খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: মঙ্গলবার, ৫ মে ২০২৬
ইংলিশ প্রিমিয়ার লিগ (ইপিএল) বিশ্বজুড়ে ফুটবলের সবচেয়ে জনপ্রিয় এবং আর্থিকভাবে প্রভাবশালী লিগ হিসেবে স্বীকৃত। বিপুল রাজস্ব আয়ের সক্ষমতা সত্ত্বেও ২০২৪-২৫ মৌসুমে লিগের ক্লাবগুলো সম্মিলিতভাবে প্রায় ১০০ কোটি ডলার আর্থিক ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছে, যা বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ১২ হাজার ২৭৫ কোটি টাকা। মূলত মাঠের সাফল্য নিশ্চিত করতে ট্রান্সফার বাজারে লাগামহীন বিনিয়োগ এবং খেলোয়াড়দের আকাশচুম্বী বেতনই এই সংকটের প্রধান কারণ।
গত মৌসুমে প্রিমিয়ার লিগের ক্লাবগুলো সম্মিলিতভাবে রেকর্ড ৬০৮ কোটি পাউন্ড (প্রায় ১ লাখ ১০ হাজার কোটি টাকা) আয় করেছে। তবে এই বিশাল রাজস্বও ক্লাবের ব্যয় মেটাতে অপর্যাপ্ত প্রমাণিত হয়েছে। এর পেছনে তিনটি প্রধান কারণ চিহ্নিত করা হয়েছে:
ট্রান্সফার মূল্যস্ফীতি: খেলোয়াড় কেনাবেচায় রেকর্ড পরিমাণ অর্থ ব্যয়।
বেতন কাঠামো: খেলোয়াড়দের উচ্চ বেতন প্রদান।
এজেন্ট ফি: ফুটবল এজেন্টদের প্রদানকৃত বিপুল কমিশন।
পরিসংখ্যান অনুযায়ী, গত মৌসুমে বেতন বাবদ ক্লাবগুলোর ব্যয় ছিল ৪০৪ কোটি পাউন্ড, যা আগের বছরের তুলনায় ৯ শতাংশ বেশি। অথচ একই সময়ে ক্লাবগুলোর মোট আয় বৃদ্ধি পেয়েছে মাত্র ৭ শতাংশ। অর্থাৎ, আয়ের তুলনায় ব্যয়ের গতি অনেক বেশি।
আর্থিক লোকসানের দিক থেকে সবচেয়ে আলোচিত নাম চেলসি। ২০২৫ সালের ৩০ জুন সমাপ্ত অর্থবছরে তারা কর-পূর্ব ৬ কোটি ২০ লাখ পাউন্ড ক্ষতি দেখিয়েছে। তরুণ প্রতিভা সংগ্রহের লক্ষ্যে ক্লাবটির অসংলগ্ন নীতিই এই পরিস্থিতির জন্য দায়ী বলে মনে করা হয়। অন্যদিকে, টটেনহাম হটস্পার বিশ্বের নবম ধনী ক্লাব হওয়া সত্ত্বেও ১২ কোটি ১০ লাখ পাউন্ড লোকসান করেছে, যদিও তাদের আধুনিক মাল্টিপারপাস স্টেডিয়াম থেকে রেকর্ড আয় এবং ইউরোপা লিগে অংশগ্রহণের সুযোগ ছিল।
নিচে কয়েকটি ক্লাবের আর্থিক কৌশল ও ব্যয়ের একটি তুলনামূলক চিত্র দেওয়া হলো:
| ক্লাবের নাম | বিশেষ তথ্য/ঘটনা | আর্থিক পরিস্থিতি/ব্যয় |
| চেলসি | তরুণ প্রতিভা সংগ্রহের নীতি | ৬ কোটি ২০ লাখ পাউন্ড ক্ষতি (কর-পূর্ব) |
| টটেনহাম | আধুনিক স্টেডিয়াম ও ইউরোপীয় ফুটবল | ১২ কোটি ১০ লাখ পাউন্ড লোকসান |
| লিভারপুল | আলেক্সান্দার ইসাককে দলে ভেড়ানো | মোট ট্রান্সফার ব্যয় ৪৫ কোটি পাউন্ড |
| ম্যানচেস্টার ইউনাইটেড | ২৭.৭ শতাংশ শেয়ার বিক্রি | ক্লাবের মোট মূল্যায়ন ৪০৫ কোটি পাউন্ড |
| নিউক্যাসল | স্টেডিয়াম মালিকপক্ষের কাছে বিক্রি | হিসাবের ভারসাম্য রক্ষার কৌশল |
অনেক ক্লাব আর্থিক ফেয়ার প্লে (FFP) নিয়ম রক্ষার্থে কিছু কৌশলী পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। নিউক্যাসল ইউনাইটেড তাদের নিজস্ব স্টেডিয়াম ‘সেন্ট জেমস পার্ক’ মালিকপক্ষের অন্য একটি প্রতিষ্ঠানের কাছে বিক্রি করে কাগজে-কলমে লাভ দেখিয়েছে। একইভাবে এভারটন এবং অ্যাস্টন ভিলা তাদের নারী ফুটবল দল মূল কোম্পানির কাছে বিক্রি করে নগদ অর্থ সংগ্রহ করেছে। ফুটবল বিশ্লেষক কিয়েরেন ম্যাগুয়ারের মতে, ক্লাবগুলোকে একে অপরকে ছাড়িয়ে যাওয়ার প্রতিযোগিতায় অতিরিক্ত খরচ করতে উৎসাহিত করা হয়, যা দীর্ঘমেয়াদে ঝুঁকি তৈরি করছে।
ক্রমবর্ধমান লোকসান নিয়ন্ত্রণে প্রিমিয়ার লিগ কর্তৃপক্ষ আগামী মৌসুম থেকে নতুন আর্থিক নিয়ম চালু করতে যাচ্ছে। এই নিয়মের অধীনে:
১. খেলোয়াড়দের বেতন, ট্রান্সফার ফি এবং এজেন্ট ফির মোট যোগফল ক্লাবের বার্ষিক আয়ের ৮৫ শতাংশের বেশি হতে পারবে না।
২. ইউরোপীয় প্রতিযোগিতায় (যেমন: চ্যাম্পিয়নস লিগ) অংশগ্রহণকারী দলগুলোর জন্য এই সীমা আরও কঠোর, যা মাত্র ৭০ শতাংশ।
তবে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, অপারেটিং খরচ (যা গত মৌসুমে ১০৯ কোটি পাউন্ডে পৌঁছেছে) এই নিয়মের বাইরে থাকায় লোকসান পুরোপুরি কমানো সম্ভব নাও হতে পারে। তা সত্ত্বেও, প্রিমিয়ার লিগের বৈশ্বিক জনপ্রিয়তা এবং সীমিত সংখ্যক ক্লাবের কারণে ব্রিটিশ ধনকুবের জিম র্যাটক্লিফ বা সৌদি আরবের সার্বভৌম সম্পদ তহবিলের মতো বড় বিনিয়োগকারীদের কাছে এই ক্লাবগুলো এখনো অত্যন্ত আকর্ষণীয় সম্পদ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। তাদের মতে, বিলিয়নিয়ার মালিকদের কাছে এই লোকসান সহনীয় হলেও দীর্ঘমেয়াদী স্থিতিশীলতার জন্য খেলোয়াড়-সম্পর্কিত খরচ নিয়ন্ত্রণ করা অপরিহার্য।