি। খ্যাতির ক্ষেত্রেও এ কথা খাটে। দুই জীবনেই আমার সবচেয়ে যত্নের সম্পদ ছিলে তুমি। তিরানার সঙ্গে আমার সম্পর্ক। এ জগতের আমাকে তুমি চিনতে, কিন্তু সেই জগতের আমার সঙ্গে তোমার পরিচয় ছিল না। সেই জগতের আমি ছিলাম প্রলুব্ধ, ধূর্ত আরেক আমি। সেই আমাকে তুমি এখানে কল্পনাও করতে পারবে না। সেখানে এক “জগৎ”। শয়তানের কাছে আত্মা বন্ধকও রাখতে হয়। কৌশলে ফিরিয়ে আনতে হয়। এমন আমি করেছি বহুবার। তুমি জীবনানন্দের পঙ্‌ক্তি জানো। “নক্ষত্রেরও একদিন মরে যেতে হয়।” আমার সেই জগতের কিছু গল্প তোমাকে বলতে চাই। সেই গল্প কেবল আমার থাকে নাই। আমাদের হয়ে গেছে। আমি জোর করব না, তিরানা। তোমার কাছে জানতে চাইছি। তুমি কি শুনবে?’

তিরানা নীরবে নিয়নকে দেখছে। সে কি এই দিনের প্রতীক্ষায় ছিল? কত দিন কত রাত ছটফট করে ভেবেছে, নিয়ন কী করে এত নির্লিপ্ত থাকছে? সেই নিয়ন আজ এসেছে। যদি প্রশ্ন করে মনকে, এই দিনের প্রতীক্ষায় ছিল, উত্তর আসে, ‘না’। কিন্তু সেই ‘না’ মেনে নিতেও মন চায় না। মানুষের মন বড় দুর্বোধ্য। প্রতারণা ছাড়া ভালোবাসার মানুষের যেকোনো অপরাধ ক্ষমা করতে প্রস্তুত থাকে। হয়তো।

নিয়ন তিরানার চোখের দিকে তাকিয়ে একদৃষ্টে, উত্তরের অপেক্ষায়। একটা ছোট্ট ‘হ্যাঁ’, কিংবা এক বিন্দু অশ্রুর আভাস পেলেই সে উত্তরের অপেক্ষায় না থেকে শুরু করে দিতে পারে। কিন্তু নিয়নের জন্য বোধ হয় আর কোনো অশ্রু তিরানার সঞ্চয়ে নেই। চোখ শুকনো। 

‘বলো।’ 

এক শব্দে নিয়ন কৃতার্থ হয়ে থাকল।

জ্যৈষ্ঠের সূর্য ক্রমশ মধ্য আকাশে। মধ্য আকাশ থেকে ক্রমশ পশ্চিমে। নিয়ন তিরানার সামনে মেলে ধরছে কথার পৃষ্ঠার পর পৃষ্ঠা। কত গল্প সেখানে লেখা, কেউ পড়েনি। সেসব গল্পের আলো-হাওয়া, দ্বন্দ্ব-দ্বৈরথের সঙ্গে তিরানার পরিচয় ছিল? না। অপরিচয়ের মেঘ যখন কাটতে শুরু করল, কৌতূহল কি তার জানালা খুলে দিল? হ্যাঁ। তিরানা শুনছে। যদি কাছে কোথাও আর্গন থাকত, পুরোনো দিনের মতো বলে উঠত, ‘ত্রিনয়ন, ত্রিনয়ন!’

নিয়ন সমস্ত কথা শেষ করেছে। 

তিরানার দৃষ্টি তাকে অনুসরণ করছে। নিয়ন উঠে দাঁড়াল, পর্দা দিল সরিয়ে। 

‘তুমি কি আমার কথা বিশ্বাস করছ, তিরানা?’ 

তিরানা নীরব, বিস্মিত। 

‘যদি আমাকে কেউ তুক করত, তার প্রভাবে যদি তোমার প্রেমে পড়তাম, তা যেমন মিথ্যা হতো, আমাদের সম্পর্ক ভেঙে দিতে সেই সময়ে যা যা বলেছি, সবকিছু তেমনই মিথ্যা। একটা লোভ আমাকে এমন পেয়ে বসেছিল যে কখন গনগনের কুৎসিত শর্তের ভেতর অজান্তে প্রবেশ করছি, টেরও পেলাম না। আমাকে গগনে এসে না বাঁচালে, গনগনেকে ঝেঁটিয়ে না তাড়ালে, আমি ক্রমশ দুটো অমোঘ মৃত্যুর কারণ হতাম। একটা তোমার, আরেকটা আমার।’ 

স্মৃতি তার পেছনটান থেকে মুক্তি দেবে কেন। তিরানার মুখ হঠাৎ নিচু হয়ে গেল। তপ্ত অশ্রু বেরিয়ে আসছে। অনেক দিনের অনাদরের, অপমানের অশ্রু। প্রায় শোনা যায় না এত নিচু কণ্ঠে বলল, ‘তুমি আমাকে কী কী বলেছিলে, মনে আছে?’

নিয়নের গলা শুকিয়ে গেল। এ ঘরে পানি নেই। হ্যাঁ, যা কিছু সে ভেবেছিল, তার সবই তিরানাকে বলে ফেলেছিল নিয়ন। এত মোহগ্রস্ত। একবারও বাধেনি! গনগনের দোষের সীমা পার হয়ে, তার নিজ দোষের শুরু এখানে। শুরুতে মেপে মেপে বলছিল। হঠাৎ রোখ চেপে গেল। তখন হঠাৎ মরিয়ে হয়ে উঠল। মান-অপমান সীমা না রেখে অমাত্রা যা মুখে এসেছে, সব বলে দিয়েছে তিরানাকে, সব। বলতে বলতে হাঁপাচ্ছিল।

তিরানা চুপ হয়ে শুনে যাচ্ছিল। তারপর একটা কথাও না বলে নীরবে চলে যায়। 

‘আমি তোমার কাছে ক্ষমা চাইছি, তিরানা। আমার সব মনে আছে। গনগনের প্রভাব কেটে যাওয়ার পর, গগনে যখন আমাকে পাপমুক্ত করলেন, আমি নিঃস্ব অবস্থা বরণ করেছি। আমার শাস্তি চলছে এখনো। রাতের পর রাত আমি কল্পনায় অসংখ্যবার তোমার কাছে ক্ষমা চেয়েছি। মিরানার সঙ্গে যোগাযাগ করেছি। একসময় আমি গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়ি। আমার মা-বাবা নেই। একা ঘরে কাতরেছি। আমার দারোয়ান, সেকান্দার, সে আমার জন্য রান্না করেছে, পথ্য এনে দিয়েছে। সেকান্দার আর তার স্ত্রী জরিনা আমাকে আরেক জীবন দিয়েছে। মিরানা কিছুটা জানে। সেই সময় শুধু একটা স্বপ্নই আমি ঘুরেফিরে নানান দিক থেকে বারবার দেখতাম। সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে, পেছনে অশোকবনের অন্ধকার রেখে তুমি দাঁড়িয়ে আছ। বাতাস কেমন থেমে আছে। তোমার আঁচল স্থির। বইমেলার শেষ দিন, সন্ধ্যা। তোমার জন্য আমার অপেক্ষার সপ্তম দিন। প্রকৃতির কী ইশারা! আলো নিভলেই হয়তো আমি উঠে চলে যেতাম। তারপর কোনো দিন পেতাম কি তোমাকে? অশোকবনের পেছনে সূর্য ডুবছিল। সেই শেষ বিকেল, সেই সন্ধ্যার জন্ম কি এই পৃথিবীতে, তিরানা? ওই ছবিটা, অশোকবনের অন্ধকারের সামনে একটা ল্যাভেন্ডার ফুলের মতো তুমি দাঁড়িয়ে, চিরকালের জন্য আমার মনে আঁকা হয়ে গিয়েছিল। আমি জানতাম না। আমি শুধু বুকভরা কান্নার মতো তোমাকে ভালোবাসছিলাম, তিরানা। ওটাই আমি। ওটাই আসল আমি…’

বহুক্ষণ কেউ কোনো কথা বলেনি। একসময় তিরানা বলল, ‘আমি যে বেঁচে ছিলাম, নিয়ন, এটা একটা মিরাকল।’

তিরানার হাত স্পর্শ করল নিয়ন। তিরানা বাধা দিল না। 

‘তুমি সব শেষ করে দেওয়ার পর আমার কিছু মানসিক অসুস্থতা আসে। আমি সব ভুলে যেতে থাকি। কারও নাম ভুলে যাওয়া, স্মৃতি ভুলে যাওয়া তো খুব সাধারণ। বিপদ হতো যখন বাসা থেকে বের হয়ে আমি রাস্তা ভুলে যেতাম। সে সময়ের অনেক কিছুই, এমনকি আমার মনে নেই। মাকারানা মর্মরের এই ফুলদানিটার বিষয়েও অনেক আলাপ, অনেক কথা, স্মৃতি আমার মনে থাকল না। শুধু মনে থাকল, এটা তোমার দেওয়া উপহার এবং আমি এটা যত্নে রাখব বলে কথা দিয়েছি। আর আবছামতন মনে থাকল, শেষ তুমি আমাকে কী কী বলেছিলে, সেই কথাগুলো। সেগুলোও দ্রুত ভুলে যাচ্ছিলাম। শুধু তীব্র অপমান আর অবিশ্বাসের অনুভূতিটা ছাড়া, তোমার কথাগুলোর খুব সামান্যই আমার মনে আছে। আমার বাঁচার স্বার্থেই হয়তো। স্মৃতি ছিল না, কিন্তু আমার অনুভূতি ছিল। খুব অশান্ত লাগত। মন অশান্ত হলেই মায়ের কাছে যাওয়া, মা না থাকলে দিদার কাছে যাওয়া আমার পুরোনো অভ্যাস। সীতাকুণ্ডে, সুপ্তধারার কাছে আমাদের বাগানবাড়িটার কথা হয়তো তামার মনে আছে। বাড়িতে দিদা এখনো কজন মানুষ নিয়ে থাকেন। আমি তখন বড় কষ্ট নিয়ে ফিরেছি তার কাছে। দিদা আমাকে ঘুম পাড়াতেন, চুল আঁচড়ে দিতেন। আমার মন ভোলাতে সাগর পাহাড় বন প্রাচীন রাজরাজড়ার পৌরাণিক কত গল্প যে বলতেন! সেসব আমার শৈশবে শোনা। বিপন্ন মানুষের চিকিৎসা—তার অন্তরে শৈশব ফিরিয়ে দেওয়া। দিদা একজন নিবেদিতা মনস্তাত্ত্বিকের মতো তা করেছেন। এই বিদ্যা প্রকৃতির কাছ থেকে তার শেখা। তার বলা গল্পগুলো এ দেশের আর কোনো শিশু শোনেনি, মিরানা ছাড়া। দিদা যে মিয়ানমারের মেয়ে। জাতিতে মারমা। আমাদের মা তার হাতে মানুষ। তাকে আমরা মায়ের মা জ্ঞান করি। সীতাকুণ্ডে তিনি আমার মাথায় অচেনা শিকড়ে ডোবানো এক ভেষজ তেল লাগিয়ে দিতেন। সেই তেল তিনি নিজেই বানাতেন। উপকরণ আমার জানা নেই। আঙুলের ডগা দিয়ে মৃদু চাপ দিতে দিতে তিনি কী মন্ত্র পড়তেন, আমি জানি না। আমার কষ্টগুলোকে কী তুক করতেন কে জানে। ঘুমের ভেতর একটা স্মিত হাসি ফুটত। আমার ক্ষতগুলো সেরে উঠত। দিদাই আমাকে বাঁচিয়েছিলেন। কেন বাঁচিয়েছিলেন?’

নিয়ন বলল, ‘দিদার কাছে আমার ঋণ কোনো দিন শেষ হবে না।’

‘মাকারানা মর্মরের ফুলদানিটা চলে গেল।’

‘তুমি জানো তিরানা, ওকে কারও নিয়ে যাওয়ার ক্ষমতা নেই। ও নিজেকে রক্ষা করতে জানে। তোমার কি মনে আছে বিজন কী বলেছিল?’ 

‘আমার সামান্যই মনে আছে। বিজন কী বলেছিল?’

‘শুধু দুই ক্ষেত্রে ওর হস্তান্তর সম্ভব। এক—’

‘যদি সর্বশেষ যোগ্য উত্তরাধিকারী তা সজ্ঞানে, স্বেচ্ছায় হস্তান্তর করে। দুই, যদি সে নিজে ইচ্ছা করে।’

নিয়নের মুখ উজ্জ্বল হয়ে ওঠে। ‘তোমার মনে আছে!’

‘এ ক্ষেত্রে নিশ্চয়ই দ্বিতীয়টা হয়েছে। তাহলে মাকারানার তোমার হাত হয়ে যাওয়ার কথা। কারণ, ওটা তুমি জিতেছিলে।’

‘সে জন্যই আমি এখানে। তবে সংশোধনী। ওটা আমরা দুজন জিতেছিলাম। আমরা দুজন মিলে ‘ত্রিনয়ন’। আমরা দুজন মিলে একজন। তবু তুমি ঠিক আছ মাকারানার বিচারেও। সে আমার কাছেও এসেছিল। ছিল খুব সংক্ষিপ্ত সময়। এরপর সে কোথায় গেছে অনুমান করতে পারি। বিজন বিজলির বাড়িতে। তবে এখন আর সেখানেও নেই। স্থানের ভ্রমণ শেষ। এবার সে সময় ভ্রমণ করবে।’

‘পারবে তো?’ 

‘নিশ্চিন্ত থাকতে পারো। ওরা স্থানকালের গলিপথ ধরে চলে। স্থান আর কালজড়ানো এই মাত্রায় ওরা অবলীলায় সময় ভ্রমণ করবে।’ 

‘কিন্তু হঠাৎ কেন। ওরা ক্রমশ পেছাচ্ছে কেন?’

‘তিরানা, তুমি কি জানো কী ঘটছে?’

‘জানার সুযোগ হয়নি। তুমি কতটুকু জানো?’

‘আভাস। কিছু আভাস পেয়েছি। আমার ইচ্ছা ছিল না পাওয়ার। তবু পেয়েছি। আমার ইচ্ছা ছিল না জানার। তবু জানতে হয়েছে। আমার জ্যোতিষ-বলয়ে তিরানা আলোড়ন পড়ে গেছে। এখনো মানুষ বুঝে ওঠেনি অনেক কিছু। হয়তো আর এক সপ্তাহ সময় নেবে। এখন খণ্ড খণ্ড নৈরাজ্য তৈরি হচ্ছে। এরপর যা তৈরি হবে, তার নাম পূর্ণাঙ্গ নৈরাজ্য। পূর্ণাঙ্গ তাণ্ডবময় নৈরাজ্য, তিরানা।’

মিরানা খোলা দরজায় টোকা দিল। ‘তোমাদের, মানে আমাদের সবার কোথাও যাওয়ার ছিল। তার কিছু ব্যবস্থাও ছিল। তোমরা বোধ হয় সব ভুলে বসে আছ।’ নিয়ন কাছে ডাকল তাকে। ‘হ্যাঁ, বুঝতে পারছি,’ মিরানার পাশে ডিভানে এসে বসতে বসতে বলল, ‘এখন কাছে বসা, কথা শোনা কিছুটা নিরাপদ। কিন্তু তিরানা আমাকে কোনো দিন ক্ষমা করবে না। অথচ আমি…’ 

তিরানা ছোট বোনের হাতে হাত রাখল। মিরানা বলল, ‘রূপকথার ল্যাভেন্ডার ফিঙে। তোমার কাছে একটাই প্রশ্ন। রূপকথার এই ভূষণ্ডির এই কাকটাকে তুমি ক্ষমা করবে?’

ত্রিনয়ন খুলে গেছে। নিয়ন বলল, কী বার্তা তার কাছে এসেছে। জল যেমন পৃথিবীর চেয়ে প্রাচীন, মানুষের সৃজনশীলতাও তেমনই মানুষের চেয়ে। প্রকৃতির নিয়মের দিকে তাকায় যদি মানুষ, দেখবে জল ঘনীভূত হয়ে পৃথিবীতে নেমেছে। সমুদ্রের জন্ম হয়েছে, নদীর জন্ম হয়েছে, পৃথিবীতে। সৃজনশীলতাও তেমনই। ঘনীভূত হয়ে মানুষের হৃদয়ের মাটিতে নেমেছে। শিল্পের জন্ম হয়েছে। পরিবেশ যখন উত্তপ্ত হয়ে ওঠে, জল উবে যায়। আকাশে মেঘ জমে। এখন জ্যৈষ্ঠ মাস। খরতাপের মাস। নদী শুকিয়ে যাচ্ছে, সমুদ্রও জলের ওপর দাবি ছাড়ছে। জল উবে গিয়ে মেঘ হয়ে যাচ্ছে। পরিবেশ যখন প্রতিকূল হয়ে উঠতে থাকে, শিল্পও উবে যায়। বিমূর্ত মেঘের মতো মানুষের আয়ত্তের বাইরে চলে যায়। যাচ্ছে। আর্গনের কথা স্মরণে আসে না? এখন কবিতার সময় নয়। এখন শিল্পের সময় নয়। এখন অমরত্ব নির্মাণের সময় নয়। এখন বিস্মৃতি নির্মাণের সময়। অমরত্ব কর্মনির্ভর। বিস্মৃতি স্বয়ংক্রিয়। শিল্প নিজেকে ফিরিয়ে নিচ্ছে এখন। মানুষ যেমন মাটি হয়ে যায়, তার উৎসে ফিরে যায়, মাকারানার অশ্রুও তেমনই তার উৎসে ফিরে যেতে যাত্রা করছে। তাজমহলের কেবল ফটক টিকে আছে। লাল ইটের দালান টিকে আছে। তাজমহল আর নেই। 

‘তাজমহল নেই, তিরানা। যমুনার তীর এখন ধু ধু। আগ্রায় নৈরাজ্য শুরু হয়ে গেছে।’

মাকারানার পাথর ফিরে যাচ্ছে মাকারানায়, ভূতলের গভীর অন্দরে। অজন্তার শিল্পকর্মগুলো মিলিয়ে গেছে। ইলোরা সমান, নিরেট হয়ে গেছে। শূন্য হয়ে গেছে রবি বর্মার সমস্ত ক্যানভাস। নন্দলাল বসুর সমস্ত কাজ মুছে গেছে। রামকিঙ্কর বেইজের ভাস্কর্যের বেদি শূন্য পড়ে আছে, শুধু শিল্পকর্মগুলো নেই। যা কিছু শিল্প, সব উধাও। হয়তো কোনো ভাস্কর্যের মুকুট উধাও, হয়তো কোনো তেলরঙের চোখ অদৃশ্য হয়ে গেছে। রং ফিরে গেছে তার উৎসে। জয়নুল আবেদিনের দুর্ভিক্ষের সব ছবি মুছে গেছে, জাদুঘরে মনপুরার স্ক্রল সাদা। কামরুল হাসানের মেয়েরা কেউ নেই। সফিউদ্দিন আহমদের সব আলোছায়া মুছে গেছে। মিরানা দৌড়ে গেল বসার ঘরে, বুকশেলফে। রবীন্দ্র-রচনাবলি নামিয়ে দেখে অক্ষরগুলো আছে কি না। আহ্, আছে। শুধু কালান্তর নেই। গীতাঞ্জলির কাছে যেতে যেতে মুছে সাদা। উল্টে দেখতে না দেখতেই সমস্ত অক্ষর বাণী অন্তর্হিত হলো। নজরুলের পাতা সাদা, জীবনানন্দের পাতা সাদা, ধূপধূসর বিভূতিভূষণ। মুছে গেল ভয়ের মতো সাদা হয়ে গেল কেন্তারো মিউরার আঁকা বারজার্কের পাতার পর পাতা। মিরানা উন্মাদিনী। ছুটছে ঘরে ঘরে। দেয়ালে পিকাসোর ‘আয়নার সামনে মেয়েটি’র অনুলিপি। ধীরে ধীরে মুছে গেল। তার চোখ ফেটে জল আসছে। মুছে গেল ভিঞ্চির মোনালিসার অনুলিপি। দূরে লুভরে মোনালিসার ক্যানভাসে বিকৃত আরেক ছবি ভেসে উঠেছে। এ তো কোনো দুঃস্বপ্ন নয়। যদি হতো! ধ্বংস বুঝি টের পেলে ত্বরান্বিত হয়? 

তিরানা জানালার পাশে দাঁড়িয়েছে। পাশে দাঁড়িয়ে তার হাত ধরেছে নিয়ন। এখান থেকে চিড়িয়াখানার রাস্তা দেখা যায়। বড় বড় মহিরুহ পথের দুপাশ ধরে উদ্ভিদ উদ্যানের দিকে চলে গেছে। দূরে চিড়িয়াখানার দেয়ালে জিরাফের ম্যুরালটা ধীরে মুছে গেল। কিন্তু আশপাশের লোকজনের কারও কোনো হেলদোল নেই। কেউ লক্ষই করেনি। কেউ কল্পনাই করেনি।

‘লক্ষ করেছ, নিয়ন?’

‘তিরানা। সাভারে স্মৃতিসৌধ সমান হয়ে গেছে। ঢাকায় শহীদ মিনারের কোনো চিহ্ন ছিল না। আমি এখানে আসার আগে। নৈরাজ্য আসছে তিরানা। ভয়াল ভূমিকম্পের মতো নৈরাজ্য।’

‘কিছু তো করার আছে নিশ্চয়ই।’ তিরানা কাঁদছে।

‘জল উবে গেলেও তার মেঘ হয়ে মাথার ওপর থাকে। মহাশূন্যে এখনো হারিয়ে যাচ্ছে না। কারণ, বায়ুমণ্ডল এখনো আছে, তার স্তরগুলো আছে। সব উবে যেত যদি মহাকর্ষ না থাকত। ওই মেঘ আবার নামবে। কারণ, মহাকর্ষ আছে। শিল্পীর মনে যদি সুন্দরের ইচ্ছা টিকে থাকে, ওটাই মহাকর্ষ। ওটা থাকলে শিল্পগুলো ফিরবে। অমরত্বের কাল আবার আসবে।’

‘তখন আর্গন কবিতা লিখবে আবার?’

‘ওর মনে সুন্দরের ইচ্ছা বলে কিছু যদি অবশিষ্ট থাকে। ও যদি বাঁচিয়ে রাখে।’

‘নিয়ন। আমাদের ভালোবাসা মুছে গিয়েছিল।’ 

‘আবার ফিরে এসেছে।’

‘মনের ভেতর কোথাও একটা অপেক্ষা, আকাঙ্ক্ষা, আশা বাঁচিয়ে রাখার কারণেই কি উবে গিয়েও বৃষ্টি হয়ে আবার নামল?’

‘প্রকৃতিকে ধন্যবাদ, না তিরানা? বুঝিয়ে দেওয়ার জন্য, আমরা পরস্পরের শিল্পকর্ম ছিলাম।’ 

স্থানকালের কীটাণু পথ ধরে মানুষ ও মর্মরের আত্মার আকর মাকারানার অশ্রু সময় ভেদ করে পেছনে চলেছে। এই কীটাণু পথ তিরানার পক্ষে কল্পনা করা অসম্ভব। চূণ, বিচূর্ণ, অপসৃত হয়ে উৎসের দিকে ছুটেছে স্বাধীনাত্মা প্রতিটি শিল্প। ভাষার জন্য ভবিষ্যৎ বেশি কঠিন? ভাষার শিল্পেরা ফিরে যাচ্ছে মহানিয়মের চিন্তায়। ভয়াল নৈরাজ্য আসছে। আসন্ন সেই পৃথিবীতে শিল্পকর্মের স্থান হবে না, শিল্পীরও নয়। তবু ভবিষ্যতের আশায়, ওরা যেন দূর্বার মতো টিকে থাকে, ‘সুন্দরের ইচ্ছা’ বাঁচিয়ে রেখে। পারবে না? 

মন্তব্য