খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: বুধবার, ৬ মে ২০২৬
আর্জেন্টাইন ফুটবলের অন্যতম উদীয়মান তারকা ও বেনফিকার উইঙ্গার জিয়ানলুকা প্রেস্তিয়ান্নি উয়েফা ও ফিফার পক্ষ থেকে কঠোর নিষেধাজ্ঞার মুখে পড়েছেন। প্রতিপক্ষ খেলোয়াড়ের প্রতি সমকামী বিদ্বেষী গালি দেওয়ার গুরুতর অভিযোগে তাকে ছয় ম্যাচের জন্য নিষিদ্ধ করা হয়েছে। বিশ্ব ফুটবলের নিয়ন্ত্রক সংস্থা ফিফা উয়েফার দেওয়া এই শাস্তি আন্তর্জাতিক ফুটবল এবং আসন্ন বিশ্বকাপেও কার্যকর রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এর ফলে আর্জেন্টিনার জাতীয় দলের হয়ে এই তরুণ প্রতিভার বিশ্বকাপ অভিষেক এখন চরম অনিশ্চয়তার সম্মুখীন।
ঘটনার সূত্রপাত ঘটে প্রায় দুই সপ্তাহ আগে উয়েফা চ্যাম্পিয়ন্স লিগের একটি গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচে। পর্তুগিজ ক্লাব বেনফিকার হয়ে রিয়াল মাদ্রিদের মুখোমুখি হয়েছিলেন প্রেস্তিয়ান্নি। অভিযোগ অনুযায়ী, ম্যাচের উত্তপ্ত পরিস্থিতিতে তিনি রিয়াল মাদ্রিদের ব্রাজিলিয়ান তারকা ভিনিসিউস জুনিয়রকে লক্ষ্য করে অত্যন্ত কুরুচিপূর্ণ ও সমকামী বিদ্বেষমূলক গালি প্রদান করেন।
তদন্তে উঠে এসেছে যে, প্রেস্তিয়ান্নি ইচ্ছাকৃতভাবে নিজের অপরাধ আড়াল করার চেষ্টা করেছিলেন। মাঠের ক্যামেরার নজর এড়াতে তিনি নিজের জার্সি দিয়ে মুখ ঢেকে উক্ত অপমানজনক মন্তব্যগুলো করেন। তবে উয়েফার শৃঙ্খলামূলক কমিটি উন্নত প্রযুক্তি ও পর্যাপ্ত তথ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে তাকে দোষী সাব্যস্ত করে এবং ছয় ম্যাচের স্থগিত নিষেধাজ্ঞার আদেশ প্রদান করে।
উয়েফা কর্তৃক আরোপিত এই শাস্তির গঠন কিছুটা ব্যতিক্রমী। ছয় ম্যাচের নিষেধাজ্ঞার মধ্যে প্রথম তিন ম্যাচ তাৎক্ষণিকভাবে কার্যকর করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে এবং বাকি তিন ম্যাচ পরবর্তী নির্দিষ্ট সময়ের জন্য স্থগিত রাখা হয়েছে। অর্থাৎ, এই সময়ের মধ্যে প্রেস্তিয়ান্নি যদি পুনরায় কোনো শৃঙ্খলাভঙ্গ করেন, তবে স্থগিত থাকা তিন ম্যাচের নিষেধাজ্ঞা স্বয়ংক্রিয়ভাবে কার্যকর হবে।
উয়েফার এই শাস্তির পরিধি কেবল ইউরোপীয় ক্লাব ফুটবলের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেনি। ফিফা সম্প্রতি এক আনুষ্ঠানিক বিবৃতিতে জানিয়েছে, ফুটবলের নৈতিকতা বজায় রাখতে তারা এই নিষেধাজ্ঞাকে বৈশ্বিক বা আন্তর্জাতিক পর্যায়ে বিস্তৃত করছে। এর অর্থ হলো, ইউরোপীয় ক্লাব প্রতিযোগিতার পাশাপাশি আর্জেন্টিনার জাতীয় দলের হয়ে যেকোনো আন্তর্জাতিক ম্যাচ এবং আসন্ন ফিফা বিশ্বকাপেও এই নিষেধাজ্ঞা বহাল থাকবে। ফলে বিশ্বকাপের গ্রুপ পর্বের একাধিক ম্যাচে তার মাঠে নামার পথ বন্ধ হয়ে গেল।
আসন্ন বিশ্বকাপে বর্তমান চ্যাম্পিয়ন হিসেবে আর্জেন্টিনা দল অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে প্রস্তুতি গ্রহণ করছে। তবে প্রেস্তিয়ান্নির মতো গুরুত্বপূর্ণ একজন উইঙ্গারের এই অনাকাঙ্ক্ষিত নিষেধাজ্ঞা কোচ লিওনেল স্ক্যালোনির পরিকল্পনায় বড় ধরনের ছন্দপতন ঘটিয়েছে। ১৭ জুন কানসাস সিটিতে আলজেরিয়ার বিপক্ষে ম্যাচ দিয়ে আর্জেন্টিনার বিশ্বকাপ অভিযান শুরু হওয়ার কথা রয়েছে। এরপর ২২ জুন টেক্সাসের আর্লিংটনে তাদের প্রতিপক্ষ অস্ট্রিয়া। গ্রুপ পর্বের শেষ ম্যাচে তাদের মোকাবিলা করতে হবে বিশ্বকাপের নবাগত দল জর্ডানকে।
জিয়ানলুকা প্রেস্তিয়ান্নি আর্জেন্টিনার আক্রমণভাগের একজন গুরুত্বপূর্ণ সদস্য হিসেবে বিবেচিত হচ্ছিলেন। স্ক্যালোনি তাকে নিয়ে বড় ধরনের রণকৌশল সাজালেও বর্তমান পরিস্থিতিতে তাকে চূড়ান্ত স্কোয়াডে রাখা হবে কি না, তা নিয়ে ধোঁয়াশা তৈরি হয়েছে। যদি তাকে দলে নেওয়াও হয়, তবে নিষেধাজ্ঞার কারণে তিনি গ্রুপ পর্বের গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচগুলোতে অংশ নিতে পারবেন না। একজন খেলোয়াড়কে ছাড়াই স্কোয়াডের তালিকা পূর্ণ করা আলবিসেলেস্তেদের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে।
এখন পর্যন্ত বেনফিকা বা আর্জেন্টিনা ফুটবল অ্যাসোসিয়েশনের (এএফএ) পক্ষ থেকে এই কঠোর শাস্তির বিরুদ্ধে কোনো আপিল করার আনুষ্ঠানিক ঘোষণা আসেনি। তবে বিশ্ব ফুটবলে বর্ণবাদ ও সমকামী বিদ্বেষের বিরুদ্ধে যে ‘জিরো টলারেন্স’ বা শূন্য সহনশীলতা নীতি গ্রহণ করা হয়েছে, প্রেস্তিয়ান্নির এই শাস্তি তারই প্রতিফলন বলে মনে করছেন ফুটবল বিশ্লেষকরা। বিশেষ করে ভিনিসিউস জুনিয়রকে লক্ষ্য করে অতীতেও বিভিন্ন বর্ণবাদী আচরণের ঘটনা ঘটায় উয়েফা ও ফিফা এইবার দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা নিতে কোনো ছাড় দেয়নি।
এই ঘটনাটি কেবল প্রেস্তিয়ান্নির ক্যারিয়ারের জন্যই বড় ধাক্কা নয়, বরং আন্তর্জাতিক অঙ্গনে আর্জেন্টাইন ফুটবলের ভাবমূর্তিও ক্ষুণ্ণ করেছে। বিশ্বকাপের মতো আসরে নিজের অভিষেক রাঙানোর পরিবর্তে ডাগআউটে বসে নিষেধাজ্ঞা কাটানো যেকোনো তরুণ ফুটবলারের জন্য মানসিকভাবে বিপর্যস্ত হওয়ার মতো বিষয়। স্ক্যালোনি এবং তার কোচিং স্টাফ এখন বিকল্প খেলোয়াড় খোঁজার কাজ শুরু করেছেন, যাতে বিশ্বকাপের শুরুতেই আক্রমণভাগে কোনো শূন্যতা তৈরি না হয়।
প্রেস্তিয়ান্নির এই নিষেধাজ্ঞা ফুটবল বিশ্বকে আবারও একটি বার্তা প্রদান করল যে, মাঠের পারফরম্যান্সের পাশাপাশি খেলোয়াড়দের আচরণগত শালীনতা বজায় রাখা ফিফার কাছে সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ। চূড়ান্ত স্কোয়াড ঘোষণার শেষ সময়ে এই সিদ্ধান্ত আসার ফলে আর্জেন্টিনা শিবিরে এখন ব্যাপক রদবদলের সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে।