খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: বৃহস্পতিবার, ৭ মে ২০২৬
মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালিতে বাণিজ্যিক জাহাজের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ঘোষিত ‘প্রজেক্ট ফ্রিডম’ কার্যক্রম স্থগিত করা হয়েছে। মার্কিন এক প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে যে, সৌদি আরব এবং কুয়েত তাদের আকাশসীমা ও সামরিক ঘাঁটি ব্যবহারের অনুমতি দিতে অস্বীকৃতি জানানোয় এই অভিযানটি সাময়িকভাবে বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
হরমুজ প্রণালিতে আন্তর্জাতিক তেলবাহী জাহাজের সুরক্ষা নিশ্চিত করার লক্ষে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প হঠাৎ করেই এই প্রকল্পের ঘোষণা দিয়েছিলেন। তবে গত রোববার এই আকস্মিক ঘোষণার ফলে সৌদি আরবসহ পারস্য উপসাগরীয় মিত্র দেশগুলো অপ্রস্তুত হয়ে পড়ে। মার্কিন কর্মকর্তাদের দেওয়া তথ্যমতে, রিয়াদের দক্ষিণ-পূর্বে অবস্থিত কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ প্রিন্স সুলতান বিমানঘাঁটি ব্যবহার করার জন্য মার্কিন প্রশাসনের অনুরোধ সৌদি আরব প্রত্যাখ্যান করেছে। এমনকি মার্কিন সামরিক বিমান চলাচলের জন্য সৌদি আকাশসীমা ব্যবহারের অনুমতিও মেলেনি।
প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প এই অচলাবস্থা নিরসনে সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমানের সঙ্গে টেলিফোনে সরাসরি আলোচনা করেন। তবে সেই আলাপচারিতায় আকাশসীমা ব্যবহার বা সামরিক ঘাঁটি পরিচালনার বিষয়ে কোনো সুনির্দিষ্ট সমঝোতা অর্জিত হয়নি। সৌদি প্রশাসনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে যে, এই সামরিক পরিকল্পনার বাস্তবায়ন খুব দ্রুত করার চেষ্টা করা হচ্ছিল, যার ফলে সমন্বয়ে ঘাটতি দেখা দিয়েছে।
হোয়াইট হাউসের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে যে, আঞ্চলিক মিত্রদের অভিযানের ব্যাপারে আগেভাগেই অবহিত করা হয়েছিল। তবে মধ্যপ্রাচ্যের কূটনীতিকদের ভাষ্য অনুযায়ী, ট্রাম্পের আনুষ্ঠানিক ঘোষণার পর মার্কিন প্রশাসন শুধুমাত্র ওমানের সঙ্গে যোগাযোগ করেছিল। কুয়েত এবং সৌদি আরবের নেতৃত্বের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে যে, আগে ঘোষণা দিয়ে পরে সমন্বয় করার বিষয়টি তাদের ক্ষুব্ধ ও হতাশ করেছে। এর পরিপ্রেক্ষিতে কুয়েতও স্পষ্টভাবে জানিয়ে দেয় যে, তাদের দেশের মার্কিন ঘাঁটি বা আকাশসীমা এই নির্দিষ্ট অভিযানে ব্যবহারের সুযোগ দেওয়া হবে না।
নিচে প্রজেক্ট ফ্রিডম স্থগিত হওয়ার পেছনে প্রধান দেশগুলোর অবস্থান ও ভূমিকা একটি সারণির মাধ্যমে তুলে ধরা হলো:
প্রজেক্ট ফ্রিডম ও সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর অবস্থান
| দেশের নাম | গৃহীত অবস্থান | মূল কারণ ও মন্তব্য |
| মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র | অভিযান সাময়িক স্থগিত | সৌদি আরব ও কুয়েতের আকাশসীমা ব্যবহারে নিষেধাজ্ঞা। |
| সৌদি আরব | অনুমতি প্রদানে অস্বীকৃতি | প্রিন্স সুলতান বিমানঘাঁটি ব্যবহারের অনুমতি দেয়নি; পাকিস্তানের মধ্যস্থতাকে সমর্থন। |
| কুয়েত | সামরিক ঘাঁটি ব্যবহারে বাধা | মার্কিন বিমান ও সরঞ্জাম চলাচলে নিজ আকাশসীমা বন্ধ রাখা। |
| ওমান | প্রাথমিক সমন্বয় | ট্রাম্পের ঘোষণার পর ওমানের সাথে মার্কিন প্রশাসনের যোগাযোগ হয়। |
| ইরান | বিকল্প সহায়তা ঘোষণা | বাণিজ্যিক জাহাজগুলোকে জ্বালানি ও কারিগরি সহায়তা দেওয়ার প্রতিশ্রুতি। |
মার্কিন পরিকল্পনা স্থগিত হওয়ার ২৪ ঘণ্টার মধ্যে ইরান এই অঞ্চলে তাদের সক্রিয় অবস্থানের কথা ঘোষণা করেছে। ইরানের বন্দর ও সামুদ্রিক সংস্থা (PMO) আনুষ্ঠানিকভাবে জানিয়েছে যে, তারা হরমুজ প্রণালি ও এর পার্শ্ববর্তী এলাকায় যাতায়াতকারী বাণিজ্যিক জাহাজগুলোকে কারিগরি সহায়তা, জ্বালানি, খাদ্য এবং চিকিৎসা সেবা প্রদানে সম্পূর্ণ প্রস্তুত। ইরান তাদের জলসীমার কাছে অবস্থানকারী যে কোনো জাহাজের নিরাপত্তা ও প্রয়োজনীয় লজিস্টিক সহায়তা নিশ্চিত করার অঙ্গীকার ব্যক্ত করেছে।
সৌদি আরব বর্তমানে সামরিক পদক্ষেপের পরিবর্তে কূটনৈতিক সমাধানের দিকে গুরুত্ব দিচ্ছে। দেশটি যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যকার উত্তেজনা প্রশমনে পাকিস্তানের মধ্যস্থতা প্রচেষ্টাকে নীতিগত সমর্থন জানিয়েছে। বর্তমানে ‘প্রজেক্ট ফ্রিডম’ স্থগিত থাকায় এই গুরুত্বপূর্ণ নৌ-পথে মার্কিন উপস্থিতি এবং আঞ্চলিক নিরাপত্তার বিষয়টি পুনরায় প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়েছে। সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর মধ্যে যথাযথ কূটনৈতিক সমন্বয় না হওয়া পর্যন্ত এই অভিযানের ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত বলে ধারণা করছেন বিশ্লেষকরা।