খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: সোমবার, ১৯ জানুয়ারি ২০২৬
দেশের অ-ব্যাংক আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোতে খেলাপি ঋণের পরিমাণ ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর শেষে রেকর্ড ২৯,৪০৮ কোটি টাকায় দাঁড়িয়েছে। এটি মোট বিতরণকৃত ঋণের এক-তৃতীয়াংশের চেয়েও বেশি, যা এই খাতের গভীর সংকটেরই বহিঃপ্রকাশ। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, সেপ্টেম্বর শেষে এনবিএফআই খাতের মোট ঋণের পরিমাণ ছিল ৭৯,২৫১ কোটি টাকা, যার মধ্যে খেলাপি ঋণের হার দাঁড়িয়েছে ৩৭.১১ শতাংশ। মাত্র তিন মাসের ব্যবধানে (জুন থেকে সেপ্টেম্বর) খেলাপি ঋণ বেড়েছে ১,৮৬৭ কোটি টাকা।
পরিসংখ্যান বিশ্লেষণে দেখা যায়, গত কয়েক মাসে এনবিএফআই খাতে ঋণের প্রবৃদ্ধি হলেও তার চেয়ে কয়েক গুণ বেশি গতিতে বেড়েছে খেলাপি ঋণের পরিমাণ। এটি ইঙ্গিত দেয় যে, কেবল পুরনো ঋণই নয়, বরং নতুন করে বিতরণ করা ঋণগুলোও দ্রুত খেলাপি হয়ে পড়ছে। বাংলাদেশ লিজিং অ্যান্ড ফাইন্যান্স কোম্পানিজ অ্যাসোসিয়েশনের (বিএলএফসিএ) চেয়ারম্যান গোলাম সরওয়ার ভূঁইয়া মনে করেন, খেলাপি ঋণের এই বিশাল অংক আগে থেকেই ছিল, তবে তা নথিপত্রে গোপন রাখা হতো। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর কেন্দ্রীয় ব্যাংক কঠোর তদারকি শুরু করায় প্রকৃত সত্য সামনে আসতে শুরু করেছে।
এনবিএফআই খাতের সাম্প্রতিক খেলাপি ঋণের তুলনামূলক চিত্র নিচের টেবিলে তুলে ধরা হলো:
| সময়কাল | মোট ঋণের স্থিতি (কোটি টাকা) | খেলাপি ঋণের পরিমাণ (কোটি টাকা) | খেলাপির হার (%) |
| জুন ২০২৫ | ৭৭,০৮৮ (প্রায়) | ২৭,৫৪১ | ৩৫.৭২% |
| সেপ্টেম্বর ২০২৫ | ৭৯,২৫১ | ২৯,৪০৮ | ৩৭.১১% |
| পরিবর্তন (৩ মাসে) | + ২,১৬৩ | + ১,৮৬৭ | + ১.৩৯% |
খাত সংশ্লিষ্টদের মতে, সরকার পরিবর্তনের পর অনেক প্রভাবশালী ঋণগ্রহীতা দেশত্যাগ করায় ঋণের কিস্তি আদায় বন্ধ হয়ে গেছে। এর আগে রাজনৈতিক প্রভাবে অনেক খেলাপি ঋণ বারবার পুনঃতফসিল করে নিয়মিত দেখানো হতো, যা এখন সম্ভব হচ্ছে না। এছাড়া, কেন্দ্রীয় ব্যাংক ইতিমধ্যে নয়টি দুর্বল আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিলুপ্ত (লিমিডেশন) করার ঘোষণা দেওয়ায় সাধারণ আমানতকারীদের মধ্যে চরম আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। ফলে নতুন আমানত আসার বদলে পুরনো আমানত তুলে নেওয়ার হিড়িক পড়েছে, যা বাজারে তারল্য সংকটকে তীব্রতর করেছে।
বাংলাদেশ ব্যাংক প্রথম পর্যায়ে নয়টি অত্যন্ত দুর্বল আর্থিক প্রতিষ্ঠানকে অবসায়নের জন্য চিহ্নিত করেছে। এই তালিকায় রয়েছে— এফএএস (FAS) ফাইন্যান্স, বিআইএফসি (BIFC), প্রিমিয়ার লিজিং, ফারইস্ট ফাইন্যান্স, জিএসপি ফাইন্যান্স, প্রাইম ফাইন্যান্স, আভিভা ফাইন্যান্স, পিপলস লিজিং এবং ইন্টারন্যাশনাল লিজিং। সরকারের পক্ষ থেকে এই প্রতিষ্ঠানগুলোর আমানতকারীদের সুরক্ষা দিতে ৫,০০০ কোটি টাকার একটি আর্থিক সীমা নির্ধারণ করা হয়েছে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ‘ফাইন্যান্সিয়াল স্ট্যাবিলিটি অ্যাসেসমেন্ট রিপোর্ট’ অনুযায়ী, এনবিএফআই খাতের সম্পদ ও মুনাফা উভয়ই নিম্নমুখী। ২০২৪ সালের এপ্রিল-জুন প্রান্তিকের তুলনায় জুলাই-সেপ্টেম্বর প্রান্তিকে মোট সম্পদের পরিমাণ ১.২২ শতাংশ কমে দাঁড়িয়েছে ৯৯,৪৯৩ কোটি টাকায়। এই নেতিবাচক প্রবণতা অব্যাহত থাকলে ছোট ও দুর্বল প্রতিষ্ঠানগুলোর অস্তিত্ব টেকা দায় হয়ে পড়বে। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, খেলাপি ঋণ আদায় নিশ্চিত করতে না পারলে কেবল তহবিল জুগিয়ে এই খাতকে রক্ষা করা সম্ভব হবে না।