খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: রবিবার, ২১ জুন ২০২৬
সংগীতপ্রেমী মানুষের কাছে গান শোনার কিংবা সুরের গভীরে ডুব দেওয়ার জন্য আলাদা কোনো নির্দিষ্ট দিন বা ক্ষণের প্রয়োজন হয় না। বছরের ৩৬৫ দিন এবং ২৪ ঘণ্টাই গান মানুষের নিত্যসঙ্গী হিসেবে কাজ করে। তবুও সংগীতের প্রতি বিশেষ শ্রদ্ধা, ভালোবাসা প্রকাশ এবং বিশ্বজুড়ে সুরের মেলবন্ধনকে উদ্যাপন করার জন্য একটি সুনির্দিষ্ট দিন উৎসর্গ করা হয়েছে, যা ‘বিশ্ব সংগীত দিবস’ নামে পরিচিত। আজ ২১ জুন আন্তর্জাতিকভাবে অত্যন্ত মর্যাদার সঙ্গে এই বিশেষ দিবসটি উদ্যাপিত হচ্ছে। প্রতিবছরের মতো এবারও বাংলাদেশে নানা বর্ণাঢ্য ও সুরময় কর্মসূচির মধ্য দিয়ে দিবসটি উদ্যাপন করা হচ্ছে। কোথাও উন্মুক্ত আকাশের নিচে সুরের মূর্ছনা, কোথাও আনন্দ শোভাযাত্রা, আবার কোথাও সাধারণ মানুষের জন্য বিনা মূল্যে সংগীত পরিবেশন করছেন শিল্পীরা। সংগীতের চিরন্তন শক্তির মাধ্যমে মানুষের মধ্যে পারস্পরিক সম্প্রীতি, বৈশ্বিক শান্তি এবং ইতিবাচক চিন্তাধারা ছড়িয়ে দেওয়াই এই দিবসের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য।
২১ জুন তারিখটিকে বিশ্ব সংগীত দিবস হিসেবে উদ্যাপনের পেছনে একটি সুদীর্ঘ ও আকর্ষণীয় ইতিহাস রয়েছে। বর্তমানে বিশ্বজুড়ে এটি ‘ওয়ার্ল্ড মিউজিক ডে’ বা ফরাসি ভাষায় ‘ফেত দ্য লা মিউজিক’ (Fête de la Musique) নামে পরিচিত। এই দিবসটির প্রাতিষ্ঠানিক যাত্রার পেছনে ফরাসি সাংস্কৃতিক আন্দোলনের বড় ভূমিকা রয়েছে। তবে ইতিহাসের একটি বড় অংশে মার্কিন সংগীতশিল্পী জোয়েল কোহেনের নাম জড়িয়ে আছে। ১৯৭৬ সালে ফ্রান্সে কর্মরত থাকাকালীন কোহেন ‘সামার সোলস্টাইস’ বা উত্তর গোলার্ধের দীর্ঘতম দিন তথা গ্রীষ্মের আগমনকে উদ্যাপন করার লক্ষ্যে সারা রাত ব্যাপী গান চালিয়ে যাওয়ার একটি অভিনব প্রস্তাব করেন।
পরবর্তীকালে, ১৯৮১ সালে ফ্রান্সের তৎকালীন সংস্কৃতিমন্ত্রী জ্যাক ল্যাং এই ধারণাকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়ার জন্য প্রথম চিন্তাভাবনা শুরু করেন। তিনি ফ্রান্সের চিরাচরিত ও প্রথাগত সংগীতের ধারাকে ভেঙে নতুনত্ব আনার জন্য ফরাসি সুরকার ও সংগীত সাংবাদিক মরিস ফ্লুরেটকে নিয়োগ দেন। ১৯৮২ সালে মরিস ফ্লুরেট ফ্রান্সে সংগীতের ওপর একটি ব্যাপকভিত্তিক পরিসংখ্যান ও জরিপ পরিচালনা করেন। সেই জরিপে দেখা যায়, ফ্রান্সে প্রতি দুজন তরুণের মধ্যে একজন কোনো না কোনো বাদ্যযন্ত্র বাজাতে পারতেন। সুরের এই বিপুল সম্ভাবনাকে কাজে লাগিয়ে জ্যাক ল্যাং, প্রকৌশলী ক্রিস্টিয়ান ডুপাভিলন এবং মরিস ফ্লুরেটের যৌথ প্রচেষ্টায় ১৯৮২ সালের ২১ জুন ফ্রান্সে আনুষ্ঠানিকভাবে প্রথম ‘ফেত দ্য লা মিউজিক’ বা ‘মেক মিউজিক ডে’ শুরু হয়। যেখানে তরুণদের শুধু চিরাচরিত গান নয়, বরং রক, জ্যাজ ও পপসহ সব ধারার সংগীতচর্চার স্বাধীনতা দেওয়া হয়। বর্তমানে আর্জেন্টিনা, অস্ট্রেলিয়া, ব্রিটেন, লুক্সেমবার্গ, জার্মানি, সুইজারল্যান্ড ও কোস্টারিকাসহ পৃথিবীর প্রায় ১২০টি দেশ এবং ৪৫০টিরও বেশি শহরে অত্যন্ত উৎসবমুখর পরিবেশে এই দিবসটি পালিত হচ্ছে।
সংগীত দিবসের উৎপত্তি ও বিশ্বব্যাপী বিস্তারের সংক্ষিপ্ত রূপরেখা নিচে টেবিলের মাধ্যমে উপস্থাপন করা হলো:
| ঐতিহাসিক বছর / উপাদান | মূল উদ্যোগ ও ঐতিহাসিক ঘটনা | সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিত্ব ও দেশের নাম |
| ১৯৭৬ সাল | গ্রীষ্মের দীর্ঘতম দিনে সারা রাত গান গাওয়ার প্রস্তাব | জোয়েল কোহেন (মার্কিন সংগীতশিল্পী) |
| ১৯৮১ সাল | সংগীতের জন্য রাষ্ট্রীয়ভাবে একটি বিশেষ দিন নির্ধারণের পরিকল্পনা | জ্যাক ল্যাং (তৎকালীন ফরাসি সংস্কৃতিমন্ত্রী) |
| ১৯৮২ সাল | ফ্রান্সে প্রথম আনুষ্ঠানিকভাবে ‘ফেত দ্য লা মিউজিক’ উদ্যাপন শুরু | জ্যাক ল্যাং, মরিস ফ্লুরেট ও ক্রিস্টিয়ান ডুপাভিলন |
| বর্তমান বিস্তৃতি | বিশ্বজুড়ে প্রায় ১২০টি দেশ এবং ৪৫০টিরও বেশি শহর | বাংলাদেশ, ব্রিটেন, জার্মানি, আর্জেন্টিনা, অস্ট্রেলিয়া ইত্যাদি |
আন্তর্জাতিক এই সংগীত ঐতিহ্যকে ধারণ করে বাংলাদেশে সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগে দুই দিনব্যাপী (২১ ও ২২ জুন) বিস্তৃত কর্মসূচি গ্রহণ করা হয়েছে। বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমি, বাংলাদেশ সংগীত সংগঠন সমন্বয় পরিষদ এবং বিভিন্ন গণমাধ্যম এই দিবসটিকে কেন্দ্র করে বিশেষ অনুষ্ঠানের আয়োজন করেছে।
১. বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির ‘সংগীত উৎসব’:
সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সার্বিক সহযোগিতায় বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমি দুই দিনব্যাপী বর্ণাঢ্য ‘সংগীত উৎসব’-এর আয়োজন করেছে। এই উৎসবটি নবীন ও প্রবীণ শিল্পীদের সুর, সৌন্দর্য ও সাংস্কৃতিক সম্মিলনের এক অনন্য প্ল্যাটফর্ম হিসেবে রূপ নিয়েছে।
উদ্বোধনী দিন (২১ জুন): আজ সন্ধ্যা ৬টা ৩০ মিনিটে জাতীয় নাট্যশালা মিলনায়তনে আয়োজিত এই অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত আছেন সংস্কৃতিমন্ত্রী নিতাই রায় চৌধুরী। উদ্বোধনী দিনে দেশের গান পরিবেশন করছেন কণ্ঠশিল্পী আগুন, ফাহমিদা নবী, মিতা খন্দকার, মনির খান, অনিমা রায়, শফি মণ্ডল এবং আলিফ আলাউদ্দিনসহ দেশবরেণ্য ১০ জন কণ্ঠশিল্পী। এছাড়াও বিশেষ আকর্ষণ হিসেবে চীন ও জাপান দূতাবাস থেকে আমন্ত্রিত শিল্পীরা অনুষ্ঠানে সংগীত পরিবেশন করছেন।
দ্বিতীয় দিন (২২ জুন): সোমবার সন্ধ্যা ৬টা ৩০ মিনিটে জাতীয় নাট্যশালা মিলনায়তনে দ্বিতীয় দিনের অনুষ্ঠান শুরু হবে। এই পর্বে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থাকবেন তথ্য ও সম্প্রচারমন্ত্রী জহির উদ্দিন স্বপন। সন্ধ্যা ৭টা ৩০ মিনিটে সমাপনী সংগীত সন্ধ্যার বিশেষ পরিবেশনা অনুষ্ঠিত হবে।
২. বাংলাদেশ সংগীত সংগঠন সমন্বয় পরিষদের কর্মসূচি:
সংগঠনটি ২১ জুন বিকেল ৪টায় রাজধানীর সেগুনবাগিচার কেন্দ্রীয় কচি-কাঁচার মেলা মিলনায়তনে দুই দিনব্যাপী কর্মসূচির উদ্বোধন করেছে। উদ্বোধনী পর্বে বেলুন ওড়ানো, উদ্বোধনী সংগীত ও জাতীয় সংগীত পরিবেশনাসহ একটি বর্ণাঢ্য শোভাযাত্রা অনুষ্ঠিত হয়।
প্রথম দিনের আলোচনা ও সংস্কৃতি: উদ্বোধনী দিনে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন স্বাধীনতা পুরস্কারপ্রাপ্ত বিশিষ্ট বাচিক শিল্পী ও সংস্কৃতিজন আশরাফুল আলম এবং বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন একুশে পদকপ্রাপ্ত প্রখ্যাত সুরকার শেখ সাদী খান। বিকেল ৪টা ৩০ মিনিটে আলোচনা সভা শেষে ৫টা থেকে পরিষদের অন্তর্ভুক্ত বিভিন্ন সংগঠনের শিল্পীদের দলীয় ও একক সাংস্কৃতিক পরিবেশনা শুরু হয়।
দ্বিতীয় দিনের কর্মসূচি (২২ জুন): আগামীকাল সোমবার বিকেল ৪টা ৩০ মিনিটে দ্বিতীয় দিনের আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হবে। এই পর্বে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থাকবেন বিশিষ্ট শিল্পী আকরামুল ইসলাম। আলোচনা শেষে বিকেল ৫টা থেকে পুনরায় দলগত ও একক সংগীত পরিবেশনার মাধ্যমে উৎসবের সমাপ্তি ঘটবে।
৩. গণমাধ্যমে বিশেষ সম্প্রচার: ‘সংস অব বেঙ্গল: প্রাণবন্ধের সনে’:
টেলিভিশন মাধ্যমেও বিশ্ব সংগীত দিবস উপলক্ষে বিশেষ আয়োজন রাখা হয়েছে। আজ ২১ জুন রাত ৮টা ৩০ মিনিটে মাছরাঙা টেলিভিশনে প্রচারিত হচ্ছে বিশেষ সংগীতানুষ্ঠান ‘সংস অব বেঙ্গল: প্রাণবন্ধের সনে’। মরমি কবি ও কালজয়ী গীতিকার হাসন রাজার গান এবং তাঁর গভীর জীবনদর্শনকে নতুন প্রজন্মের কাছে ফলপ্রসূভাবে তুলে ধরার লক্ষ্যে এই অনুষ্ঠানটির আয়োজন করা হয়েছে। এই বিশেষ আয়োজনের সংগীত পরিচালক ও কিউরেটর হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন দেশের জনপ্রিয় সংগীতশিল্পী শায়ান চৌধুরী অর্ণব। তাঁর নিজস্ব শিল্পভাবনা ও আধুনিক সংগীতবিন্যাসে হাসন রাজার মরমি গানগুলো এক নতুন আবহে পরিবেশিত হচ্ছে। ‘এম ডব্লিউ ম্যাগাজিন বাংলাদেশ’ এবং স্কয়ার টয়লেট্রিজ লিমিটেডের প্রাকৃতিক স্বাস্থ্যবিষয়ক ব্র্যান্ড ‘মায়া’ যৌথভাবে এই সৃজনশীল অনুষ্ঠানের আয়োজন করেছে, যা সংগীত ও গল্পকথনের মাধ্যমে হাসন রাজার চিরন্তন প্রাসঙ্গিকতাকে ফুটিয়ে তুলছে।