বাঙালি মানসে ফেব্রুয়ারি মানেই প্রাণের মেলা, অমর একুশে বইমেলা। প্রতি বছরের ন্যায় এবারও সৃজনশীল সাহিত্যের এই মহোৎসবে যুক্ত হয়েছে অসংখ্য নতুন বই। তবে এবারের মেলায় দর্শনার্থী ও পাঠকদের জন্য বিশেষ এক চমক নিয়ে এসেছেন দেশের সুপরিচিত কণ্ঠশিল্পী ইভা আরমান। সঙ্গীতাঙ্গনে যিনি দীর্ঘকাল ধরে ‘ইভা রহমান’ নামে শ্রোতাদের হৃদয়ে স্থান করে নিয়েছেন, তিনি এবার আত্মপ্রকাশ করেছেন সম্পূর্ণ নতুন এক সত্তায়—কবি হিসেবে। তার প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘চিঠি’ প্রকাশিত হয়েছে এবারের বইমেলায়, যা ইতোমধ্যে কাব্যপ্রেমীদের মধ্যে বেশ কৌতূহল ও আগ্রহের সৃষ্টি করেছে।
কবিতার মোড়কে অপ্রকাশিত অনুভূতির আখ্যান
ইভা আরমানের ‘চিঠি’ কাব্যগ্রন্থটি কেবল কিছু শব্দের সমষ্টি নয়, বরং এটি মানুষের মনের গহীনে লুকিয়ে থাকা অব্যক্ত জমানো কথার এক সাহিত্যিক দলিল। বইটিতে মোট ৪৮টি কবিতা স্থান পেয়েছে। প্রতিটি কবিতাই যেন এক একটি কাল্পনিক বা বাস্তব চিঠি—কোনোটি প্রিয়জনের উদ্দেশ্যে লেখা, কোনোটি নিজের একাকীত্বের সাথে সংলাপ, আবার কোনোটি সময়ের পরিবর্তনের প্রতি এক গভীর দীর্ঘশ্বাস। ভালোবাসা, পাওয়া-না পাওয়ার বেদনা, স্মৃতির রোমন্থন, প্রিয় মানুষের জন্য দীর্ঘ প্রতীক্ষা এবং জীবনের সূক্ষ্ম টানাপোড়েনগুলো অত্যন্ত সহজ অথচ হূদয়স্পর্শী ভাষায় বইটির পাতায় পাতায় ফুটে উঠেছে।
বইটি সম্পর্কে অনুভূতি ব্যক্ত করতে গিয়ে ইভা আরমান বলেন, “আমাদের জীবনে এমন অনেক কথা থাকে যা আমরা সরাসরি মুখে বলতে পারি না, কিন্তু সেগুলো মনের কোণে জমা হয়ে থাকে। সেই জমে থাকা অব্যক্ত অনুভূতিগুলোরই একটি কাব্যিক বা সাহিত্যিক রূপ হলো এই ‘চিঠি’। প্রতিটি পাঠক এই কবিতার চরণে নিজের কোনো না কোনো সুপ্ত স্মৃতির ছোঁয়া খুঁজে পাবেন বলে আমার বিশ্বাস।”
পারিবারিক ঐতিহ্যে সাহিত্যের অনুপ্রেরণা
ইভা আরমানের এই সাহিত্যচর্চার ভিত্তি কেবল শখ নয়, বরং এর পেছনে রয়েছে গভীর পারিবারিক ঐতিহ্য। তার দাদা মোহাম্মদ ইব্রাহিম ছিলেন কলকাতার তৎকালীন সময়ের একজন সুপরিচিত লেখক। তার লেখা শিশুতোষ গ্রন্থ ‘ছড়াইতি’ (১৯৬৩) এবং ‘জলসা’ (১৯৬৮) শিশুসাহিত্যে বিশেষ স্থান দখল করে আছে। শৈশব থেকেই দাদার লেখালেখির পরিবেশ দেখে বড় হওয়া ইভার মনে অবচেতনেই সাহিত্যের প্রতি এক গভীর অনুরাগ তৈরি হয়েছিল। সঙ্গীতাঙ্গনে ব্যস্ততার মাঝেও সেই অনুরাগের বহিঃপ্রকাশ ঘটেছে এই কাব্যগ্রন্থের মাধ্যমে।
নিচে কণ্ঠশিল্পী ইভা আরমানের শিল্পযাত্রা ও পারিবারিক ঐতিহ্যের একটি সংক্ষিপ্ত রূপরেখা দেওয়া হলো:
| বিষয় | তথ্য ও বিবরণ |
| নতুন কাব্যগ্রন্থের নাম | চিঠি |
| কবিতার সংখ্যা | ৪৮টি |
| প্রকাশনী | অন্যপ্রকাশ (বইমেলা স্টল নং- ২০) |
| পারিবারিক অনুপ্রেরণা | দাদা মোহাম্মদ ইব্রাহিম (প্রখ্যাত লেখক) |
| সঙ্গীত জীবন শুরু | ২০০৪ সালে প্রথম একক অ্যালবাম প্রকাশের মাধ্যমে। |
| মোট অ্যালবাম সংখ্যা | ২৪টি একক অ্যালবাম। |
| উল্লেখযোগ্য স্বীকৃতি | কলকাতার সম্মানজনক ‘কলাকার’ অ্যাওয়ার্ড। |
সঙ্গীত থেকে সাহিত্যে পদার্পণ
২০০৪ সালে প্রথম একক অ্যালবাম প্রকাশের মধ্য দিয়ে সঙ্গীতাঙ্গনে ইভা রহমানের যাত্রা শুরু হয়েছিল। দীর্ঘ দুই দশকের এই পথচলায় তিনি মোট ২৪টি একক অ্যালবাম উপহার দিয়েছেন শ্রোতাদের। মেলোডিয়াস কণ্ঠ আর নান্দনিক গায়কীর জন্য তিনি দেশ-বিদেশে অসংখ্য সম্মাননা অর্জন করেছেন। যার মধ্যে কলকাতার অত্যন্ত মর্যাদাপূর্ণ ‘কলাকার’ অ্যাওয়ার্ড অন্যতম। গানের সুরের মূর্ছনা থেকে শব্দের বুননে এই রূপান্তর তার শৈল্পিক বৈচিত্র্যেরই বহিঃপ্রকাশ।
পাঠকদের জন্য প্রাপ্তিস্থান
অমর একুশে বইমেলায় সৃজনশীল প্রকাশনা সংস্থা ‘অন্যপ্রকাশ’-এর স্টলে ‘চিঠি’ বইটি পাওয়া যাচ্ছে। মেলার শুরু থেকেই দর্শনার্থীরা ইভার এই নতুন পরিচয়কে ইতিবাচকভাবে গ্রহণ করেছেন। অনেক পাঠকই স্টলে এসে বইটি সংগ্রহ করছেন এবং লেখকের সাথে মতবিনিময় করছেন। সুরের জাদুকরী প্রভাব ছাপিয়ে ইভার কবিতার ভাষা পাঠকদের হৃদয়ে কতটা স্থায়ী আসন করে নিতে পারে, এখন সেটিই দেখার বিষয়। কাব্যগ্রন্থটি উৎসর্গ করা হয়েছে জীবনের সেই সব মুহূর্তকে, যা মানুষকে নীরব ভাষায় কথা বলতে শেখায়।



