খবরওয়ালা অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশ: শনিবার, ১৫ নভেম্বর ২০২৫
বাংলা কথাসাহিত্যের অনন্য কারিগর, মানবজাগরণের দার্শনিক লেখক হাসান আজিজুল হক—আজ তাঁর তৃতীয় মৃত্যুবার্ষিকী। মৃত্যুর পর এত বছর পার হলেও সাহিত্যের পরিসরে তাঁর অনুপস্থিতি এক গভীর শূন্যতা হয়ে রয়ে গেছে। কারণ তিনি শুধু গল্পকার নন; তিনি ছিলেন এক চিন্তাশীল সমাজবীক্ষক, মানবযন্ত্রণার ব্যাখ্যাতা এবং বাঙালি জীবনের অন্তর্দহনকে সাহসী ভাষায় উচ্চারণকারী এক অনন্য কণ্ঠ।
১৯৩৯ সালের ২ ফেব্রুয়ারি পশ্চিমবঙ্গের বর্ধমানে জন্ম নেওয়া হাসান আজিজুল হক শৈশব থেকেই বিভক্তির হাহাকার, সমাজ ও রাজনীতির উত্তাল পরিবর্তনকে প্রত্যক্ষ করেছেন। সেই অভিজ্ঞতার দহনই পরবর্তীতে তাঁর সাহিত্যকে দিয়েছে গভীরতর মানবিকতা। ‘আত্মজা ও একটি করবী গাছ’, ‘আগুনপাখি’, ‘সমুদ্রের স্বপ্ন শীতের অরণ্য’, ‘নামহীন গোত্রহীন’—একেকটি গ্রন্থ যেন মানুষের অস্তিত্ব, নিপীড়ন, দেশভাগ এবং স্বপ্নভঙ্গের দলিল। তাঁর লেখায় ছিল না কোনো অলংকারময় সাজ; ছিল সত্যের নির্মম উন্মোচন।
বাংলা ছোটগল্পকে আধুনিক রূপ দেওয়ার ক্ষেত্রে তিনি ছিলেন প্রথম সারির স্রষ্টাদের একজন। শব্দের অর্থের ভেতরে লুকানো ব্যথাকে তিনি এমন দক্ষতায় উন্মোচন করেছেন যে পাঠক গল্প পড়তে পড়তে নিজের ভেতরের মানুষটিকে আবিষ্কার করে ফেলে। তাঁর ভাষা সংযত, অথচ তীক্ষ্ণ; তাঁর দৃষ্টিভঙ্গি ব্যক্তিমানুষের যন্ত্রণাকে বৃহত্তর সময়-সমাজের সঙ্গে যুক্ত করে দেখার এক অনন্য ক্ষমতা রাখে।
শিক্ষক হিসেবেও তিনি ছিলেন ছাত্রদের অনুপ্রেরণার উৎস। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাসে তাঁর উপস্থিতি ছিল বৌদ্ধিক জাগরণের এক কেন্দ্র। মানবিকতা, যুক্তিবাদ ও অসাম্প্রদায়িক চেতনায় দৃঢ় বিশ্বাসী এই মানুষটি জীবনের শেষদিন পর্যন্ত লেখার মধ্য দিয়ে সত্য উচ্চারণ করে গেছেন।
আজ তাঁর তৃতীয় মৃত্যুবার্ষিকীতে আমরা তাঁকে গভীর শ্রদ্ধায় স্মরণ করি। সাহিত্য আমাদের যে নৈতিক সাহস দেয়, যে মানবিক দৃষ্টি শেখায়—তার বড় অংশটাই এসেছে হাসান আজিজুল হকের মতো লেখকদের কলম থেকে। তিনি না থাকলেও তাঁর সৃষ্টি, তাঁর মানবিক দৃষ্টি আর তাঁর শিল্প-সত্তা বাংলা সাহিত্যের আকাশে চিরদিন জ্বলতে থাকবে।
শ্রদ্ধা, ভালোবাসা ও গভীর কৃতজ্ঞতা— হাসান আজিজুল হক স্মরণে।
খবরওয়ালা/এসজে