যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে সাম্প্রতিক সমঝোতা স্মারক সইয়ের পর হরমুজ প্রণালিতে উত্তেজনা কমতে শুরু করেছে। এর প্রভাবে বিশ্ববাজারে অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি প্রায় ৭৫ ডলারের কাছাকাছি নেমে এসেছে। এতে আন্তর্জাতিক বাজারে কিছুটা স্বস্তি ফিরলেও বাংলাদেশে এর সরাসরি সুফল মিলবে কি না, তা নিয়ে তৈরি হয়েছে অনিশ্চয়তা।
বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম কর্পোরেশনের (বিপিসি) কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, আন্তর্জাতিক বাজারে দাম কমলেও বর্তমানে দেশে জ্বালানি তেলের দাম কমানোর কোনো পরিকল্পনা নেই। তাদের মতে, গত কয়েক মাসে বেশি দামে তেল কিনে কম দামে বিক্রি করতে গিয়ে বড় ধরনের লোকসানে পড়েছে সংস্থাটি। শুধু গত চার মাসেই লোকসানের পরিমাণ ১৭ হাজার কোটি টাকার বেশি।
বিপিসির চেয়ারম্যান মো. রেজানুর রহমান জানিয়েছেন, বর্তমানে আন্তর্জাতিক বাজারে কম দামে তেল পাওয়া গেলেও আগের উচ্চ দামের কারণে গড় হিসাব অনুযায়ী এখনো লোকসান হচ্ছে। তবে আগের তুলনায় মাসিক লোকসানের চাপ কিছুটা কমেছে।
তথ্য অনুযায়ী, মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনা শুরুর পর ২৮ ফেব্রুয়ারি ব্রেন্ট অপরিশোধিত তেলের দাম ছিল প্রায় ৭২ দশমিক ৮৭ ডলার। তা ৪ মে পর্যন্ত বেড়ে ১১৪ ডলারের বেশি হলেও পরে ধীরে ধীরে কমে ২৪ জুনে দাঁড়ায় প্রায় ৭৫ ডলার। এই ওঠানামার কারণে আমদানি ব্যয়েও বড় পরিবর্তন এসেছে। একটি ৩০ হাজার টন ডিজেলবাহী জাহাজের জন্য মে মাসে যেখানে প্রায় ৫ কোটি ডলার খরচ হতো, এখন তা নেমে এসেছে প্রায় ৩ কোটি ডলারে।
বিপিসির হিসাবে, বর্তমানে সিঙ্গাপুর ফর্মুলা অনুযায়ী প্রতি লিটার ডিজেল আমদানিতে খরচ পড়ছে প্রায় ১২৯ টাকা। তবে একই ডিজেল বিক্রি করা হচ্ছে ১১৫ টাকায়, ফলে প্রতি লিটারে লোকসান হচ্ছে প্রায় ১৪ টাকা। অন্যদিকে পেট্রোল ও অকটেন বিক্রিতে কিছুটা লাভ হচ্ছে বলে জানা গেছে।
অপরদিকে সরকারের রাজস্ব কাঠামোর কারণে আমদানির সময়ই প্রতি লিটার ডিজেলে প্রায় ৩৫ টাকা শুল্ক নিচ্ছে জাতীয় রাজস্ব কর্তৃপক্ষ। এতে সরকার রাজস্ব পেলেও বিপিসির আর্থিক চাপ কমছে না।
বিপিসির কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, গত কয়েক মাসে সংস্থাটির ব্যাংক হিসাবে থাকা সঞ্চিত অর্থ থেকে প্রায় ১৭ হাজার কোটি টাকা লোকসান পূরণ করা হয়েছে। বর্তমানে সেই অর্থ ফেরত দিতে জ্বালানি বিভাগের মাধ্যমে সরকারের কাছে আবেদন করা হয়েছে।
এদিকে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের হিসাব পদ্ধতি অনুযায়ী, সর্বশেষ ২১ মে থেকে ২০ জুন পর্যন্ত গড়ে প্রতি লিটার ডিজেল আমদানি খরচ দাঁড়িয়েছে প্রায় ১৫৩ টাকা এবং অকটেনের খরচ প্রায় ১৪৪ টাকা। সেই হিসাবেই আগামী ১ জুলাই নতুন জ্বালানি তেলের দাম নির্ধারণ করা হতে পারে।
দেশে বর্তমানে জ্বালানি তেলের মজুত তুলনামূলকভাবে সন্তোষজনক অবস্থায় রয়েছে। ডিজেলসহ বিভিন্ন জ্বালানির মজুত দিয়ে কয়েক সপ্তাহ সরবরাহ চালু রাখা সম্ভব বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।
তবে মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতি ও আন্তর্জাতিক বাজারের অস্থিরতা বিবেচনায় ভবিষ্যৎ ঝুঁকি এখনো পুরোপুরি কাটেনি বলে মনে করছেন জ্বালানি খাত সংশ্লিষ্টরা।