খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: বুধবার, ২৬ নভেম্বর ২০২৫
বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের ইতিহাসে মুহম্মদ আবদুল হাই এমন এক উজ্জ্বল নক্ষত্র, যার আলো আজও সমান দীপ্ত। বাংলা ধ্বনিবিজ্ঞান ও ভাষাতত্ত্বকে তিনি যে যৌক্তিক, বৈজ্ঞানিক ও সহজ রূপে উপস্থাপন করেছিলেন, তা আজও গবেষকদের পথচলায় দিশারি হয়ে আছে। তিনি ছিলেন একজন দূরদর্শী শিক্ষাবিদ, সৃজনশীল সাহিত্যিক এবং বাংলা ভাষার আধুনিকায়নের অন্যতম পথিকৃত। তাঁর অসামান্য গবেষণা, চিন্তাশক্তি ও মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি তাঁকে বাংলা বুদ্ধিবৃত্তিক জগতের অন্যতম শ্রেষ্ঠ ব্যক্তিত্বে পরিণত করেছে।
১৯১৯ সালের ২৬ নভেম্বর মুর্শিদাবাদের মরিচা গ্রামে জন্ম নেওয়া হাই খুব ছোটবেলাতেই অসাধারণ মেধার পরিচয় দেন। পিতা আবদুল গণি ছিলেন শিক্ষক ও ইমাম; মাতা ময়মুন্নেসা খাতুন নিজের মায়ায় সন্তানদের শিক্ষা ও নৈতিকতায় দৃঢ় করে তুলেছিলেন। শৈশবেই পাঠে মনোযোগ ও প্রখর মেধা তাঁকে আলাদা পরিচয়ে সামনে আনতে শুরু করে।
বর্ধনপুর জুনিয়র মাদ্রাসায় পড়া শুরুর পর তিনি একে একে নিজেকে প্রমাণ করেন—
১৯৩৬ সালের উচ্চ মাদ্রাসা পরীক্ষায় প্রথম বিভাগে পঞ্চম,
১৯৩৮ সালে ঢাকা ইসলামিক ইন্টারমিডিয়েট কলেজে প্রথম বিভাগে ষষ্ঠ স্থান।
ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহর অনুপ্রেরণায় তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগে ভর্তি হন এবং সেখানেই ঘটে তাঁর মেধার প্রকৃত বিকাশ—
১৯৪১ সালে বিএ অনার্স: প্রথম শ্রেণিতে দ্বিতীয়,
১৯৪২ সালে এমএ: প্রথম শ্রেণিতে প্রথম।
তিনি ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম মুসলমান, যিনি উভয় ডিগ্রিতে প্রথম শ্রেণি অর্জন করেন।
এক মাসের স্বল্প শিক্ষকতা দিয়ে শুরু হলেও অল্প সময়েই তিনি ঢাকা, চট্টগ্রাম, কৃষ্ণনগর ও রাজশাহী সরকারি কলেজে অধ্যাপনা করেন। ১৯৪৯ সালে তিনি যোগ দেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগে—যা তাঁর জীবন ও গবেষণার প্রধান ক্ষেত্র হয়ে ওঠে।
১৯৫০ সালে SOAS-এ গবেষণার জন্য লন্ডনে পাড়ি জমান। J. R. Firth-এর তত্ত্বাবধানে তাঁর রচিত অভিসন্দর্ভ “A Study of Nasals and Nasalization in Bengali” বাংলা ধ্বনিবিজ্ঞানে নতুন দিশা এনে দেয়। তিনি ডিস্টিংশনসহ এমএ ডিগ্রি অর্জন করেন।
১৯৬৮ সালে মিসৌরি বিশ্ববিদ্যালয়ে ভিজিটিং প্রফেসর হিসেবে থাকার সময় দেশে শুরু হয় রাজনৈতিক অস্থিরতা। সুযোগ নেয় এক কুচক্রী মহল—
অর্থ আত্মসাতের ভিত্তিহীন অভিযোগ,
পত্র-পত্রিকায় দৃষ্টিকটু কুৎসা,
এবং পরিচিত মানুষের নেপথ্য ইন্ধন।
এই অপমান তাঁকে মানসিকভাবে বিধ্বস্ত করে দেয়।
১৯৬৯ সালের ৩ জুন ঢাকা শহরে চলন্ত ট্রেনের ধাক্কায় তাঁর মৃত্যু ঘটে। এটি আত্মহত্যা, নাকি অপঘাত—এ প্রশ্ন আজও অনুত্তরিত। অনেকেই বলেন, সমাজের বৈরিতা ও ষড়যন্ত্রই তাঁকে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দেয়।
আজিমপুরে তাঁর দাফন এবং পরবর্তী জনসমাগম প্রমাণ করে—মানুষ তাঁকে কত গভীর ভালোবাসত।
১৯৬১: বাংলা একাডেমি পুরস্কার
১৯৯৬: একুশে পদক (মরণোত্তর)
মুহম্মদ আবদুল হাই ছিলেন বাংলা ভাষার এক আলোকবর্তিকা, যার কর্ম ও মানবিকতা প্রজন্মকে গভীরভাবে প্রভাবিত করে চলবে।