খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: মঙ্গলবার, ২৩ জুন ২০২৬
ডিমের উৎপাদন খরচের চেয়ে বিক্রয়মূল্য কম হওয়ায় এবং পাইকারি বাজারে সিন্ডিকেটের কারসাজিতে ক্রমাগত লোকসানের মুখে পড়ে সিরাজগঞ্জে অনির্দিষ্টকালের জন্য ডিম বিক্রি বন্ধ ঘোষণা করেছেন স্থানীয় পোলট্রি খামার মালিকরা। জেলার খামারিদের নেওয়া এমন আকস্মিক ও কঠোর সিদ্ধান্তের বড় ধরনের প্রভাব পড়তে শুরু করেছে স্থানীয় বাজারে। এরই মধ্যে বিভিন্ন পাইকারি ও খুচরা বাজারে ডিমের সরবরাহ মারাত্মকভাবে কমে গেছে, যার ফলে সাধারণ ক্রেতারা তীব্র সংকটের মুখে পড়েছেন। গত রবিবার বিকেল ৫টার দিকে সিরাজগঞ্জের সুপ্ত পোলট্রি ফার্ম অ্যান্ড ফিডের মালিক মোস্তাক আহমেদ এই ধর্মঘটের বিষয়টি আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত করেন।
তিনি জানান, এর আগে গত শনিবার সিরাজগঞ্জ সদর উপজেলার শিয়ালকোল এলাকায় জেলার খামার মালিকদের একটি জরুরি বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। সেই বৈঠকেই সর্বসম্মতিক্রমে ডিম বিক্রি বন্ধ রাখার এই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। নির্ধারিত পরিকল্পনা অনুযায়ী, গত রবিবার বিকেল ৫টা থেকে জেলার সব খামারি বাজারগুলোতে ডিম সরবরাহ ও বিক্রি সম্পূর্ণ বন্ধ রেখেছেন। খামারিদের মূল অভিযোগ হলো, বর্তমানে পোলট্রি ফিড বা মুরগির খাদ্য, ওষুধ এবং খামার পরিচালনার আনুষঙ্গিক খরচ বৃদ্ধি পাওয়ায় একটি ডিম উৎপাদন করতে তাদের গড়ে প্রায় ৯ টাকা খরচ হচ্ছে। অথচ কিছু অসাধু ব্যবসায়ী ও মধ্যস্বত্বভোগী সিন্ডিকেট করে খামারিদের কাছ থেকে প্রতিটি ডিম মাত্র ৭ টাকা ৭০ পয়সা দরে কিনতে চাচ্ছেন। এই দামে ডিম বিক্রি করলে প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ আর্থিক লোকসান গুণতে হয়, যা সাধারণ খামারিদের পক্ষে বহন করা অসম্ভব হয়ে পড়েছে।
সিরাজগঞ্জ সদর উপজেলার শিয়ালকোল এলাকার ভুক্তভোগী খামারি লোকমান হোসেন নিজের ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘আমরা দিনরাত পরিশ্রম করে খামারে ডিম উৎপাদন করি। অথচ সেই ডিমের দাম কত হবে তা নির্ধারণ করেন কিছু অসাধু বড় ব্যবসায়ী। তারা কৃত্রিম সিন্ডিকেট তৈরি করে আমাদের কাছ থেকে পানির দরে ডিম কিনে নিয়ে দেশের বিভিন্ন জায়গায় চড়া দামে বিক্রি করছেন। আমরা যখনই এই অন্যায়ের প্রতিবাদ করি, তখন তারা নামমাত্র কয়েক পয়সা বাড়িয়ে আমাদের শান্ত করার চেষ্টা করেন। এতেই পরিষ্কার বোঝা যায় যে পুরো বাজার ব্যবস্থা একটি চক্রের ইশারায় নিয়ন্ত্রিত হচ্ছে।’
আরেক খামারি গোলাম মোস্তফা জানান, বাজারে মুরগির খাবার ও ওষুধের দাম এখন আকাশছোঁয়া। শ্রমিকের মজুরিও বেড়েছে। কিন্তু সেই তুলনায় ডিমের পাইকারি দাম না পাওয়ায় অনেক ছোট ও মাঝারি খামারি দেউলিয়া হয়ে নিজেদের খামার স্থায়ীভাবে বন্ধ করে দিতে বাধ্য হয়েছেন। এই পরিস্থিতিতে তারা প্রশাসনের কাছে বাজারের সিন্ডিকেট ভেঙে দেওয়ার এবং উৎপাদন খরচের সঙ্গে সংগতি রেখে ডিমের ন্যায্যমূল্য নির্ধারণের জোর দাবি জানিয়েছেন।
এদিকে খামারিদের এই ধর্মঘটের কারণে সিরাজগঞ্জের স্থানীয় বাজারগুলোতে ডিমের তীব্র হাহাকার শুরু হয়েছে। শহরের বিভিন্ন কাঁচাবাজারের খুচরা বিক্রেতারা জানিয়েছেন, খামার থেকে ডিম আসা বন্ধ হয়ে যাওয়ায় তাদের কাছে থাকা মজুত শেষ হয়ে আসছে। ডিম বিক্রেতা আলাউদ্দিন বলেন, ‘আগে পাইকারি ব্যবসায়ীরা প্রতিদিন যে পরিমাণ ডিম দিয়ে যেতেন, এখন তা পুরোপুরি বন্ধ। দোকানে ক্রেতারা এসে ডিম না পেয়ে ফিরে যাচ্ছেন। আমরা নিজেরাও বিপাকে আছি।’ বাজারে ডিম কিনতে আসা সাধারণ ক্রেতা মো. রাশিদুল ইসলাম বলেন, ডিম হলো নিম্ন ও মধ্যবিত্ত মানুষের প্রোটিনের প্রধান উৎস। হঠাৎ করে এভাবে বাজার থেকে ডিম হাওয়া হয়ে গেলে সাধারণ মানুষের পাত থেকে পুষ্টিকর খাবার উঠে যাবে। তিনি খামারি ও ব্যবসায়ী—উভয় পক্ষের সঙ্গে বসে সরকারকে দ্রুত এই সংকট সমাধানের অনুরোধ জানান।
সংশ্লিষ্ট অর্থনীতিবিদ ও বাজার বিশ্লেষকদের মতে, উৎপাদক, পাইকারি ব্যবসায়ী এবং স্থানীয় প্রশাসনের সমন্বিত উদ্যোগ ছাড়া ডিমের বাজারের এই অস্থিরতা দূর করা সম্ভব নয়। দ্রুত আলোচনার মাধ্যমে এই অচলাবস্থা নিরসন করা না গেলে সামনে ডিমের সংকট আরও ভয়াবহ রূপ নিতে পারে। এই বিষয়ে সিরাজগঞ্জ জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. এ কে এম আনোয়ারুল হক বলেন, ডিমের প্রকৃত দাম নির্ধারণ করার এখতিয়ার সরকারের। কোনো ব্যাপারী বা ব্যবসায়ী নিজের ইচ্ছামতো দাম চাপিয়ে দিতে পারেন না। তবে তিনি দাবি করেন, বর্তমানে বাজারে ডিমের সার্বিক চাহিদা কিছুটা কম থাকায় সাময়িকভাবে দাম কিছুটা কমেছে। খামারিদের স্বার্থ সুরক্ষায় প্রশাসন বিষয়টি খতিয়ে দেখছে।