খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: রবিবার, ৩ মে ২০২৬
পরিবেশবান্ধব পরিবহন ব্যবস্থাকে উৎসাহিত করতে এবং জ্বালানি সাশ্রয়ী যান আমদানিতে বিশেষ প্রণোদনা প্রদানের লক্ষ্যে মন্ত্রিসভা ইলেকট্রিক বাস ও ভারী ট্রাক আমদানির ক্ষেত্রে শুল্ক-কর অব্যাহতির এক যুগান্তকারী সিদ্ধান্ত অনুমোদন করেছে। রোববার (৩ মে) সন্ধ্যা ৬টা ৪৫ মিনিটে জাতীয় সংসদ ভবনের কেবিনেট কক্ষে অনুষ্ঠিত মন্ত্রিসভার গুরুত্বপূর্ণ বৈঠকে এই নীতিগত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়। বৈঠকে সভাপতিত্ব করেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।
বৈঠক শেষে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ থেকে প্রকাশিত এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয় যে, ইলেকট্রিক বাস আমদানির ক্ষেত্রে বিদ্যমান অধিকাংশ শুল্ক তুলে দিয়ে করভার সর্বনিম্ন পর্যায়ে নামিয়ে আনা হয়েছে। অর্থ মন্ত্রণালয়ের অভ্যন্তরীণ সম্পদ বিভাগ এই প্রস্তাবটি মন্ত্রিসভায় উত্থাপন করেছিল। প্রস্তাবটি বিস্তারিত পর্যালোচনার পর প্রধানমন্ত্রী ও মন্ত্রিসভার সদস্যবৃন্দ এটি অনুমোদন করেন।
সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, আমদানিকৃত ইলেকট্রিক বাসের ওপর বর্তমানে আরোপিত শুল্ক-করের মধ্যে কেবল ১৫ শতাংশ মূল্য সংযোজন কর (ভ্যাট) বহাল রাখা হয়েছে। ভ্যাট ব্যতীত অন্যান্য সকল প্রকার শুল্ক ও কর সম্পূর্ণভাবে মওকুফ করার ফলে এই ধরনের যান আমদানির খরচ উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পাবে বলে আশা করা হচ্ছে।
মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের বিজ্ঞপ্তিতে এই শুল্ক সুবিধার আওতা ও নির্দিষ্ট শর্তসমূহ বিস্তারিতভাবে উল্লেখ করা হয়েছে:
আসন সংখ্যা ও কোড: এইচএস কোড (HS Code) ৮৭০২.৪০.০০-এর অধীনে আমদানিকৃত ন্যূনতম ১৭ আসনবিশিষ্ট ইলেকট্রিক বাসের ক্ষেত্রে এই সুবিধা প্রযোজ্য হবে।
যানের অবস্থা: আমদানিকৃত বাসগুলো অবশ্যই সম্পূর্ণ নতুন বা ‘ব্র্যান্ড নিউ’ হতে হবে। রিকন্ডিশন্ড বা পুরোনো ইলেকট্রিক বাসের ক্ষেত্রে এই শুল্ক অব্যাহতি সুবিধা কার্যকর হবে না।
ব্যবহৃত ক্ষেত্র: শিক্ষার্থী পরিবহনের জন্য ব্যবহৃত বাস ব্যতীত অন্যান্য বাণিজ্যিক বা সাধারণ পরিবহনের উদ্দেশ্যে আমদানিকৃত ইলেকট্রিক বাসের ক্ষেত্রে ১৫ শতাংশ ভ্যাট প্রযোজ্য হবে। অর্থাৎ, আমদানিকারককে নিট ১৫ শতাংশ করভার পরিশোধ করতে হবে।
অব্যাহতিপ্রাপ্ত শুল্কসমূহ: আমদানির ক্ষেত্রে প্রচলিত কাস্টমস ডিউটি (CD), রেগুলেটরি ডিউটি (RD), সম্পূরক শুল্ক (SD), আগাম কর (AT) এবং অগ্রিম আয়কর (AIT) থেকে আমদানিকারকদের সম্পূর্ণ অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে।
ইলেকট্রিক বাসের পাশাপাশি পণ্য পরিবহনে ব্যবহৃত ভারী যানবাহনের ক্ষেত্রেও অনুরূপ সুবিধা প্রদানের সিদ্ধান্ত নিয়েছে মন্ত্রিসভা। বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়েছে, ৫ টন বা তার বেশি ধারণক্ষমতাসম্পন্ন ট্রাক আমদানির ক্ষেত্রেও একই ধরনের শুল্ক-কর অব্যাহতি সুবিধা প্রদান করা হবে। বাসের ন্যায় ট্রাক আমদানির ক্ষেত্রেও ১৫ শতাংশ ভ্যাট বহাল রেখে অন্যান্য শুল্ক প্রত্যাহার করা হবে। এই বিষয়ে অর্থ মন্ত্রণালয় থেকে পৃথক একটি প্রজ্ঞাপন জারি করার নির্দেশনা প্রদান করা হয়েছে।
সরকার ঘোষিত এই বিশেষ শুল্ক সুবিধা দীর্ঘস্থায়ী নয়; বরং একটি নির্দিষ্ট মেয়াদের জন্য কার্যকর করা হয়েছে। বিজ্ঞপ্তিতে স্পষ্ট করা হয়েছে যে, এই শুল্ক-কর অব্যাহতি সুবিধা আগামী ৩০ জুন পর্যন্ত বহাল থাকবে। এই সময়ের মধ্যে এলসি (LC) খোলা এবং আমদানিকৃত চালানের ক্ষেত্রে এই সুবিধা গ্রহণ করা যাবে। জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) দ্রুততম সময়ের মধ্যে এই সংক্রান্ত একটি বিধিবদ্ধ সংবিধিবদ্ধ আদেশ (এসআরও) জারি করবে বলে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ নিশ্চিত করেছে।
বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে কার্বন নিঃসরণ হ্রাস এবং জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভরতা কমানোর লক্ষ্যে বিভিন্ন দেশ ইলেকট্রিক যানবাহনের দিকে ঝুঁকছে। বাংলাদেশের মন্ত্রিসভার এই সিদ্ধান্ত সেই ধারাবাহিকতারই অংশ। বর্তমানে দেশে ডিজেলচালিত ভারী যানবাহনের সংখ্যা বেশি হওয়ায় পরিবেশ দূষণের হারও ক্রমবর্ধমান। ইলেকট্রিক বাসের ব্যবহার বৃদ্ধি পেলে ঢাকা ও চট্টগ্রামের মতো জনবহুল শহরগুলোতে বায়ুদূষণ ও শব্দদূষণ উল্লেখযোগ্য মাত্রায় হ্রাস পাবে।
শুল্ক কমানোর এই সিদ্ধান্তের ফলে পরিবহন খাতে বিনিয়োগকারীদের আগ্রহ বাড়বে এবং গণপরিবহন ব্যবস্থায় আধুনিক প্রযুক্তির সংযোজন ঘটবে। বিশেষ করে সিডি, আরডি ও সম্পূরক শুল্ক মওকুফ করায় একটি ইলেকট্রিক বাসের আমদানি ব্যয় প্রায় ২৫ থেকে ৩০ শতাংশ কমে যেতে পারে। এটি পরিবহন মালিকদের ওপর থেকে আর্থিক চাপ কমিয়ে সাধারণ যাত্রীদের জন্য উন্নত সেবা নিশ্চিত করতে সহায়ক হবে। ৫ টন বা তার বেশি ধারণক্ষমতার ট্রাকের ক্ষেত্রে এই সুবিধা পণ্য পরিবহন ব্যয় হ্রাস করে মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণেও পরোক্ষ ভূমিকা রাখতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ জানিয়েছে, এই সিদ্ধান্তের ফলে দেশে পরিবেশবান্ধব স্মার্ট পরিবহন ব্যবস্থার পথ সুগম হবে এবং টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এসডিজি) অর্জনে বাংলাদেশ এক ধাপ এগিয়ে যাবে। শীঘ্রই অর্থ মন্ত্রণালয় ও জাতীয় রাজস্ব বোর্ড থেকে বিস্তারিত নির্দেশনাসহ প্রজ্ঞাপন জনসমক্ষে প্রচার করা হবে।