খবরওয়ালা অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশ: বৃহস্পতিবার, ১১ ডিসেম্বর ২০২৫
সমরেশ বসু বাংলা সাহিত্যের এক অনন্য, প্রথাভাঙা এবং শক্তিশালী লেখক। তাঁর জীবন, সমাজসচেতনতা, শ্রমিকরাজনীতি, ভ্রমণ এবং মানুষের অন্তর্গত আবেগের মিশ্রণে তাঁর লেখা পেয়েছে গভীরতা এবং বাস্তবতার স্পন্দন। ১৯৪৩ থেকে ১৯৪৯ সাল পর্যন্ত তিনি ইছাপুর রাইফেল ফ্যাক্টরিতে কাজ করতেন। তখনই তিনি ট্রেড ইউনিয়ন আন্দোলন এবং ভারতের কমিউনিস্ট পার্টির সঙ্গে যুক্ত হন। এই রাজনৈতিক সক্রিয়তার কারণে ১৯৪৯-৫০ সালে তাঁকে কারাবরণ করতে হয়। তবে সেই কারাবাসই বাংলা সাহিত্যের জন্য এক আশীর্বাদ। কারাগারের নীরবতা ও অন্ধকারের মধ্যে তিনি রচনা করেন তাঁর প্রথম উপন্যাস ‘উত্তরঙ্গ’। মুক্তির পরই কলম হয়ে ওঠে তাঁর জীবিকার প্রধান অবলম্বন।
সমরেশ বসুর জন্ম ১৯২৪ সালের ১১ ডিসেম্বর কলকাতায়। শৈশব কেটেছে বাংলাদেশের বিক্রমপুরে, এবং কৈশোর কেটেছে নৈহাটির অলি-গলিতে। দারিদ্র্য, সংগ্রাম এবং শ্রমজীবী মানুষের সঙ্গে মিশে যাওয়া তাঁর চেতনাকে গড়ে তোলে। জীবিকার তাগিদে একসময় মাথায় ঝুড়ি নিয়ে ডিম বেচে বেড়ানো সেই ছেলেটিই পরবর্তীকালে হয়ে ওঠেন বাংলা সাহিত্যের অমর কথাশিল্পী।
সমরেশ বসু ছিলেন অভিজ্ঞতা-নির্ভর রচনার জাদুকর। শ্রমজীবী মানুষের জীবন, রাজনৈতিক আন্দোলনের অভ্যন্তর, যৌনতা এবং সমাজের বহুমাত্রিক টানাপোড়েন—সবই তিনি লিখেছেন সাহসী ও শিল্পসম্মত ভাষায়। তাঁর দুটি ছদ্মনাম ছিল—কালকূট ও ভ্রমর। ‘কালকূট’ ছদ্মনামে তিনি লিখেছেন বহু বিখ্যাত উপন্যাস, যেমন—অমৃত কুম্ভের সন্ধানে, কোথায় পাব তারে, অমৃত বিষের পাত্রে, মন মেরামতের আশায়, এবং তুষার-শৃঙ্গের পদতলে। এই উপন্যাসগুলোতে জীবনের দুঃখ, যন্ত্রণা এবং সত্যের সন্ধানকে তুলে ধরা হয়েছে অদ্বিতীয় শিল্পমাধ্যমে। ‘কালকূট’-এর অগ্নিমধ্যে তিনি যেন নিজেকেই ঢেলে দিয়েছেন, তাই তাঁর লেখা হয়ে ওঠে তীব্র, রূক্ষ, অথচ গভীরভাবে মানবিক। ১৯৮০ সালে ছদ্মনামে রচিত রচনার জন্য তিনি সাহিত্য একাডেমি পুরস্কার লাভ করেন।
শিশুসাহিত্যে তাঁর সৃষ্টি ‘গোগোল’ রহস্যপ্রিয়, কৌতূহলময়, এবং দুঃসাহসী এক বালক চরিত্র হিসেবে আজও বাংলা পাঠকের প্রিয়। সমরেশ বসুর রচনা সংখ্যা ছিল বিপুল—গল্পের সংখ্যা ২০০-এরও বেশি, এবং উপন্যাস ১০০-এরও বেশি। এই বিশাল সৃষ্টিসমূহের মধ্যে বাংলা সাহিত্যের প্রায় সব ধারাই নতুন রূপে ধরা দিয়েছে।
১৯৮৮ সালের ১২ মার্চ, বাংলা সাহিত্য এক মহান সাহিত্যিককে হারায়। তবে সমরেশ বসুর লেখা আজও পাঠকের হৃদয়ে সজীব। শ্রমিকের ঘামে, পথিকের ধুলায়, মানুষের আবেগে এবং জীবনের তীব্র সত্যে তিনি আজও বেঁচে আছেন। তাঁর সাহিত্যকর্ম বাংলা সাহিত্যের অমর রত্ন হিসেবে চিরকালই জীবন্ত থাকবে।