খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: মঙ্গলবার, ৫ মে ২০২৬
ভিয়েতনাম ন্যাশনাল রিইনস্যুরেন্স কর্পোরেশন (ভিনারে) তাদের সাম্প্রতিক ব্যবসায়িক কার্যক্রমে উল্লেখযোগ্য স্থিতিশীলতা প্রদর্শন করেছে। বৈশ্বিক রেটিং সংস্থা ‘এএম বেস্ট’-এর তথ্য অনুযায়ী, প্রতিষ্ঠানটি ২০২১ থেকে ২০২৫ অর্থবছর পর্যন্ত পাঁচ বছরের গড় ইক্যুইটি রিটার্ন (ROE) ১০.৮% বজায় রাখতে সক্ষম হয়েছে। মূলত কোর কমার্শিয়াল আন্ডাররাইটিং এবং ধারাবাহিক বিনিয়োগ আয় এই শক্তিশালী পারফরম্যান্সের নেপথ্যে মূল চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করেছে।
২০২৫ অর্থবছরের আর্থিক প্রতিবেদন বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, ভিনারের মোট আয়ের একটি বড় অংশ এসেছে বিনিয়োগ খাত থেকে। আলোচ্য সময়ে প্রতিষ্ঠানটির নিট বিনিয়োগ আয়ের অনুপাত ছিল ২২.৬%। ভিয়েতনামের অভ্যন্তরীণ বাজারে দীর্ঘদিনের ব্যবসায়িক অভিজ্ঞতা এবং স্থানীয় বীমা কোম্পানিগুলোর সাথে সুদৃঢ় সম্পর্কের কারণে প্রতিষ্ঠানটি বাজারে একটি শীর্ষস্থানীয় অবস্থানে রয়েছে।
২০২৫ সালের শেষ নাগাদ প্রতিষ্ঠানটির ব্যালেন্স শিট বা উদ্বর্তপত্র পর্যালোচনায় দেখা যায়, তাদের মূলধনের পর্যাপ্ততা অত্যন্ত সন্তোষজনক পর্যায়ে রয়েছে। তবে এই শক্তিশালী মূলধন কাঠামোর বিপরীতে কিছু ঝুঁকিও বিদ্যমান। বিশেষ করে শেয়ার বাজারে তালিকাভুক্ত স্টক এবং প্রাইভেট প্লেসমেন্টের ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠানটির বিনিয়োগ ঝুঁকি মাঝারি মানের বলে চিহ্নিত করা হয়েছে।
ভিয়েতনামের পুনর্বীমা খাতে ভিনারে-র অবস্থান সুসংহত হলেও বড় ধরনের বাণিজ্যিক ও শিল্প ঝুঁকি (Large Commercial and Industrial Risks) মোকাবিলায় প্রতিষ্ঠানটিকে প্রতিনিয়ত চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন হতে হয়। ২০২৫ সাল পরবর্তী সময়েও প্রতিষ্ঠানটির শক্তিশালী পরিচালন দক্ষতা বজায় থাকবে বলে আশা করা হচ্ছে, যা মূলত তাদের সুশৃঙ্খল আন্ডাররাইটিং প্রক্রিয়ার ফসল।
১. প্রাতিষ্ঠানিক পটভূমি ও সরকারি অংশীদারিত্ব: ভিয়েতনাম ন্যাশনাল রিইনস্যুরেন্স কর্পোরেশন বা ভিনারে (VINARE) ১৯৯৪ সালে ভিয়েতনামের অর্থমন্ত্রণালয়ের অধীনে প্রতিষ্ঠিত হয়। এটি ভিয়েতনামের প্রথম পুনর্বীমা কোম্পানি। পরবর্তীতে ২০০৬ সালে এটি একটি জয়েন্ট স্টক কোম্পানিতে রূপান্তরিত হয় এবং হ্যানয় স্টক এক্সচেঞ্জে তালিকাভুক্ত হয়। ভিয়েতনাম সরকার রাষ্ট্রীয় বিনিয়োগ সংস্থা ‘এসসিআইসি’ (SCIC)-এর মাধ্যমে এই কোম্পানিতে বড় ধরনের শেয়ারের মালিকানা ধরে রেখেছে।
২. আন্ডাররাইটিং এবং ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা: ভিনারে প্রধানত নন-লাইফ ইন্স্যুরেন্স বা সাধারণ বীমা খাতের পুনর্বীমা সেবা প্রদান করে। এর মধ্যে অগ্নি বীমা, সামুদ্রিক বীমা, প্রকৌশল বীমা এবং স্বাস্থ্য বীমা উল্লেখযোগ্য। প্রতিষ্ঠানটি তাদের আন্ডাররাইটিং প্রক্রিয়ায় অত্যন্ত সতর্ক থাকে, যার প্রতিফলন দেখা গেছে তাদের ২০২১-২০২৫ সালের আর্থিক ফলাফলে। বড় ধরনের শিল্প দুর্ঘটনার ঝুঁকি কমাতে তারা আন্তর্জাতিক বড় বড় পুনর্বীমা প্রতিষ্ঠানের সাথে অংশীদারিত্বের ভিত্তিতে কাজ করে।
৩. আন্তর্জাতিক রেটিং ও নির্ভরযোগ্যতা: ‘এএম বেস্ট’ (AM Best) কর্তৃক ভিনারে-র আর্থিক শক্তি রেটিং (Financial Strength Rating) সাধারণত ‘B++’ (Good) এবং ইস্যুকারী ক্রেডিট রেটিং (Long-Term Issuer Credit Rating) ‘bbb’ হিসেবে বজায় থাকে। এই রেটিংগুলো নির্দেশ করে যে, প্রতিষ্ঠানটি তাদের দীর্ঘমেয়াদী পলিসি গ্রাহকদের দাবি মেটাতে সক্ষম এবং তাদের আর্থিক ভিত্তি যথেষ্ট মজবুত।
৪. বিনিয়োগ কৌশল ও বাজার পরিস্থিতি: ২০২৫ সালের তথ্যানুযায়ী, ভিনারে তাদের তহবিলের একটি বড় অংশ সরকারি বন্ড, ফিক্সড ডিপোজিট এবং শেয়ার বাজারে বিনিয়োগ করেছে। যদিও নিট বিনিয়োগ আয়ের অনুপাত ২২.৬%, যা অত্যন্ত ইতিবাচক, তবুও শেয়ার বাজারের অস্থিরতা এবং প্রাইভেট ইক্যুইটির ঝুঁকির কারণে তাদের সামগ্রিক ঝুঁকির প্রোফাইলে কিছুটা ভারসাম্য রক্ষা করতে হয়। ভিয়েতনামের ক্রমবর্ধমান শিল্পায়ন এবং অবকাঠামোগত উন্নয়নের ফলে পুনর্বীমা বাজারে ভিনারে-র জন্য যেমন সুযোগ তৈরি হয়েছে, তেমনি বড় বাণিজ্যিক ঝুঁকির মাত্রাও বৃদ্ধি পেয়েছে।
৫. ২০২৫ পরবর্তী সম্ভাবনা: ভিয়েতনামের উদীয়মান অর্থনীতির সাথে সামঞ্জস্য রেখে পুনর্বীমা খাতের চাহিদা বৃদ্ধি পাচ্ছে। ভিনারে তাদের অভ্যন্তরীণ নেটওয়ার্ক এবং আন্তর্জাতিক অংশীদারদের সহায়তায় বাজারে নিজেদের আধিপত্য ধরে রাখার চেষ্টা করছে। বিশেষ করে ডিজিটাল বীমা সেবা এবং টেকসই উন্নয়ন (ESG) নীতিমালার আলোকে তাদের ব্যবসায়িক মডেলে পরিবর্তন আনছে, যা দীর্ঘমেয়াদে ১০.৮% ইক্যুইটি রিটার্ন বজায় রাখতে সহায়ক হতে পারে।
সার্বিকভাবে, ভিনারে ভিয়েতনামের বীমা খাতের একটি অপরিহার্য স্তম্ভ। শক্তিশালী মূলধন ভিত্তি এবং কৌশলগত বিনিয়োগের মাধ্যমে তারা ঝুঁকি মোকাবিলা করে তাদের ব্যবসায়িক প্রবৃদ্ধি অব্যাহত রাখার পথে রয়েছে। তবে শেয়ার বাজারের ঝুঁকি এবং বড় ধরনের বাণিজ্যিক দায়বদ্ধতাগুলো তাদের ভবিষ্যৎ স্থিতিশীলতার জন্য মূল চ্যালেঞ্জ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।