খবরওয়ালা অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশ: বুধবার, ২৬ নভেম্বর ২০২৫
চট্টগ্রামে নির্বাচনি প্রচারের সময় বিএনপি মনোনীত এমপি প্রার্থী এরশাদ উল্লাহসহ কয়েক জন গুলিবিদ্ধ হন। একজন নিহতও হন। রাজধানীর পুরান ঢাকায় দিনের বেলা তারিক সাইফ মামুন নামে একজনকে গুলি করে হত্যা করা হয়। এর আগে মুন্সীগঞ্জ সদর উপজেলার চরাঞ্চলে বিএনপির দুই পক্ষের বিরোধে এক সপ্তাহের ব্যবধানে দুইজনকে গুলি করে হত্যা করা হয়। দেশের বিভিন্ন জেলায়ও সংঘটিত হচ্ছে অস্ত্রবাজি ও গুলির ঘটনা।
অবৈধ অস্ত্র নিয়ন্ত্রণ বর্তমানে বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিশেষ করে আসন্ন জাতীয় নির্বাচনকে সামনে রেখে সহিংসতা ও অস্থিতিশীলতার আশঙ্কা বাড়ছে। এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনী সীমান্ত দিয়ে অস্ত্র প্রবেশ রোধ, অতীতে লুট হওয়া অস্ত্র উদ্ধার এবং অপরাধী চক্র দমনে জোর দিচ্ছে।
পুলিশের অতিরিক্ত মহাপরিদর্শক খন্দকার রফিকুল ইসলাম গণমাধ্যমকে জানান, অবৈধ আগ্নেয়াস্ত্র নিয়ন্ত্রণ এখন বড় চ্যালেঞ্জ এবং আইনশৃঙ্খলার জন্য হুমকিও। তিনি বলেন, এখন আর ঘোষণা নয়—সব ইউনিটকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে ভেতরে ভেতরে অভিযান চালিয়ে অস্ত্র উদ্ধার করতে, কারণ পুরস্কার ঘোষণা করেও কোনো ফল আসেনি। কেউ অস্ত্রধারীকে ধরিয়ে দেয়নি।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, নির্বাচনকে ঘিরে অবৈধ অস্ত্রের ব্যবহার বাড়তে পারে, যা নির্বাচনি পরিবেশ অস্থিতিশীল করবে। বড় অংশের অস্ত্র সীমান্তপথে দেশে ঢোকে, যা নিয়ন্ত্রণ কঠিন। পাশাপাশি থানাসহ বিভিন্ন জায়গা থেকে লুট হওয়া বহু অস্ত্র এখনো অপরাধীদের হাতে, যা অপরাধে ব্যবহার হচ্ছে। এসব অস্ত্র উদ্ধার এখন বড় চ্যালেঞ্জ।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এবং যৌথবাহিনী নিয়মিত অভিযান চালাচ্ছে অস্ত্র উদ্ধারের জন্য। সীমান্তে অস্ত্র অনুপ্রবেশ ঠেকাতেও ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। নির্বাচন কমিশনও অবৈধ অস্ত্র নিয়ন্ত্রণসহ চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সঙ্গে বৈঠক করছে।
চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশ (সিএমপি) জানুয়ারি থেকে সেপ্টেম্বর—৯ মাসে ১১২ জন অস্ত্রধারী সন্ত্রাসীকে গ্রেপ্তার করেছে। ভোলাসহ উপকূলীয় এলাকায় গত ছয় মাসে অভিযান চালিয়ে ৭০ জন সন্ত্রাসী ও ৬১ জন দুষ্কৃতকারীকে আটক করা হয়, যাদের কাছ থেকে উদ্ধার হয় ৩৪টি আগ্নেয়াস্ত্র। সম্প্রতি চট্টগ্রাম জেলার রাউজান থেকে পাঁচজন অস্ত্রধারীকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
পল্লবী এলাকার যুবদল নেতা গোলাম কিবরিয়া হত্যা মামলায়ও কয়েকজন অস্ত্রধারীকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে—দুজনকে সাভার ও টঙ্গী থেকে, আরেকজনকে স্থানীয়দের সহায়তায় আটক করা হয়।
অপরাধ বিশ্লেষকদের মতে, এখনই অবৈধ অস্ত্র নিয়ন্ত্রণ না হলে নির্বাচনের আগে এর ব্যবহার আরও বাড়বে, যা ভোট প্রক্রিয়ায় প্রভাব ফেলতে পারে। পুলিশ বলছে, আগের তুলনায় অপরাধ কমেছে, তবে আগ্নেয়াস্ত্রের ব্যবহার এখনো নিয়মিত দেখা যাচ্ছে।
গত বছরের ৫ আগস্টের পর লুট হওয়া, জমা না দেওয়া ও অবৈধ আগ্নেয়াস্ত্রের বিরুদ্ধে অভিযান চলছে। সরকার সম্প্রতি ঘোষণাও দিয়েছে—লুট হওয়া পুলিশের এলএমজি উদ্ধার করলে ৫ লাখ টাকা, এসএমজির জন্য দেড় লাখ টাকা, চায়না রাইফেলের জন্য ১ লাখ টাকা, পিস্তল ও শটগানের জন্য ৫০ হাজার টাকা পুরস্কার। প্রতি রাউন্ড গুলির জন্য পুরস্কার ৫০০ টাকা।
তবে পুলিশের একটি সূত্র জানায়, একবার অস্ত্র হাতছাড়া হলে তা উদ্ধার কঠিন। শীর্ষ সন্ত্রাসীরা এসব অস্ত্র কেনাবেচা করে। গত বছর অভ্যুত্থানের সময় লুট হওয়া বিপুলসংখ্যক অস্ত্র ও গোলাবারুদ এখনো উদ্ধার হয়নি। সর্বশেষ তথ্যে দেখা যায়, এখনো ১ হাজার ৩৪২টি আগ্নেয়াস্ত্র ও ২ লাখ ৫৭ হাজার ২৮৭ রাউন্ড গোলাবারুদ বেহাত রয়েছে।
পুলিশ সদর দপ্তর জানিয়েছে, অভ্যুত্থানের সময় ৬৬৪টি থানার মধ্যে ৪৬০ থানা ও ১১৪টি ফাঁড়িতে হামলা ও অগ্নিসংযোগ করে লুট করা হয় ৫ হাজার ৭৫৩টি অস্ত্র এবং ৬ লাখ ৫১ হাজার আটটি গোলাবারুদ।
ঢাকা ও চট্টগ্রামের সাম্প্রতিক খুন ও বড় ছিনতাইয়ের ঘটনাগুলোতে এসব লুট হওয়া অস্ত্র ব্যবহারের তথ্য রয়েছে গোয়েন্দাদের কাছে। কিন্তু যথাযথ অভিযান না চালানোয় অপরাধীদের মনোবল বেড়েছে এবং সাধারণ মানুষের নিরাপত্তাহীনতা বাড়ছে।
পূর্বতন আইজিপি মোহাম্মদ নুরুল হুদা গণমাধ্যমকে বলেন, লুট হওয়া অস্ত্র নির্বাচনকে প্রভাবিত করতে পারে। এসব অস্ত্র পড়ে থাকে না—একাধিক হাত বদল হয়ে সন্ত্রাসীদের কাছে গেছে। এখনো সময় আছে, এসব অস্ত্র উদ্ধার করতে হবে, না হলে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হতে পারে।
নারায়ণগঞ্জের পরিস্থিতি
নারায়ণগঞ্জ প্রতিনিধি এম এ খান মিঠু জানান, গত বছর বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনে বিভিন্ন থানায় লুট হওয়া অস্ত্র উদ্ধারে জেলা পুলিশের ঘোষণা কার্যকর হয়নি। ১০ নভেম্বর পুরস্কার ঘোষণা করা হলেও ১৫ দিনেও কোনো অস্ত্র উদ্ধার হয়নি। গত বছরের আন্দোলনে জেলার বিভিন্ন থানা থেকে ৪১টি অস্ত্র খোয়া যায়।
নির্বাচনের আগে এসব লুণ্ঠিত অস্ত্র উদ্ধার না হলে প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে ব্যবহারের ঝুঁকি থেকেই যাচ্ছে। ইতিমধ্যে নারায়ণগঞ্জে একাধিক ঘটনায় অবৈধ অস্ত্র প্রদর্শন ও গুলিবর্ষণ ঘটলেও কোনো অস্ত্র উদ্ধার বা অস্ত্রধারীর গ্রেপ্তার সম্ভব হয়নি, যা জনমনে উদ্বেগ বাড়াচ্ছে।
গত ৬ মার্চ সিদ্ধিরগঞ্জের আদমজী এলাকায় আধিপত্য বিস্তার ও ইপিজেডের ঝুট ব্যবসা দখলকে কেন্দ্র করে বিএনপির দুই পক্ষের সংঘর্ষে গুলিবর্ষণ হয়। অস্ত্র হাতে এক সন্ত্রাসীর ছবি গণমাধ্যমে প্রকাশিত হলেও এখনো তাকে গ্রেপ্তার করা যায়নি। চলতি মাসে শহরের বিভিন্ন এলাকায় চারটি গুলিবর্ষণের ঘটনায় একজন গৃহবধূ গুলিবিদ্ধ হন।
অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (অপরাধ ও অপারেশন) তরিক আল মেহেদী জানিয়েছেন, নির্বাচনকে ঘিরে অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার ও নজরদারি আরও বাড়ানো হবে। তিনি বলেন, পুলিশ, র্যাব, সেনাবাহিনীসহ সব বাহিনী যৌথভাবে কাজ করছে এবং সব পরিস্থিতি মোকাবিলায় প্রস্তুত।
খবরওয়ালা/টিএসএন