খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: শুক্রবার, ২০ ফেব্রুয়ারি ২০২৬
আফগানিস্তানে তালেবান সরকারের নতুন দণ্ডবিধি প্রকাশের পর দেশজুড়ে তীব্র উদ্বেগ ও আন্তর্জাতিক সমালোচনা দেখা দিয়েছে। সম্প্রতি ৯০ পৃষ্ঠার “দে মাহাকুমু জাজাই উসুলনামা” শীর্ষক এই আইন তালেবান নেত্রী হিবাতুল্লাহ আখুন্দজাদা স্বাক্ষরিতভাবে অনুমোদন করেছেন এবং দেশের সব আদালতে বিতরণ করা হয়েছে। ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম দি ইনডিপেনডেন্ট এই নতুন দণ্ডবিধি বিশ্লেষণ করে জানায়, এতে নারী অধিকার এবং বিচারপ্রাপ্তির সুযোগ মারাত্মকভাবে সংকুচিত হয়েছে।
বিশেষত স্বামী বিরোধী শারীরিক নির্যাতনের অভিযোগ দায়ের করতে নারীদের স্বামীর অনুমতি নিতে হবে—এটি নতুন আইনে যুক্ত করা গুরুত্বপূর্ণ ধারা হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। মানবাধিকারকর্মীরা অভিযোগ করেছেন, এতে পরিবারিক সহিংসতা কার্যত প্রাতিষ্ঠানিক স্বীকৃতি পেয়েছে।
নতুন আইন অনুযায়ী সমাজকে চারটি স্তরে ভাগ করা হয়েছে এবং শাস্তির ধরন অপরাধীর সামাজিক মর্যাদার ওপর নির্ভর করছে।
| সমাজের স্তর | উদাহরণ | অপরাধের ক্ষেত্রে শাস্তি |
|---|---|---|
| শীর্ষ স্তর | ধর্মীয় নেতা/মোল্লা | পরামর্শ বা নসিহত |
| দ্বিতীয় স্তর | অভিজাত শ্রেণি | পরামর্শ ও আদালতে তলব |
| তৃতীয় স্তর | মধ্যবিত্ত | সর্বোচ্চ কারাদণ্ড |
| চতুর্থ স্তর | নিম্নবিত্ত/শ্রমজীবী | কারাদণ্ড + শারীরিক বা বেত্রাঘাত |
আইন অনুযায়ী, স্বামী চাইলে তার স্ত্রীকে “বিবেচনামূলক শাস্তি” হিসেবে মারধর করতে পারবেন। এর ফলে নারী ও ক্রীতদাসদের অবস্থান প্রায় সমান সারিতে রাখা হয়েছে বলে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলো অভিযোগ তুলেছে।
আগের ন্যাটো সমর্থিত সরকারের সময়ে নারী নির্যাতনের জন্য তিন মাস থেকে এক বছরের কারাদণ্ড ছিল। কিন্তু নতুন আইন অনুযায়ী, প্রমাণিত মারাত্মক নির্যাতনের ক্ষেত্রে স্বামী সর্বোচ্চ ১৫ দিনের জেল পাবেন। তবে অভিযোগ দায়ের করা অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়েছে। নারীকে বিচারকের সামনে নিজের ক্ষতস্থান প্রদর্শন করতে হবে, সেই সঙ্গে কঠোর পর্দা বজায় রাখতে হবে—যা বাস্তবে প্রায় অসম্ভব।
এছাড়া, আদালতে অভিযোগ করার জন্য নারীকে স্বামী বা অন্য পুরুষ মাহরাম সঙ্গে নিয়ে যেতে হবে। কিন্তু প্রায়শই অভিযুক্ত স্বামীই মূল দোষী। ফলে নারীর জন্য অভিযোগের পথ কার্যত বন্ধ হয়ে গেছে। কাবুলের এক আইনজীবী জানিয়েছেন, এক নারী জেলখানায় স্বামীকে দেখতে গেলে তালেবান প্রহরীর হাতে লাঞ্ছিত হন, এবং বিচার চাইতে গিয়ে মাহরামের অনুপস্থিতির কারণে তাকে বাধ্য করা হয় নীরব থাকার জন্য।
নতুন দণ্ডবিধির ৩৪ নম্বর ধারা অনুযায়ী, স্বামীর অনুমতি ছাড়া যদি কোনো নারী বারবার বাবার বাড়ি বা আত্মীয়ের বাসায় যান, তবে তাকে এবং আশ্রয়দাতা পরিবারকে তিন মাসের কারাদণ্ড দেওয়া হবে। এতে নির্যাতিত নারীরা নিরাপদ আশ্রয় নিতেও বাধাপ্রাপ্ত হচ্ছেন।
মানবাধিকার সংগঠনগুলো সতর্ক করেছেন, এই দণ্ডবিধি নিয়ে সমালোচনা করাকেও অপরাধ হিসেবে গণ্য করা হয়েছে, যার ফলে দেশজুড়ে কেউ নাম প্রকাশ করে কথা বলার সাহস পাচ্ছেন না। আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকরা বলছেন, এ আইন নারীর স্বাধীনতা ও মৌলিক অধিকার চরমভাবে হ্রাস করছে এবং আফগান সমাজে ন্যায়বিচারের পথে বড় ধরণের বাধা সৃষ্টি করেছে।