খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: বুধবার, ১৭ জুন ২০২৬
দক্ষিণ আফ্রিকার বিশ্ববরেণ্য জ্যাজ সুরকার, গীতিকার ও পিয়ানোবাদক আবদুল্লাহ ইব্রাহিম আর নেই। দীর্ঘ ও বর্ণাঢ্য সংগীত ক্যারিয়ারে ৭০টিরও বেশি অ্যালবাম রেকর্ড করা এই গুণী সংগীতশিল্পী কিছুদিন অসুস্থ থাকার পর জার্মানিতে শেষনিঃশ্বাস ত্যাগ করেছেন। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল ৯১ বছর। গত সোমবার (১৫ জুন) তাঁর পরিবারের পক্ষ থেকে দেওয়া একটি আনুষ্ঠানিক বিবৃতির মাধ্যমে বিশ্বসংগীতের এই নক্ষত্রের মৃত্যুর খবরটি নিশ্চিত করা হয়।
আবদুল্লাহ ইব্রাহিমের জীবনসঙ্গী ড. মেরিনা উমারি তাঁর মৃত্যুর বিষয়ে একটি শোকবার্তা প্রকাশ করেছেন। তিনি লিখেছেন, ‘দক্ষিণ আফ্রিকা এবং এর মানুষকে নিজের হৃদয়ে ধারণ করে আবদুল্লাহ অত্যন্ত শান্তিপূর্ণভাবে বিদায় নিয়েছেন। তিনি পৃথিবীর যেখানেই অবস্থান করুন না কেন, নিজের মাতৃভূমির প্রতি তাঁর ভালোবাসা ও টান কখনো ম্লান হয়নি।’ দীর্ঘকাল প্রবাসে কাটালেও তিনি সবসময় নিজের আফ্রিকান শিকড়কে সংগীতের মাধ্যমে বিশ্বদরবারে তুলে ধরেছেন।
দক্ষিণ আফ্রিকার কেপটাউনে ‘অ্যাডলফ জোহানেস ব্র্যান্ড’ নামে জন্ম নেওয়া এই সংগীতশিল্পী অত্যন্ত অল্প বয়স থেকেই সংগীতচর্চা শুরু করেন। তিনি নিজেই এক সাক্ষাৎকারে জানিয়েছিলেন, মাত্র সাত বছর বয়স থেকেই তিনি সুর সৃষ্টির কাজে হাত দেন। তবে পেশাদার সংগীতশিল্পী হিসেবে তাঁর আনুষ্ঠানিক অভিষেক ঘটে ১৫ বছর বয়সে।
১৯৫০-এর দশকে স্থানীয় জ্যাজ অঙ্গনে তিনি ‘ডলার ব্র্যান্ড’ নামে বেশ পরিচিত ও সমাদৃত হয়ে ওঠেন। পরবর্তীতে ১৯৬০ সালে তিনি ‘দ্য জ্যাজ এপিসেলস’ ব্যান্ডের সঙ্গে যুক্ত হন এবং একটি ঐতিহাসিক অ্যালবাম রেকর্ড করেন। তাদের তৈরি ‘জ্যাজ এপিসেল ভার্স ওয়ান’ অ্যালবামটি ছিল কৃষ্ণাঙ্গ দক্ষিণ আফ্রিকান সংগীতশিল্পীদের দ্বারা রেকর্ডকৃত ইতিহাসের প্রথম পূর্ণদৈর্ঘ্য জ্যাজ এলপি (LP)। যদিও তাদের সংগীত সরাসরি রাজনৈতিক বার্তা বহন করত না, তবুও তৎকালীন দক্ষিণ আফ্রিকার বর্ণবাদী শ্বেতাঙ্গ সরকারের রোষানল থেকে এই ব্যান্ডটি রেহাই পায়নি।
রাজনৈতিক ও বর্ণবাদী বৈষম্যের কারণে ১৯৬০-এর দশকে ইব্রাহিম ইউরোপে পাড়ি জমান। সেখানে তাঁর অসাধারণ পিয়ানো বাজানোর শৈলী আমেরিকান জ্যাজ কিংবদন্তি ডিউক এলিংটনের নজরে পড়ে। এলিংটন তাঁর প্রতিভা দেখে মুগ্ধ হন এবং তাঁকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে নিয়ে যান। পরবর্তীতে জ্যাজ ছন্দের সঙ্গে দক্ষিণ আফ্রিকার ঐতিহ্যবাহী লোকজ সুরের এক অপূর্ব মিশ্রণ ঘটিয়ে ইব্রাহিম বিশ্বসংগীতে এক অনন্য নিজস্ব ধারা তৈরি করেন, যা তাঁকে বিশ্বব্যাপী পরিচিতি এনে দেয়।
১৯৭৪ সালে মুক্তি পায় তাঁর বিখ্যাত ট্র্যাক ‘ম্যানেনবার্গ’। এই সুরটি দক্ষিণ আফ্রিকায় শ্বেতাঙ্গ বর্ণবাদী শাসনের বিরুদ্ধে অধিকার আদায়ের সংগ্রামের একটি অন্যতম প্রতীকী গানে পরিণত হয়েছিল।
সংগীতের পাশাপাশি ইব্রাহিম বেশ কিছু আন্তর্জাতিক সিনেমার ব্যাকগ্রাউন্ড স্কোরের (আবহ সংগীত) কাজও করেছেন। এর মধ্যে ফরাসি চলচ্চিত্র নির্মাতা ক্লেয়ার ডেনিসের বিখ্যাত ড্রামা ফিল্ম ‘নো ফিয়ার, নো ডাই’ এবং ‘চকোলেট’-এর আবহ সংগীত উল্লেখযোগ্য।
দক্ষিণ আফ্রিকার বাইরে বসবাস করলেও আবদুল্লাহ ইব্রাহিম কখনোই নিজের জন্মভূমিকে ভোলেননি। সুযোগ পেলেই তিনি দেশে ফিরে কনসার্ট করতেন। মৃত্যুর মাত্র তিন মাস আগেও তিনি কেপটাউন আন্তর্জাতিক জ্যাজ উৎসবে অংশ নিয়েছিলেন, যা ছিল তাঁর জীবনের শেষ লাইভ পারফরম্যান্স বা মঞ্চ পরিবেশনা।
নিচে দক্ষিণ আফ্রিকান এই মহাতারকার জীবন, সংগীত ও বিভিন্ন অর্জনের তথ্য একটি সারণীর মাধ্যমে উপস্থাপন করা হলো:
| বিষয়ের বিবরণ | তথ্য ও পরিসংখ্যান |
| নাম (জন্ম নাম) | আবদুল্লাহ ইব্রাহিম (অ্যাডলফ জোহানেস ব্র্যান্ড) |
| জন্মস্থান ও বয়স | কেপটাউন, দক্ষিণ আফ্রিকা; ৯১ বছর |
| মৃত্যুর স্থান ও তারিখ | জার্মানি; ১৫ জুন (পরিবার কর্তৃক নিশ্চিতকৃত) |
| পেশাদার অভিষেক | ১৫ বছর বয়সে (সুর করা শুরু করেন ৭ বছর বয়সে) |
| মোট অ্যালবামের সংখ্যা | ৭০টিরও বেশি পূর্ণদৈর্ঘ্য অ্যালবাম |
| ঐতিহাসিক অবদান | ‘জ্যাজ এপিসেল ভার্স ওয়ান’ (কৃষ্ণাঙ্গ আফ্রিকানদের প্রথম জ্যাজ এলপি) |
| বিখ্যাত রাজনৈতিক ট্র্যাক | ‘ম্যানেনবার্গ’ (বর্ণবাদ বিরোধী সংগ্রামের প্রতীক, ১৯৭৪) |
| সিনেমার আবহ সংগীত | ‘নো ফিয়ার, নো ডাই’ এবং ‘চকোলেট’ (পরিচালক: ক্লেয়ার ডেনিস) |
| উল্লেখযোগ্য পুরস্কার | ‘জার্মান জাজ ট্রফি’ এবং দক্ষিণ আফ্রিকান মিউজিক লাইফটাইম অ্যাচিভমেন্ট অ্যাওয়ার্ড |
| সর্বশেষ মঞ্চ পরিবেশনা | মৃত্যুর তিন মাস আগে কেপটাউন আন্তর্জাতিক জ্যাজ উৎসবে |
নিজের দীর্ঘ ও সফল ক্যারিয়ারে আবদুল্লাহ ইব্রাহিম অসংখ্য জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পুরস্কারে ভূষিত হয়েছেন। তাঁর ঝুলিতে রয়েছে বিখ্যাত ‘জার্মান জাজ ট্রফি’ এবং দক্ষিণ আফ্রিকান মিউজিক লাইফটাইম অ্যাচিভমেন্ট অ্যাওয়ার্ডের মতো সম্মাননা। তাঁর প্রয়াণে বিশ্ব জ্যাজ সংগীতের একটি ঐতিহাসিক অধ্যায়ের অবসান ঘটল।