খবরওয়ালা অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশ: শনিবার, ৩ জানুয়ারি ২০২৬
নবগঠিত রাজনৈতিক দল জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) বর্তমানে গভীর সাংগঠনিক ও আদর্শিক সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। দল গঠনের অল্প সময়ের মধ্যেই একের পর এক কেন্দ্রীয় নেতার পদত্যাগ এনসিপিকে রাজনৈতিকভাবে বড় চাপে ফেলেছে। সর্বশেষ হিসাব অনুযায়ী, এখন পর্যন্ত অন্তত ১৪ জন কেন্দ্রীয় নেতা দলটির সব ধরনের পদ-পদবি থেকে পদত্যাগ করেছেন। আরও বেশ কয়েকজন নেতা পদত্যাগ না করলেও কার্যত নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়েছেন, যা দলটির ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক অবস্থান নিয়ে প্রশ্ন তুলছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে নির্বাচনি সমঝোতার সিদ্ধান্তই এনসিপির ভেতরে চলমান সংকটের প্রধান কারণ। দলটির একটি বড় অংশ এই সিদ্ধান্তকে আদর্শবিরোধী ও রাজনৈতিকভাবে আত্মঘাতী বলে মনে করছেন। জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের প্রেক্ষাপটে ছাত্র-জনতার রক্তের ওপর দাঁড়িয়ে গড়ে ওঠা একটি রাজনৈতিক দল হিসেবে এনসিপির কাছ থেকে যে নতুন ধারার রাজনীতির প্রত্যাশা ছিল, এই সমঝোতার মাধ্যমে তা ব্যাহত হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
দলটির অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা সদস্য ও মুখপাত্র মুশফিক উস সালেহীন পদত্যাগের সময় স্পষ্টভাবে বলেন, এনসিপির ভেতরে মতবিরোধ চরমে পৌঁছেছে এবং তা প্রকাশ্য বিভক্তিতে রূপ নিয়েছে। তাঁর মতে, পুরোনো রাজনৈতিক বন্দোবস্তের সঙ্গে আপস করায় নতুন ধারার রাজনীতির সম্ভাবনা নষ্ট হয়েছে। একই দিনে কেন্দ্রীয় যুগ্ম মুখ্য সমন্বয়ক খান মুহাম্মদ মুরসালীনও পদত্যাগ করেন।
এনসিপির পলিসি ও রিসার্চ উইংয়ের প্রধান এবং যুগ্ম আহ্বায়ক খালেদ সাইফুল্লাহর পদত্যাগ পরিস্থিতিকে আরও ঘনীভূত করে। তাঁর স্ত্রী ডা. তাসনিম জারা এর আগেই দল ছাড়েন এবং স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে নির্বাচনে অংশ নেন। এসব পদত্যাগ শুধু দলীয় কাঠামো নয়, এনসিপির নীতিনির্ধারণী সক্ষমতাকেও দুর্বল করে দিয়েছে।
জুলাই অভ্যুত্থানে শহীদ ও আহতদের পরিবারগুলোর মধ্যেও হতাশা বাড়ছে। তাঁদের মতে, এনসিপির এই ভাঙন তাঁদের ন্যায্য দাবি আদায়ের পথকে আরও অনিশ্চিত করে তুলছে। দলটির প্রতি যে আস্থা ও প্রত্যাশা ছিল, তা ক্রমেই ক্ষয়ে যাচ্ছে।
রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, নতুন রাজনৈতিক দলের ক্ষেত্রে মতবিরোধ অস্বাভাবিক নয়, তবে শীর্ষ পর্যায়ের ধারাবাহিক পদত্যাগ দলটির সাংগঠনিক ভিত্তিকে দুর্বল করে দেয়। এনসিপির ক্ষেত্রে নারী নেতৃত্ব ও তরুণ নেতৃত্বের বড় অংশ সরে যাওয়ায় দলটি শক্তি হারাচ্ছে। সময়মতো অভ্যন্তরীণ আস্থার সংকট দূর করতে না পারলে দলটির রাজনৈতিক প্রভাব দ্রুত সীমিত হয়ে পড়তে পারে।
এনসিপি থেকে পদত্যাগ করা কেন্দ্রীয় নেতাদের তালিকা (সংক্ষেপে):
| ক্রম | নাম | দায়িত্ব/পরিচয় |
|---|---|---|
| ১ | ডা. তাসনিম জারা | জ্যেষ্ঠ যুগ্ম সদস্য সচিব |
| ২ | তাজনূভা জাবীন | কেন্দ্রীয় নেতা |
| ৩ | খালেদ সাইফুল্লাহ | যুগ্ম আহ্বায়ক |
| ৪ | মুশফিক উস সালেহীন | মুখপাত্র ও মিডিয়া সেল প্রধান |
| ৫ | খান মো. মুরসালীন | যুগ্ম মুখ্য সমন্বয়ক |
| ৬ | ফারহাদ আলম ভূঁইয়া | কেন্দ্রীয় নেতা |
| ৭ | আরিফ সোহেল | কেন্দ্রীয় নেতা |
| ৮ | আজাদ খান ভাসানী | কেন্দ্রীয় নেতা |
| ৯ | আসিফ নেহাল | কেন্দ্রীয় নেতা |
| ১০ | মীর হাবিব আল মানজুর | কেন্দ্রীয় নেতা |
| ১১ | মারজুক আহমেদ | কেন্দ্রীয় নেতা |
| ১২ | মীর আরশাদুল হক | কেন্দ্রীয় নেতা |
| ১৩ | ওয়াহিদুজ্জামান | কেন্দ্রীয় নেতা |
| ১৪ | আল আমিন টুটুল | কেন্দ্রীয় নেতা |
সার্বিকভাবে, এনসিপির সামনে এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো অভ্যন্তরীণ ঐক্য পুনর্গঠন এবং আদর্শিক অবস্থান স্পষ্ট করা। তা না হলে দলটির ওপর ভর করে যে নতুন রাজনৈতিক সম্ভাবনার কথা বলা হয়েছিল, তা বাস্তবে রূপ নেওয়া কঠিন হয়ে পড়বে।