খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: মঙ্গলবার, ৯ জুন ২০২৬
বিশ্ব ফুটবলের সবচেয়ে মর্যাদাপূর্ণ আসরকে কেন্দ্র করে বিশ্বজুড়ে ফুটবল সমর্থকদের উন্মাদনা ও উত্তেজনা সবসময়ই তুঙ্গে থাকে। বিশ্বকাপ ফুটবলের সুদীর্ঘ ইতিহাসে এমন কিছু স্মরণীয় অধ্যায় রয়েছে, যা চিরকাল ফুটবলপ্রেমীদের মনে দাগ কেটে থাকবে। তেমনই এক অবিস্মরণীয় মুহূর্ত তৈরি হয়েছিল ১৯৯৮ সালের বিশ্বকাপ ফাইনালে, যেখানে ফরাসি কিংবদন্তি ফুটবলার জিনেদিন জিদানের দুর্দান্ত ও জাদুকরী পারফরম্যান্স ফ্রান্সকে তাদের ফুটবল ইতিহাসের প্রথম বিশ্বকাপ শিরোপা এনে দিয়েছিল। সেই ফাইনালে জিদান এমন একটি অনন্য কীর্তি গড়েছিলেন, যা আজ পর্যন্ত ফুটবল বিশ্বের আর কোনো খেলোয়াড় ভাঙতে পারেননি।
১৯৯৮ সালের বিশ্বকাপ ফাইনাল ম্যাচটি অনুষ্ঠিত হয়েছিল ফ্রান্সের ঐতিহ্যবাহী স্টেডিয়াম ‘স্টাড দে ফ্রান্স’-এ। শিরোপা নির্ধারণী সেই মহরণটিতে স্বাগতিক ফ্রান্স মুখোমুখি হয়েছিল তৎকালীন বিশ্বচ্যাম্পিয়ন এবং টুর্নামেন্টের অন্যতম ফেবারিট দল ব্রাজিলের। ম্যাচটিতে মধ্যমাঠের চাণক্য জিনেদিন জিদান নিজের স্বাভাবিক ভূমিকার বাইরে গিয়ে সম্পূর্ণ ভিন্নভাবে আলো ছড়িয়েছিলেন, বিশেষ করে আকাশপথে বা শূন্যে বল দখলের লড়াইয়ে।
খেলার প্রথমার্ধেই জিদান দুটি কর্নার কিক থেকে অসাধারণ হেডের সাহায্যে গোল করে ব্রাজিলের শক্তিশালী রক্ষণভাগকে সম্পূর্ণ ভেঙে দেন। ম্যাচের প্রথম গোলটি আসে ইউরি জোরকায়েফের নেওয়া কর্নার কিক থেকে এবং দ্বিতীয় গোলটি আসে ইমানুয়েল পেতির কর্নার থেকে। মাত্র ২০ মিনিটের ব্যবধানে দুটি শক্তিশালী হেডে গোল করে তিনি ফ্রান্সকে চালকের আসনে বসিয়ে দেন। শেষ পর্যন্ত ম্যাচটিতে ফ্রান্স ৩-০ ব্যবধানে ব্রাজিলকে পরাজিত করে প্রথমবারের মতো বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হওয়ার গৌরব অর্জন করে। বিশ্বকাপ ফাইনালের ইতিহাসে একক কোনো ম্যাচে হেড থেকে জোড়া গোল করার এই কীর্তি আজও একমাত্র জিদানের দখলেই রয়েছে।
একটি আকর্ষণীয় পরিসংখ্যান পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, ১৯৯৮ সালের ফাইনালে জিদান একাকী হেড থেকে যে দুটি গোল করেছিলেন, পরবর্তী তিনটি বিশ্বকাপ আসর (২০০২, ২০০৬ ও ২০১০) মিলিয়েও সমগ্র ফ্রান্স দল যৌথভাবে হেডে ততগুলো গোল করতে পারেনি। ১৯৯৮ সালের ফাইনালের পর থেকে পরবর্তী দীর্ঘ সময়ে বৈশ্বিক এই আসরে ফ্রান্সের পক্ষে একমাত্র হেডের গোলটি এসেছিল ২০০৬ বিশ্বকাপে। সেবার স্পেনের বিপক্ষে নকআউট পর্বের ম্যাচে ফরাসি মিডফিল্ডার পাত্রিক ভিয়েরা একটি হেডে গোল করেছিলেন।
আন্তর্জাতিক ফুটবলে জিনেদিন জিদান কেবল ব্রাজিলের বিপক্ষেই নিজের হেডিং দক্ষতার প্রমাণ দেননি। ফ্রান্স জাতীয় দলের হয়ে তিনি চেক প্রজাতন্ত্র, মাল্টা এবং সুইজারল্যান্ডের বিপক্ষেও হেড থেকে গুরুত্বপূর্ণ গোল করেছিলেন। এছাড়া ২০০৬ সালের বিশ্বকাপ ফাইনালে ইতালির বিপক্ষে অতিরিক্ত সময়ে তার একটি শক্তিশালী হেড ইতালীয় গোলরক্ষক জিয়ানলুইজি বুফনের অসাধারণ ও অবিশ্বাস্য এক সেভে আটকে যায়। তা না হলে ফুটবল ইতিহাসের পাতায় হেডের রেকর্ডটি আরও সমৃদ্ধ হতে পারত।
বিশ্বকাপের ফাইনালে একাধিকবার হেড থেকে গোল করার কৃতিত্ব ফুটবল সম্রাট পেলেরও রয়েছে। তবে পেলের এই কীর্তি এবং জিদানের রেকর্ডের মধ্যে একটি সুনির্দিষ্ট কাঠামোগত পার্থক্য রয়েছে, যা নিচে টেবিলের মাধ্যমে স্পষ্ট করা হলো:
| খেলোয়াড়ের নাম | দেশের নাম | সংশ্লিষ্ট বিশ্বকাপ ও প্রতিপক্ষ | হেডের সংখ্যা ও ধরন | রেকর্ডের ধরন |
| জিনেদিন জিদান | ফ্রান্স | ১৯৯৮ (বনাম ব্রাজিল) | ২ট গোল (একই ম্যাচে) | একক কোনো বিশ্বকাপ ফাইনালে হেড থেকে জোড়া গোল করার একমাত্র কীর্তি। |
| পেলে | ব্রাজিল | ১৯৫৮ (বনাম সুইডেন) ও ১৯৭০ (বনাম ইতালি) | ২ট গোল (ভিন্ন ভিন্ন ফাইনালে) | দুটি ভিন্ন বিশ্বকাপ ফাইনালে হেড থেকে গোল করার অনন্য রেকর্ড। |
ফুটবল বিশ্বে বহু বছর ধরে অনেক কিংবদন্তি স্ট্রাইকার ও ফরোয়ার্ডের আগমন ঘটেছে, যারা হেডিংয়ের জন্য বিশেষভাবে সমাদৃত। কিন্তু জিনেদিন জিদান একজন প্রথাগত মিডফিল্ডার বা প্লে-মেকার হওয়া সত্ত্বেও ফাইনালের মতো বড় মঞ্চে যেভাবে হেডের মাধ্যমে জোড়া গোল করেছিলেন, তা ফুটবল ইতিহাসবিদদের কাছে আজও বিস্ময়ের উৎস। নতুন আরেকটি বিশ্বকাপ আসর যখন সমাগত এবং দলগুলোর প্রস্তুতি ও সমর্থকদের প্রত্যাশা যখন সর্বোচ্চ পর্যায়ে, তখন ১৯৯৮ সালের সেই ঐতিহাসিক ফাইনাল এবং জিদানের অক্ষুণ্ণ এই বিশ্বরেকর্ডটি ফুটবল মহলে পুনরায় আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে ফিরে এসেছে। দীর্ঘ দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে অমলিন থাকা এই রেকর্ডটি আগামী দিনে কেউ ভাঙতে পারে কি না, সেটিই এখন দেখার বিষয়।