দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী দীর্ঘ সময় ধরে অনুসৃত শান্তিবাদী প্রতিরক্ষা নীতি থেকে বড় ধরনের সরে আসার ঘোষণা দিয়েছে জাপান। দেশটির সরকার প্রাণঘাতী অস্ত্র রপ্তানির ওপর আরোপিত পুরোনো কঠোর নিষেধাজ্ঞা শিথিল করেছে, যার ফলে বৈশ্বিক প্রতিরক্ষা বাজারে জাপানের ভূমিকা উল্লেখযোগ্যভাবে পরিবর্তিত হতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে।
প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচির নেতৃত্বাধীন মন্ত্রিসভা সম্প্রতি এই নতুন নীতিগত পরিবর্তন অনুমোদন করেছে। মঙ্গলবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক বার্তায় তিনি জানান, নতুন কাঠামোর অধীনে এখন থেকে প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম বিদেশে স্থানান্তর নীতিগতভাবে সম্ভব হবে। তবে কোন কোন অস্ত্র রপ্তানি করা হবে, সে বিষয়ে তিনি বিস্তারিত কিছু জানাননি।
জাপানি গণমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, এই নীতিগত পরিবর্তনের ফলে যুদ্ধবিমান, ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবস্থা, যুদ্ধজাহাজসহ আধুনিক সামরিক সরঞ্জাম রপ্তানির সুযোগ তৈরি হয়েছে। একই সঙ্গে শর্ত হিসেবে রাখা হয়েছে যে, এসব অস্ত্র ক্রয়কারী দেশকে জাতিসংঘ সনদের নীতিমালার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে এগুলো ব্যবহারের প্রতিশ্রুতি দিতে হবে।
সরকারি সূত্রের বরাতে জানা গেছে, অন্তত সতেরটি দেশ প্রাথমিকভাবে এই নতুন নীতির আওতায় জাপানি অস্ত্র কেনার সুযোগ পেতে পারে। ভবিষ্যতে দ্বিপাক্ষিক ও বহুপাক্ষিক চুক্তি বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে এই তালিকা আরও সম্প্রসারিত হতে পারে।
এর আগে ১৯৬৭ সালে প্রণীত নীতি অনুযায়ী জাপান কেবল অ-প্রাণঘাতী সামরিক সরঞ্জাম রপ্তানির অনুমতি দিত। নতুন নীতিতেও কিছু সীমাবদ্ধতা বজায় রাখা হয়েছে, বিশেষ করে সংঘাতপূর্ণ অঞ্চলে অস্ত্র রপ্তানির ক্ষেত্রে। তবে জাতীয় নিরাপত্তার স্বার্থে বিশেষ পরিস্থিতিতে ছাড় দেওয়ার সুযোগ রাখা হয়েছে।
অন্যদিকে, জাপানের প্রতিরক্ষা শিল্পেও ইতোমধ্যে বড় ধরনের অগ্রগতি দেখা যাচ্ছে। অস্ট্রেলিয়ার সঙ্গে একটি বৃহৎ প্রতিরক্ষা চুক্তির আওতায় জাপানি কোম্পানি মিতসুবিশি হেভি ইন্ডাস্ট্রিজ প্রায় সাত বিলিয়ন মার্কিন ডলারের সমমূল্যের যুদ্ধজাহাজ নির্মাণ করছে, যা অস্ট্রেলিয়ার নৌবাহিনীর জন্য ব্যবহৃত হবে।
নীতিগত পরিবর্তনের তুলনামূলক চিত্র
| বিষয় |
পুরোনো নীতি |
নতুন নীতি |
| অস্ত্র রপ্তানির অনুমতি |
কেবল অ-প্রাণঘাতী সরঞ্জাম |
যুদ্ধবিমান, ক্ষেপণাস্ত্র, যুদ্ধজাহাজসহ বিস্তৃত সামরিক সরঞ্জাম |
| রপ্তানি অঞ্চল |
প্রায় সীমিত |
প্রাথমিকভাবে ১৭টি দেশ, ভবিষ্যতে সম্প্রসারণযোগ্য |
| যুদ্ধক্ষেত্রে ব্যবহার |
প্রায় নিষিদ্ধ |
শর্তসাপেক্ষে অনুমোদন |
| জাতীয় নিরাপত্তা ছাড় |
খুব সীমিত |
বিশেষ পরিস্থিতিতে অনুমোদনযোগ্য |
এদিকে জাপানের প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচির ইয়াসুকুনি শ্রাইনে ধর্মীয় উৎসর্গ পাঠানো নিয়েও বিতর্ক তৈরি হয়েছে। এই মন্দিরে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে নিহতদের স্মরণ করা হলেও সেখানে যুদ্ধাপরাধীদের নামও অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। বিষয়টি দীর্ঘদিন ধরে চীন ও দক্ষিণ কোরিয়ার মতো দেশের সঙ্গে কূটনৈতিক সংবেদনশীলতার কারণ হয়ে আছে।
বিশ্লেষকদের মতে, জাপানের এই নীতিগত পরিবর্তন শুধু প্রতিরক্ষা খাতেই নয়, বরং আন্তর্জাতিক কূটনীতি ও আঞ্চলিক শক্তির ভারসাম্যেও নতুন প্রভাব ফেলতে পারে।